মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১১, ৬ মাঘ ১৪১৭
নব্যবৈষ্ণববাদের প্রবক্তা ধর্মপ্রচারক ও নারী শিক্ষায় শ্রদ্ধাশীল
গেণ্ডারিয়ায় বিজয়কৃষ্ণ আশ্রমের পুরো ৩ বিঘা জমিই বেহাত, উঠেছে বহুতল ভবন
সৈয়দ সোহরাব
নারী জাতির উন্নতি ও শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরিতে পূর্ববঙ্গে যে ক'জন ঋষি_মনীষী কাজ করেছেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক হিসেবেও তিনি উভয় বাংলায় ছিলেন সমধিক পরিচিত। নারী শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কারণেই তিনি ব্রাহ্মসমাজের আচার্য কেশবচন্দ্র সেনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে করেছেন শিক্ষকতা। ধর্মপ্রচারক হিসাবে তিনিও ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের আচার্য, তবে এক সময় ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে হয়ে ওঠেন নব্য বৈষ্ণববাদের প্রবক্তা। আর এ সাধনায় ব্রতী হয়েই গেণ্ডারিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন আশ্রম। কালের বিবর্তনে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সে আশ্রম আজ আর নেই। তিন বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা আশ্রমের পুরো জমিই হয়ে গেছে বেদখল। সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল ভবন। তবে তাঁর আশ্রমের পাশে আজও জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে শিষ্য যমুনা মাঈয়ের আশ্রম। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী কে ছিলেন (?), গে-ারিয়া এলাকার কেউ আজ আর তা জানেন না। 'যমুনা মাঈয়ের আশ্রম'টি টিকে থাকায় গুরুর চেয়ে শিষ্যই এখন সেখানে অধিক পরিচিত।
বাংলা পিডিয়া থেকে জানা যায়, নদীয়া জেলার দহকুল গ্রামে জন্ম বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর। তাঁর বাবার নাম আনন্দবন্দ গোস্বামী, মা স্বর্ণময়ী দেবী। তাঁর জন্ম ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে (১২৪৮ বঙ্গাব্দের ১১ শ্রাবণ) এক পূর্ণিমা তিথিতে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ১৮৬০ সালে (১২৬৭ বঙ্গাব্দে) অধ্যয়নকালে তিনি বেদান্ত পাঠে মনোনিবেশ করেন এবং ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। অতঃপর বাল্যবন্ধু অঘোরনাথ গুপ্ত ও গুরুচরণ মহলানবীশকে সঙ্গে নিয়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীৰিত হন। ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক হিসেবে ২৫ বছর ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম ব্রাহ্মসমাজের আচার্য হয়ে পূর্ববঙ্গে আসেন এবং ঢাকায় কিছুদিন ব্রাহ্মসমাজের আচার্য কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে কাজ করেন। ঢাকায় ১৮৪৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেও, এখানে ব্রাহ্ম স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৮ সালে। সে স্কুলেই তিনি শিৰকতা করেন অঘোরনাথ গুহর সঙ্গে। আর তখনই তিনি নারী শিৰা ও নারীর উন্নতির প্রতি হয়ে ওঠেন শ্রদ্ধাশীল। ধর্মপ্রচার করতে গিয়ে তিনি ময়মনসিংহ, শানত্মিপুর, গয়া প্রভৃতি স্থানে ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠায়ও পালন করেন প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা। এরই মধ্যে গয়াতে তিনি সাধুসঙ্গ যাপন করেন। তখন থেকেই মানসিকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকেন তিনি এবং তাঁর মধ্যে বৈরাগ্যভাবের উদয় হয়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি সমধিক আকর্ষণ হেতু ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে তাঁর মতভেদও বাড়তে থাকে এবং ১৮৮৬ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের আচার্যপদ থেকে বিতাড়িত হন। পরে ১৮৮৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে তিনি বৈষ্ণব ধর্মে আদিষ্ট হন এবং ঢাকার গে-ারিয়ায় আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে ধর্মসাধনায় ব্রতী হন। এক পর্যায়ে আশ্রমে সর্বৰণিক শিষ্য হিসেবে কুলদা ব্রহ্মচারী ও যমুনা মাঈ কাজ শুরম্ন করেন।
