মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৫ জুন ২০১১, ১১ আষাঢ় ১৪১৮
আমি চির উন্নত শির... বুক ফুলে ওঠে, মাথা উঁচু হয়
আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলন ২০১১, বিদ্রোহী কবিতার ৯০ বছর পূর্তিতে উৎসব
সৈয়দ সোহরাব ॥ বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা কোনটি? এ প্রশ্নটি যে কাউকেই করা হোক না কেন, উত্তর আসবে একটিই, তা জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতা। উত্তর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়ত উত্তরদাতা আবৃত্তি শুরম্ন করে দেবেন_ 'বল বীর_/ বল উন্নত মম শির!/ শির নেহারি' আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!/ বল বীর_/ বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'/ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি'/ ভূলোক দু্যলোক গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির_ বিস্ময় আমি বিশ্ব_ বিধাত্রীর!/ মম ললাটে রুদ্র ভগমান জ্বলে রাজ_ রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!/ বল বীর_/ আমি চির_ উন্নত শির!/...।' শুধু সাধারণেরই নয়, নজরুল গবেষকদেরও কথা কবি নজরুল যদি এই একটি কবিতা ছাড়া বাংলা সাহিত্যে আর কোন অবদান না রাখতেন, তারপরও তাঁর নাম সাহিত্যাঙ্গনে শুকতারার মতোই জ্বল জ্বল করত। এখন প্রশ্ন হলো_ কি ছিল এই কবিতায়? কেন এ কবিতা পুরো জাতির মধ্যে নতুন এক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল? এর উত্তরে শুধু এটাই বলা যায়_ ব্রিটিশশাসিত সময়ে যুগের আকাঙ্ৰাকে আলোড়িত করতে পেরেছিল, মানুষকে আন্দোলিত করেছিল (অবশ্য এখনও করে), অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাণিত শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল এ কবিতা। এর বিষয়, ভাষা, শব্দ, ছন্দ, সুর, আবেদন_ সব কিছুতেই ছিল অভিনবত্ব ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এ কারণে কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো ভারত উপমহাদেশেই তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং তৎকালীন সাহিত্য সমলোচকরা লিখেন_ 'কবিতাটি পড়িতে পড়িতে পাঠকের বুক ফুলিয়া ওঠে, মাথা উঁচু হয়।' আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতাটি শুনে নজরুলকে এই বলে আহ্বান জানালেন_ 'আয় চলে আয়রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগি্নসেতু।'
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কালজয়ী 'বিদ্রোহী' কবিতারই ৯০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। এ উপলক্ষে শুক্রবার ছিল 'আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলন ২০১১।' সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে দেশী_বিদেশী নজরম্নল গবেষকরা ভাষণ দেন। আর সাংস্কৃতিক পর্বে 'বিদ্রোহী' কবিতা আবৃত্তি করেন নাশিদ কামাল এবং এই কবিতার ওপর সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যশিল্পীরা। তবে বিকেলে এই সম্মেলন উপলৰে শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় শুরম্ন হয় দু'দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। নজরম্নলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন নিউইয়র্কে অবস্থিত বার্নার্ড কলেজের অধ্যাপক ড. রাসেল সেল ম্যাকডারমট, চীন আনত্মর্জাতিক বেতারের সম্পাদক ও উপস্থাপক মিজ ইয়ং ওয়েই মিং, নেদারল্যান্ডের লেখক ও সাংবাদিক ড. পিটার কাস্টার্স ও বাংলাদেশের কবি মুহম্মদ নূরম্নল হুদা। স্বাগত ভাষণ দেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক রশীদ হায়দার।
