মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৬ মে ২০১১, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮
বটতলা বাজার_ ভাস্কর্যে বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য কবি-কাব্যের গল্প
শিল্পাঙ্গনে সমীরণ দত্তের কাঠকর্ম প্রদর্শনী
সৈয়দ সোহরাব
ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতিকে ভালবাসতেন শিল্পী সমীরণ দত্ত। প্রকৃতির মধ্যে গাছপালার শিকড়_ বাকড়ই তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করত। সমবয়সীরা যখন খেলাধুলা করত, তখন সমীরণ বয়সী গাছের গোড়ায় বসে শিকড়ের গতিবিধি লক্ষ করত। ছোটবেলায় প্রকৃতি ও গাছপালার শিকড়বাকড় ভাল লাগলেও তা দিয়ে সৃজনশীল শিল্পকর্ম সৃষ্টির উৎসাহ পান মাঝ বয়সে, অর্থাৎ যখন তাঁর বয়স ৩০ বছর। আর এর মধ্যেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করে গার্মেন্টস ও আবুল খায়ের গ্রুপে কর্মজীবন শুরু করেন এবং তিন বছর চাকরিও করেন। কিন্তু গতানুগতিক কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলেন না। ভিতরের সৃজনশীলতা তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না? একদিন তিনি তাঁর মার সঙ্গে গল্প করছিলেন। তাঁর মা ছবি রাণী দত্ত তাঁর মায়ের (সমীরণের নানি) গায়ের রঙের (শরীর) বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, সাদাও না, গোলাপীও না, অনেকটা সুপারি গাছ থেকে ঝরে পড়া সদ্য গজানো খোলসের ভেতরের রঙের মতো ছিল অনেকটা। এ কথা শোনার পরই সমীরণের ভেতরে আবার ছোটবেলার সেই ভাললাগা অর্থাৎ প্রকৃতি, গাছপালা, শিকড়_বাকড় ঘুরপাক খেতে থাকে। আর এ ভাবনা থেকেই সৃষ্টি হতে থাকে একের পর এক শিল্পকর্ম। বিধাতার দেয়া সৃজনশীল ও শিল্পসত্তা প্রতিভাকে আর দমিয়ে রাখা যায়নি। বিগত ১৩ বছরে তিনি প্রায় তিন হাজার শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র গাছপালার শিকড়_বাকড় দিয়ে বা ফেলে দেয়া সামগ্রী দিয়ে। এখনও তাঁর সোনারগাঁও স্টুডিওতে শিল্পমান উত্তীর্ণ প্রায় ৫শ' ভাস্কর্য এবং এক হাজারেরও ওপরে নির্মিতব্য শিল্পকর্ম রয়েছে। আর তার থেকে বাছাই করেই ৮২টি শিল্পকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ধানমণ্ডির গ্যালারি শিল্পাঙ্গন। শিরোনাম 'বটতলা বাজার'। এটি শিল্পীর একক পঞ্চম কাঠকর্ম প্রদর্শনী। গত শুক্রবার থেকে শুরম্ন হয়েছে। উদ্বোধন করেছেন আরেক প্রতিথযশা ভাস্কর শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। এই প্রদর্শনী চলবে আগামী রবিবার পর্যনত্ম। প্রতিদিন দুপুর বারোটা থেকে রাত আটটা পর্যনত্ম খোলা।
বিগত ১৩ বছর ধরে ফেলনা কাঠ (গাছের গুঁড়ি, শিকড় ইত্যাদি) দিয়ে জীবনের বেলনা বেলে চলেছেন শিল্পী সমীরণ। শুকনো কাঠে প্রাণ সৃষ্টি করে চলেছেন বলেই তাঁর প্রদর্শনীর শিরোনাম দেয়া হয়েছে প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর স্থানের নামানুসারে 'বটতলা বাজার'। এ প্রসঙ্গে শিল্পী সমীরণ দত্ত বলেন, ধ্বংসমুখী কাছের গুঁড়ি ও শিকড় সংগ্রহ করে তাতে আমি আবার প্রকৃতির রূপ দিতে চেষ্টা করি, অর্থাৎ প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা চালাই। প্রকৃতিকে রৰা করার নানা আবেদন তুলে ধরার চেষ্টা করি কাজের মধ্যদিয়ে। তবে আমি নিজে কোন গাছ কাটি না। কাটা গাছ থেকে তার গোড়া ও শিকড়বাকড় সংগ্রহ করি বা কেউ গাছ বিক্রি করে দিলে, আর আমার সেই গাছের গোড়া যদি পছন্দ হয় তাহলে কিনে নেই। আমার তৈরি শিল্পকর্মের মধ্যে এমনও গাছের গোড়া আছে যার বয়স দু'শ' থেকে আড়াই শ' বছর। সবচেয়ে কম বয়সী গাছের গোড়াটির বয়সই ৭০ বছরের ওপরে। পথের পাশে ফেলে দেয়া এমনই বস্তু সামগ্রী দিয়ে আমি যে সব ভাস্কর্য গড়ে তুলছি তার প্রত্যেকটির রয়েছে পৃথক পৃথক নাম ও পৃথক পৃথক গল্প। প্রদর্শনীতে নিয়ে আসা ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্তনাদ, প্রাগৈতিহাসিক, বিস্ময়, আরামকেদারা, বৈকালিকা, যাত্রী, তপোবন, শিকার যাত্রা, আবারও প্রকৃতি, আপনাসন, শিরোনামহীন, তাথৈ, ঐক্যতান, সাওয়ারি, আলোর পাখি, বিপ্রতীপ (অবনত্মির পাখিরা), সেভ দ্য নেচার (পুষ্প ও পত্রহীন গাছ), অচিন পাখি, জীবন জাল, স্নান ঘাট (গোসলের স্থান), আমি এবং মা ইত্যাদি।
এ প্রদর্শনীতে বেশি স্থান পেয়েছে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার্য সামগ্রী, তবে তার মধ্যেও রয়েছে প্রকৃতির ছোঁয়া। আর এসবের মধ্যে রয়েছে একাধিক ডাইনিং টেবিল। লিচু গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে চেয়ার বা আসন, আর গাছের কা- দিয়ে তৈরি করা হয়েছে টেবিল, যা নান্দনিকতার দিক দিয়ে শিল্পমানে হয়েছে উত্তীর্ণ। তাঁর এক একটি ভাস্কর্য হয়ে উঠেছে যেন কবি ও কাব্যের গল্প। এমনই তাঁর প্রতিটি কাজে বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য কখনও মূর্ত আবার কখনও বিমূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। এই প্রদর্শনীতে সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ দু'লাখ টাকা দামের ভাস্কর্য বা শিল্পকর্ম রয়েছে, যা কারও ঘরে থাকলে সেই ঘরের শোভা বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ।
এই ভাস্কর্য প্রসঙ্গে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেছেন, আমরা জানি উদ্ভিদের প্রাণ আছে, আর তা কাটলেই হয়ে যায় নিষ্প্রাণ। এই নিষ্প্রাণ দেহেই আবার প্রাণ দেয়ার চেষ্টা করে শিল্পী সমীরণ দত্ত সফল হয়েছেন। তাঁর কাজে, কল্পনা শক্তিতে অনেক ধরনের অভিব্যক্তি লৰ্য করা যায়। ঘরগৃহস্থালি সামগ্রীতেও সমীরণ সফল হয়েছেন প্রকৃতির ছোঁয়া সঞ্চার করতে। তাঁর সৃজনশীলতায়, তাঁর চেষ্টায়, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে ভিন্নতা, আর সেটা ফুটে উঠেছে প্রতিটি কাজে।
এই প্রদর্শনী প্রসঙ্গে ডিজাইনার চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, পৃথিবীর দৃশ্যকল্পগুলো রচিত হয়েছে প্রকৃতি ও মানুষের যুগল প্রচেষ্টায়। প্রতিনিয়ত এই স্বপ্ন ও বাসত্মবতার বোধ থেকেই নিসর্গের অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টিতে আত্মমগ্ন রয়েছে শিল্পী। আমাদের চারপাশ ও প্রকৃতির সীমাহীন উৎস থেকে সামগ্রী সংগ্রহ করে শিল্পী তাঁর মানস ভুবনে সংবেদনশীল অনুভব থেকে তৈরি করে চলেছেন একের পর এক সৃজনশীল স্বপ্নরূপ, যা আমাদের আন্দোলিত করে এবং নিয়ে যায় এক অনির্বচনীয় আলোকিত ভাবনার জগতে। প্রকৃতিপ্রেমী এই শিল্পীর মেধায়, মননে, অবলোকনে এবং সৃজনে এই নিষ্প্রাণ প্রকৃতি হয়ে ওঠে বাঙময় গল্পের আধার। তাঁর শিল্পকর্মগুলো শুধুমাত্র রং, আকৃতিগত বৈচিত্র্য, উপকরণ ও গতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সীমা অতিক্রম করে পরিব্যপ্ত হয় অননত্ম সম্ভাবনার বিমূর্ত সঙ্গীতে। আমাদের মনের গভীরে সেই সঙ্গীত অনুরণিত হতে থাকে এক অপরূপ অলৌকিক আনন্দ ও বিষাদে। শিল্পীর এই শিল্পকর্মের সরব উপস্থিতির প্রকাশভঙ্গিমায় আমরা দর্শনার্থীরা ভাব ও কল্পনার স্রোধারায় স্নাত হই।