মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১১, ১০ বৈশাখ ১৪১৮
ভৈরবসহ হাওড়াঞ্চলে দশ বছরে ছয় শ' নৌ দুর্ঘটনা
সহস্রাধিক যাত্রীর মৃত্যু
নিজস্ব সংবাদদাতা, ভৈরব, ২২ এপ্রিল ॥ ভৈরবসহ হাওড়াঞ্চলে গত ১০ বছরে ৬ শতাধিক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘনায় সহস্রাধিক যাত্রীর করুণ মৃত্যু হয়েছে। বিনষ্ট হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। নৌযান নিয়ন্ত্রণ আইন উপেক্ষা করে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় নিয়োজিত নৌযানগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। নৌযান নিয়ন্ত্রণ আইন দুর্বল এবং উপযুক্ত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার সুযোগে বিআইডব্লিউটিএ'র একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে ১০ সহস্রাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌযান (লঞ্চ, কার্গো, ট্রলার) চলাচল করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভৈরবসহ কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে মেঘনা নদী ও শাখা নদীতে চলাচলকৃত নৌযান অধিকাংশই ফিটনেস নেই। অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের কারণে গত ১০ বছরে সংঘটিত হয়েছে প্রায় ৬ শতাধিক নৌ-দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় করুণ মৃত্যু হয় প্রায় সহস্রাধিক যাত্রীর। এসব দুর্ঘটনায় মধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ লঞ্চ ডুবির ঘটনাও রয়েছে। মেঘনা নদীতে সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল ২০১১ ভোরে বি-বাড়িয়ার সরাইল উপজেলার রাজাপুর এলাকায় এমবি বিপাশা শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১০ বছরে মেঘনা নদীতে দুর্ঘটনার মধ্যে ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল শনিবার রাতে এমভি শরীফপুর নামে একটি দোতলা যাত্রীবাহী লঞ্চ সিলেটের শেরপুর থেকে কিশোরগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে আসার পথে মিঠামইন উপজেলার অদূরে নাগচিনি নদীতে কালবৈশাখীর ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। এ ঘটনায় লঞ্চের ভেতরে ও ছাদে থাকা দুই শতাধিক যাত্রীর প্রায় সবাই লঞ্চের সঙ্গে গভীর পানির নিচে তলিয়ে যান। পরদিন উদ্ধারকারী দল ২১ জনের লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। টানা ৮ দিন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নিমজ্জিত লঞ্চ থেকে ৪টি লাশ উদ্ধার করে বিআইডবিস্নউটিএ'র উদ্ধারকারী জাহাজ রম্নসত্মম। একই বছরের ২১ এপ্রিল ৮২ জন বরযাত্রী নিয়ে এমভি মজলিশপুর নামে একটি লঞ্চ অষ্টগ্রাম থেকে পাশর্্ববতর্ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে ভৈরবের অদূরে সোনাপাড়া এলাকায় ঝড়ের কবলে পড়ে মেঘনা নদীর গভীর পানিতে ডুবে যায়। এ ঘটনায় একই পরিবারের ১০ জনসহ মোট ৪৯ জন বরযাত্রীর করম্নণ মৃতু্য হয়। ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়া বাজার থেকে উপজেলা সদরে আসার পথে যাত্রীবাহী একটি নৌকা ঝড়ের কবলে পড়ে উল্টে গেলে ১০ যাত্রীর করম্নণ মৃতু্য হয়। ঐ বছর কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থেকে মিঠামইনগামী যাত্রীবাহী এমভি চানপুর নামে একটি লঞ্চ নিকলী উপজেলার শিংপুর ইউনিয়নের গোড়াদিঘা এলাকায় কালবৈশাখীর কবলে পড়ে শতাধিক যাত্রী নিয়ে ঘোড়াউত্রা নদীতে ডুবে যায়। উদ্ধার অভিযানে মাত্র ৪৪ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করে উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত ৪৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দেশের এ বৃহত্তর হাওড়াঞ্চলের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা রক্ষায় এ অঞ্চলের ৮৮টি অভ্যনত্মরীণ রম্নটে প্রতিদিন ১০ হাজারেরও বেশি নৌযান চলাচল করছে। শুধু এ বৃহত্তর হাওড়াঞ্চলের গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত চামড়া নৌবন্দর, ভৈরব নৌবন্দর, বাজিতপুর নৌঘাট থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট-বড় নৌযান বিভিন্ন রম্নটে চলাচল করে থাকে।
বাংলাদেশ অভ্যনত্মরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরসহ সংশিস্নষ্ট অন্যান্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালের দিকে প্রণীত দুর্বল নৌযান বা ট্রলার তৈরি হয়। এসব শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌযান সমুদ্র কিংবা হাওড় এলাকায় পরিবহন ও যোগাযোগ রক্ষায় নিয়োজিত হয়। বৈঠাচালিত নৌকার পরিবর্তে ইঞ্জিনচালিত নৌযানগুলোর দ্রম্নত পরিবহন ও যোগাযোগ রক্ষার সামর্থ্য থাকায় জনপ্রিয়তাও লাভ করে। কিন্তু উপযুক্ত কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান বারবার দুর্ঘটনার কবলে পড়লেও সংশিস্নষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দাপটের সঙ্গে চলাচল অব্যাহত রেখেছে। যাত্রী বাহী অধিকাংশ লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। জোড়াতালি দিয়ে লঞ্চগুলো চলাচল করলেও তদারকি নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদারকি না থাকায় যাত্রীবাহী লঞ্চ, কাগের্া ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ফ্রি স্টাইলে চলাচল, মালামাল পরিবহন করছে। এতে নৌ-দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রানহানির ঘটনা বেড়ে চলেছে।