মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১১, ১০ বৈশাখ ১৪১৮
মুফতি হান্নানকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল জোট সরকার
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চাপের মুখে তা ভণ্ডুল হয় : গ্রেনেড হামলার জিজ্ঞাসাবাদে রেজ্জাকুল-রহিম
শংকর কুমার দে ॥ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রধান আসামি নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গী সংগঠন হরকত-উল-জিহাদের (হুজি) প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বাংলাদেশে এসে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে হুজির প্রধান মুফতি হান্নানের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরে তাকে গ্রেফতারের জন্য চাপ দেয়। এ কারণে হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানকে বিদেশে পাঠাতে পারেনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। হুজির প্রধান ধরা পড়ায় সব ঘটনা ফাঁস করে দেয়। প্রতিরৰা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবদুর রহিম ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় জিজ্ঞাসাকালে সিআইডির কাছে এই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক দুই প্রধান কর্মকর্তা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও আবদুর রহিম বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হুজির প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানকে বিদেশে পাঠানো সম্ভবপর হয়নি। হুজি প্রধান মুফতি হান্নানসহ হুজির সদস্যদের গ্রেফতার করা হবে না বলে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৰ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে গ্রেফতারের পর সে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ওপর ৰুব্ধ হয়ে দেশের সকল গ্রেনেড-বোমা হামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সম্পৃক্তাতার কথা ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে মুফতি হান্নান বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ জঙ্গী তৎপরতায় মদদকারী তাদের কথা ফাঁস করে দেয়।
গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক দুই প্রধান কর্মকর্তা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও আবদুর রহিম ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মধ্যে কার কি ভূমিকা ছিল তার বর্ণনা দিচ্ছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মধ্যে জামায়াতের প্রাধান্য থাকায় তারা দেশে জঙ্গী সংগঠনগুলোকে সংগঠিত করার এবং তৎপরতা জোরদার করার ব্যাপারে মদদ দিয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে তাঁরা হুকুম পালন করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে দাবি করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক দুই প্রধান কর্মকর্তা।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে রেজ্জাকুল হায়দার চৌধরী ও আবদুর রহিম বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি হরকত-উল জিহাদ (হুজি) প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানের সাজা মওকুফ করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৰ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর কাছে মার্চি পিটিশন দাখিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ব্রিটেনের চাপের মুখে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানকে গ্রেফতার করার পর সে দেশের গ্রেনেড-বোমা হামলার সকল ঘটনা ফাঁস করে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে রেজ্জাকুল ও রহিম জানান, হুজির জঙ্গীরা সিলেট হযরত শাহজালাল (র) মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালায়। এই ঘটনায় ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অনুমতির অপেৰা না করেই বাংলাদেশে এসে তদনত্ম শুরম্ন করে দেয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানের কথা জানতে পারে। মুফতি হান্নানের কথা ফাঁস হয়ে গেলে তাকে গ্রেফতারের জন্য সরকারকে চাপ দেয় তারা। বাধ্য হয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চাপে মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করা হয়। মুফতি আবদুল হান্নান গ্রেফতার হওয়ার পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ সকল গ্রেনেড-বোমা হামলার কথা ফাঁস করে দেয়।
গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক দুই প্রধান কর্মকর্তা সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সরকারের নির্দেশে র্যাব হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানী ঢাকার বাড্ডা থানাধীন আনন্দনগরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে। তাকে গ্রেফতার করার পর টাস্কফোর্স, জেআইসি, সিআইডি, র্যাব মিলে বিভিন্ন গ্রেনেড-বোমা হামলার মামলায় ১৪৫ দিন রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দেশের সকল গ্রেনেড-বোমা হামলার কথা ফাঁস করে দেয়। এতে বেকায়দায় পড়ে যায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। মুফতি হান্নানকে গ্রেফতারের প্রায় ১ বছর আগে ২০০৪ সালে ২১ মে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র) মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজির জঙ্গীরা। এই ঘটনার প্রায় ৪ মাস পর '০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলা চালায়। প্রায় ১ বছর ধরে হুজির জঙ্গীরা এত গ্রেনেড-বোমা হামলা চালিয়েও গ্রেফতার এড়িয়ে থাকতে সৰম হয়। এমনকি খোদ রাজধানীতেই হুজির জঙ্গীরা ঘাঁটি গেড়ে বসে তাদের তৎপরতা চালায়। এসব ঘটনায় তখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা ছিল। মুফতি আবদুল হান্নানকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে ফাঁস করে দেয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিনের নাম। হুজি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই হওয়ার কারণে জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কথা ফাঁস হয়ে যায়। তারপর তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা তাজউদ্দিনকে রাজশাহী থেকে মোঃ বাদল নামে পাসপোর্ট করে পাঠানো হয় বিদেশে। জোট সরকার বিদায় নেয়ার আগে ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে ছদ্মনামে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় মাওলানা তাজউদ্দিনকে। এই তাজউদ্দিনই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য গ্রেনেডগুলো সরবরাহ ও পরিকল্পনা করেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান দুই কর্মকর্তা রেজ্জাকুল ও রহিম সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জঙ্গী সম্পৃক্ততা ও জঙ্গী লালন পালনের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তৎকালীন সিআইডির কর্মকর্তারা জজ মিয়াকে দিয়ে একুশে আগস্টের মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সাজানো নাটকের কাহিনী তৈরি করে। জজ মিয়াকে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি এবং শফিকুল ইসলাম ও আবুল হাসেম রানাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মামলা তদনত্মের নামে নাটক সাজানো হয়। তাদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়। শফিকুল ইসলাম ও আবুল হাসেম নামে দুই যুবককে অস্ত্রসহ নারায়ণগঞ্জের ফতুলস্না এলাকা থেকে গ্রেফতার করে এনে গ্রেফতার দেখানো হয় একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে এই দুইজনকে দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে ছিঁচকে অপরাধীদের আসামি করে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক দুই প্রধান রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও আবদুর রহিম বলেছেন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সিআইডির সাবেক প্রধানের নির্দেশে ২১ আগস্টের উদ্ধারকৃত তাজা গ্রেনেড সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৪নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মোখলেসুর রহমান, কম্পিউটার প্রকৌশলী শৈবাল সাহা পার্থকে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মুখ দিয়ে বলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল যে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করা হয় ভারতে এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর নির্দেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যাড ইয়ার্ডের তদন্তদল দেশের জঙ্গী তৎপরতায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সম্পৃক্ততার ঘটনা জেনে যাওয়ার পর আসল ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।
সিআইডির এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবদুর রহিম ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও হাওয়া ভবনের খুবই ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত। তাই তারা চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার জিজ্ঞাসাবাদে তেমন সহযোগিতা না করলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তারা সহযোগিতা করছে। সিআইডি কর্মকর্তার ভাষ্য মতে তাঁরা মুখ খুলেছেন।