ড. পিটার কাস্টার বলেন, নজরম্নল সহনশীলতার পৰে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে ধর্মীয় সহনশীলতার পৰে ছিল তাঁর দৃঢ় ও কঠিন অবস্থান। গত শতাব্দির ২০-এর দশকে যখন ভারতজুড়ে শুরু হয় দাঙ্গা, তখন তা প্রতিহত করার জন্য তিনি লিখলেন 'কা-রী হুশিয়ার' কবিতাটি। তিনি তৎকালীন কংগ্রেস নেতাদের থেকে ভালই বুঝতেন, যে এই দাঙ্গা বন্ধ করা না গেলে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা না গেলে ভারতের ঐক্য ধরে রাখা যাবে না। সহনশীলতার পৰে তিনি কবিতা লিখতে লাগলেন। কোন কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ (সঃ)কে, কোনটিতে বাঁশির সুরের দেবতা কৃষ্ণকে, আবার কোনটিতে অন্য ধর্মের দেবতাদের সম্প্রীতির বাণী তুলে ধরতে থাকলেন। তিনি তাঁর 'সাম্যবাদী' কবিতাটিতে দুনিয়ার সমসত্ম ধর্মের সম্প্রীতির বাণী তুলে ধরেছেন। এতে বোঝা যায় তিনি সব ধর্ম সম্পর্কেই ভাল জ্ঞান রাখতেন। তিনি সাম্যের কথা বলতে গিয়ে শ্রেণী সংগ্রামীদের কথাও বলেছেন, তাই তাঁর কবিতায় দিনমজুর ও শ্রমিকের কথা উঠে এসেছে। কবির চিনত্মা, চেতনায় আনত্মর্জাতিকতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, এক সময় আমরা হল্যান্ডবাসীরা ধর্মীয় সহনশীলতার বড় উদাহরণ ছিলাম। কিন্তু আমরা আর সেখানে নেই। দিন দিনই হল্যান্ডবাসীর মধ্যে বিদ্বেষ বাড়ছে। চরম দৰিণপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের (অনেকটা মৌলবাদী) বেশ প্রভাব এখন হল্যান্ডে। তাঁরা মুসলিম নিধনের পৰে। কিন্তু তাঁদের ছাড়া সরকার গঠন কারও পৰেই সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রেৰাপটে নজরম্নলের চিনত্মা, দর্শন ও সাম্যবাদের ঝান্ডা হল্যান্ডের জন্য বেশ সময়োপযোগী।
সাংস্কৃতিক পর্বের শুরম্নতেই সমবেত কণ্ঠে নজরুল ইনস্টিটিউটের শিল্পীরা পরিবেশন করে 'কারার ঐ লৌহ কপাট...' গানটি। 'আমি পূরব দেশের পুর নারী' শীর্ষক নৃত্য পরিবেশন করেন মুনমুন আহমেদ ও সহশিল্পীবৃন্দ। আবৃত্তি করেন জয়নত্ম চট্টোপাধ্যায়। আর একক পরিবেশনায় খালিদ হোসেন 'আসিলে এ ভাঙ্গা ঘরে...'; সুমন চৌধুরী 'পাষাণে ভাঙ্গালী ঘুম...' ও খায়রম্নল আনাম শাকিল গজল আঙ্গিকের গান 'পরদেশী বধুয়া...' গেয়ে শোনায়। এ ছাড়া আরও গান পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, লীনা তাপসী, ফাহমিদা রহমান, কৃষ্ণা মজুমদার, সেলিনা হোসেন প্রমুখ শিল্পী।
উলেস্নখ্য, কবিতাটি ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হলেও, তা লেখা হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে। সে হিসেবে এ বছর কবিতাটির ৯০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, কাজী নজরম্নল কবিতাটি লিখেছিলেন ৩/১ সি, তালতলা লেন, কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গ) দ্বিতল ভবনের নিচতলার একটি কৰে। তালতলা থানা, ইতিহাসখ্যাত আলিয়া মাদ্রাসা, বেকার হোস্টেল, মুসলিম ইনস্টিটিউট হল ও ইসলামিয়া (বতমানে মাওলানা আজাদ) কলেজের খুব কাছে এ বাড়িটি। সেই বাড়িতেই ১৯২১_২২ সালের দিকে কিছু দিনের জন্য ভাড়া থাকতেন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মোজাফ্ফর আহমেদ ও কবি নজরম্নল। এই ভাড়া বাড়িতে অবস্থানকালেই নজরুল লিখেছিলেন এই 'বিদ্রোহী' কবিতাটি। সেই দ্বিতল বাড়িটি আজও আছে ইতিহাসের সাৰী হয়ে। মোজাফ্ফর আহমেদের লেখা 'কাজী নজরম্নল ইসলাম: স্মৃতিকথা' বই থেকে আরও জানা যায়, ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কোন এক রাতে লেখা হয় 'বিদ্রোহী' কবিতাটি। এখন নির্দিষ্ট তারিখটি আর মনে নেই। কোন এক রাতে মোজাফ্ফর আহমেদ ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন নজরম্নল ইসলাম রাত জেগে লিখেছিলেন এই কবিতাটি। সকালে মোজাফ্ফর আহমেদ ঘুম থেকে উঠলে কবি তাঁকে জানান রাতে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি ছিল পেন্সিলে লেখা। নজরম্নল তখন তাঁকে কবিতাটি পড়ে শোনান। কবিতাটি পড়ে শোনানোর কিছুৰণ পড়েই কৰে আসেন বিখ্যাত 'মোসলেম ভারত' পত্রিকার পরিচালক ও নির্বাহী সম্পাদক কবিবন্ধু আফজল_ উল_ হক। নজরুল তাঁকেও কবিতাটি শোনান। আফজল_ উল_ হক কবিতাটি শুনে হৈচৈ করে আনন্দ_ উলস্নাসে মেতে উঠলেন এবং বললেন এখনই একটি কপি করে দাও, আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।' সঙ্গে সঙ্গেই পেন্সিল দিয়ে মূল কপি থেকে আরেকটি কপি করে দিলেন হক সাহেবকে। তিনি চলে যাওয়ার কিছুৰণ পরে ঘরে এসে ঢোকেন প্রখ্যাত সাংবাদিক অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য। নজরম্নল সদ্য রচিত কবিতাটি তাঁকেও শোনান। অবিনাশ বাবু ছিলেন বিপ্লবী মন্ত্রে দীৰিত এবং প্রখ্যাত বিপ্লবী বারীন ঘোষের সঙ্গে বোমা মামলার আসামি। তিনি নজরুলের কণ্ঠে কবিতাটি শুনে উচ্ছ্বসিত তো হনই এবং নজরুলকে অনুরোধ করে একটি কপি লিখে নিয়ে যান। আর বলে যান শীঘ্রই তিনি কবিতাটি সাপ্তাহিক পত্রিকা 'বিজলী'তে (সে সময়ের জনপ্রিয়) ছাপাবেন। অবশেষে ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) শুক্রবার সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় নজরম্নলের এই 'বিদ্রোহী' কবিতাটি। পরে 'মোসলেম ভারত'সহ প্রবাসী, সাধনা, দৈনিক বসুমতী, ধূমকেতু ইত্যাদি পত্রিকায় পুনমুর্দ্রিত হয়। এ প্রসঙ্গে মোজাফ্ফর আহমেদ তাঁর বইতে আরও লিখেন_ 'বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কাগজের চাহিদা এত বেশি হয়েছিল যে, শুনেছিলাম সেই সপ্তাহের কাগজ দু'বার ছাপাতে হয়েছিল। বিজলী পত্রিকা দু'বার মিলে ২৯ হাজার কপি ছাপাতে হয়।' ১৪১ পঙক্তির 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর এর পৰে-বিপৰে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলার পাঠক সমাজে হৈচৈ পড়ে যায়। সেই সময়ের ধূমকেতু, প্রবাসী, সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠি, কলেস্নাল, সওগাত, ইসলাম দর্শন ইত্যাদি পত্রিকায় বিভিন্ন লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও আলোচকদের নানামুখী লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। এসব লেখায় যেমন নজরম্নলের প্রশংসা করা হয়েছিল, তেমনি ছিল বিদ্রম্নপের ভাষাও। তবে 'বিদ্রোহী' প্রকাশের পর এক সুতীব্র আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে।