মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১১, ১০ বৈশাখ ১৪১৮
লোডশেডিং মধ্যরাতেও, বিড়ম্বনা ॥ ত্রুটি ব্যবস্থাপনায়
সচিবের মতে জুনের পর আর সমস্যা হবে না
রশিদ মামুন ॥ রাতে সব ধরনের অফিস আদালত বন্ধ থাকে, রাত ৮টার পর দোকানপাট বিপণি বিতানও বন্ধ হয়, শিল্প কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকে অর্থাৎ আবাসিক ছাড়া অন্য কোন গ্রাহকের রাতে তেমন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এর ওপর রাত ১১টার পর অধিকাংশ মানুষ ঘুমাতে যাওয়ায় বাসাবাড়ির লাইট বন্ধ করতে শুরম্ন করে অর্থাৎ বৈদ্যুতিক বাতির জন্য লোড কমে যায়। কিন্তু বিশেষ করে অফপিক আওয়ারে ১১টার পর প্রতি রাতেই লোডশেডিং করা হচ্ছে। এমনকি তাপমাত্রা কম থাকলে অর্থাৎ বিদ্যুতের চাহিদা কম হলেও গ্রাহক মধ্যরাতের লোডশেডিং বিড়ম্বনা থেকে রেহায় পাচ্ছেন না।
বিদ্যুত বিতরণ কোম্পানি সূত্র বলছে, তাপমাত্রা কম থাকায় এখনও গত বছরের তুলনায় কম লোডশেডিং হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে একই বিদ্যুত বরাদ্দে লোডশেডিং বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকবে না। পিডিবি সূত্র বলছে, গ্রীষ্মের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদন খুব বেশি বৃদ্ধি পাবে না। এ কারণে এবার গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়বে।
লোড ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ॥ বিতরণ কোম্পানিগুলোর সাবস্টেশন থেকে প্রতিদিন একই নিয়মে লোডশেডিং করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিন-রাতে লোডশেডিং করার ৰেত্রে খুব কমই নিয়মের হেরফের করা হয়। এ জন্য যেসব ফিডারে রাতে লোডশেডিং করা হয় তাদের প্রতিদিনই লোডশেডিংয়ের শিকার হতে হয়। রাজধানীর পশ্চিম হাজীপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল মোমেন জানান, প্রতিদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বাসার বিদু্যত চলে যায়। গত কয়েকদিন তিনি একই নিয়মে বিদু্যত যেতে দেখছেন। ঠিক একই সময় তিনি রামপুরা (মহানগর প্রজেক্ট) এলাকার সকল বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখেন। মোমেন অভিযোগ করেন, তার এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে দুই থেকে তিন বার লোডশেডিং করা হলেও রামপুরা (মহানগর প্রজেক্ট) এলাকায় কোন কোন দিন একবার বিদু্যত গেলেও অধিকাংশ দিন লোডশেডিং করা হয় না। পাশাপাশি দুটি এলাকার এক জায়গায় বিদু্যত দিয়ে অন্য এলাকার মানুষকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করে সরকারের বিরম্নদ্ধে ৰুব্ধের কোন ষড়যন্ত্র কিনা তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করেন তিনি। অভিযোগের সত্যতা জানার জন্য রামপুরা ও পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকায় বিদু্যত বিতরণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করা হলে কর্তব্যরত ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। আমরা সবাইকে সমানভাবে বিদু্যত দিয়ে থাকি।
তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে অসমভাবে বিদু্যত বণ্টনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর শানত্মিবাগের বাসিন্দা অসীম সেন জনকণ্ঠে ফোন করে জানান, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলে রাত ১২টার পর বিদু্যত চলে যায়। এটা কি নিয়ম হয়ে গেছে জানতে চেয়ে তিনি বলেন, ঢাকার এত বছরের জীবনে গত দু'বছর ধরে তিনি গভীর রাতে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন জানিয়ে বলেন, এর আগেও তো গ্রীষ্ম ছিল, সেচও ছিল কিন্তু তখন তো এমন রাতবিরাতে লোডশেডিং করা হয়নি। রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন, মগবাজার, মিরপুর, উত্তরাসহ সকল এলাকার গ্রাহকদের একইভাবে মধ্য রাতের লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাপমাত্রা কম থাকলে বিদু্যতের চাহিদা কম থাকে। কিন্তু এরপরেও লোডশেডিং হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা বেশ কমে গেলেও লোডশেডিং হয়েছে প্রতিদিনির মতো।
যান্ত্রিক ত্রম্নটি ঠিক হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় লাগে॥ অগ্নিকাণ্ডের কারণে গত চারদিনে রামপুরা থেকে বিশ্বরোড পর্যনত্ম এলাকার বাসিন্দারা বিদু্যতের ভোগানত্মিতে রয়েছেন। প্রধান গ্রিডে আগুন লাগায় ডেসকোর এই এলাকার গ্রাহকরা ঠিক মতো বিদু্যত পাচ্ছে না। মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা জাহিদ হোসেন ফোন করে শুক্রবার জনকণ্ঠকে জানান, গত দিন ধরে তাদের এলাকায় অতিরিক্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে ডেসকোর স্থানীয় অফিসে ফোন করলে জানানো হচ্ছে, প্রধান গ্রিডে অগি্নকা-ের জন্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি সম্পর্কে ডেসকোর স্থানীয় সরবরাহ কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় বড় রকমের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে বিতরণ কোম্পানিগুলো তা সারিয়ে তুলতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেয় এতে গ্রাহক ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
চাহিদা-উৎপাদনে এখনও বিস্তর ফারাক ॥ ঘাটতির হিসেবে পিডিবি বরাবরই গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করে। বিতরণ কোম্পানিগুলো পিডিবির কাছে যে চাহিদা দেয় তা থেকে অনেক কমিয়ে চাহিদা দেখানোতে পিডিবির হিসেবে কোন সময়ই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৮০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয় না। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদা পৃথকভাবে হিসেব করে দেখা গেছে, দেশে দৈনিক বিদু্যত ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। এখন দৈনিক গড়ে অফপিক আওয়ারে বিদু্যত উৎপাদন হচ্ছে চার হাজার মেগাওয়াটের মতো আর সঞ্চালন ৰতি এবং প্রাথমিক ব্যবহার বাদ দিয়ে দিনের বেলায় তিন হাজার ৭০০ মেগাওয়াট গ্রাহককে সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে পিক আওয়ারে উৎপাদন হয় চার হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের মতো। তখন গ্রাহককে সরবরাহ করা হয় তিন হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট দৈনিক চাহিদার বিপরীতে এই উৎপাদনে কখনও গ্রাহককে সন্তুষ্ট করা যায় না। এর উপর বিশেষ এলাকা এবং বিশেষ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করতে গেলে আবাসিক গ্রাহককে বঞ্চিত করা হয়।
গ্রামে রাতদিন সব সময় একই অবস্থা ॥ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সারাদেশে ৭০টি সমিতির মাধ্যমে ৮৩ লাখ ২২ হাজার ৭০ জন গ্রাহককে (ফেব্রম্নয়ারি পর্যনত্ম) বিদু্যত সরবরাহ করছে। বিশাল এই গ্রাহক সংখ্যার জন্য আরইবির সান্ধ্যকালীন প্রতিদিনের চাহিদা দুই হাজার ৫২৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে প্রতিদিন সরবরাহ করা হয় এক হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। আর দিনের দুই হাজার ২৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় এক হাজার ২৯২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ আরইবির হিসাবেই রাত-দিনের বিদু্যতপ্রাপ্তির পার্থক্য মাত্র ১০ মেগাওয়াট। ঢাকা বা এর আশপাশের কয়েকটি পলস্নী বিদু্যত সমিতি চাহিদার অর্ধেকের বেশি সরবরাহ পেলেও অধিকাংশ সমিতি চাহিদার অর্ধেকের কম সরবরাহ পায়। আবার এমন অনেক সমিতি রয়েছে সেখানে সরবরাহ চাহিদার এক তৃতীয়াংশ। ওইসব এলাকার গ্রাহক রাত-দিনের সামান্য সময়ই বিদু্যতের দেখা পান।
সেচে কিভাবে চাহিদা মোকাবেলা করা হয়, জানতে চাইলে আরইবির এক পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব জেলার সেচ আরইবির বিদু্যতনির্ভর সেখানে রাতে (১১টার পর) সরবরাহ বেশি নেয়া হয়। তিনি বলেন, যেহেতু মোট উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ আরইবির জন্য বরাদ্দ করা হয় সঙ্গত কারণে রাতের বেলায় যেসব সমিতিতে সেচের গ্রাহক নেই সেখানে বিদু্যত দেয়া সম্ভব হয় না।
কতর্ৃপৰ কি বলেন ॥ বৃহস্পতিবার বিদু্যত মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকের পর বিদু্যত সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, মে-জুনের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এতে বিদু্যত নিয়ে আর তেমন সমস্যা হবে না। একই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম বলেন, সরকার অনেক বিদু্যত উৎপাদন কেন্দ্র করছেন এ জন্য বিদু্যত নিয়ে আর কোন চিনত্মা নেই। ভবিষ্যতে আর কোন সমস্যা হবে না। মধ্যরাতের লোডশেডিং নিয়ে কথা বলতে চাইলে ডিপিডিসি এবং ডেসকোর শীর্ষ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা কেউ বিদু্যত উৎপাদন করে না। বিদু্যত কিনে বিক্রি করে। এৰেত্রে সরবরাহ কম থাকলে লোডশেডিং করা ছাড়া কোন বিকল্প থাকে না। তারপরও রাতে কিছু শিল্প কারখানা চলায় রাতেও চাহিদা কমে না।