জগবন্ধু মৈত্রের লেখা প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি পূর্ব বাংলা ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে কিছুদিন একরামপুরের বাড়িতে বসবাস করেন। তখন তাঁর বেশ কিছু শিষ্য সিদ্ধানত্ম নেয়, তাঁরা এক মাসের বেতন একসঙ্গে করে গুরম্নর জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে দেবেন। তখন গোস্বামী গে-ারিয়ার নির্জন স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠার সায় দেন। গুরম্নর কথামতো শিষ্যরা গে-ারিয়ার ঢালকানগরে তিন বিঘা জমি কিনে সেখানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। উলেস্নখ্য, তিন বিঘা জমি গুরম্নর স্ত্রী যোগমায়া দেবীর নামে কেনা হলেও পরবর্তী সময়ে তা দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে দলিল রেকর্ডভুক্ত হয়। গুরম্নর জীবদ্দশায় আশ্রমে চারটি খড়ের ঘর, একটি পাকা কোঠা এবং গুরম্নর সাধনের জন্য মাটির প্রাচীরবেষ্টিত খড়ের চালাযুক্ত একটি ভজন কুটির ছিল। কুটিরের সম্মুখে উন্মুক্ত স্থানে একটি আমগাছ ছিল। মধ্যাহ্নের আহার গ্রহণের পর গুরম্ন এর নিচে বসে ভজন সঙ্গীত গাইতেন।
বঙ্গবিহারী করের লেখা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১২৯৫ বঙ্গাব্দের জন্মাষ্টমীতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সপরিবারে সেখানে উঠে যান গোস্বামী। তাঁর সর্বৰণিক সঙ্গী হিসেবে কৃষ্ণবিহারী ঘোষ চৈতন্যচরিতামৃত ও নরোত্তম দাস প্রার্থনা পাঠ করতেন। তাঁদের সঙ্গে গোস্বামীও গুরম্ননানকের গ্রন্থসাহেব, তুলসীদাসকৃত হিন্দী রামায়ণ, ভবগত প্রভৃতি পাঠ করতেন। তখন সেখানে অসংখ্য শ্রোতা_দর্শনার্থী হাজির হতো। প্রতিদিন সকাল ১১টার সময় পাঠ শেষে গুরম্ন স্নানাহার করে আমগাছের নিচে বসে ভজন করতেন। সন্ধ্যায় হতো সংকীর্তন। এরপর শিষ্যদের নিয়ে আশ্রমের ভিতর কিছু সময় সাধন করতেন। পরে রাত সাড়ে নয়টায় তিনি বসতেন আহারে। এভাবেই ঘড়ির কাঁটায় চলত তাঁর আশ্রম জীবন। কিন্তু এক সময় বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী চলে যান পুরীতে। সেখানেই ১৮৯৯ সালে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ২২ জ্যৈষ্ঠ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এখনও সেখানে টিকে আছে তাঁর সমাধি মন্দির। তাঁর মৃতু্যর পর গে-ারিয়ার আশ্রমটি তাঁরই শিষ্য, ভক্ত ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দীর্ঘদিন টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ঢাকায় ঘনঘন সাম্প্রদাািয়ক দাঙ্গা ও ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর হিন্দুদের দেশ ত্যাগের কারণে আশ্রমটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ধীরে ধীরে আশ্রমটি চলে যায় দখলদারদের কবলে। আশ্রমের তিন বিঘা জমি ও দালানকোঠার কিছুই নেই এখন আর।
এ প্রসঙ্গে যমুনা মাঈ আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট নির্মল রায় চৌধুরী বলেন, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর আশ্রমের কোন অসত্মিত্বই নেই এখন। শুধু তাঁর শিষ্য যমুনা মাঈয়ের আশ্রমের সমাধি মন্দিরের কিছু অংশ টিকে আছে। এর অবস্থাও জরাজীর্ণ। তবে ২০০৫ সাল থেকে আমাদের কমিটি যমুনা মাঈয়ের এই আশ্রমটি রৰার জন্য কাজ করে চলেছে। এখানে বর্তমানে কালি মা'র পুজো হয়। ভবিষ্যতে স্থায়ী স্থাপনা গড়ারও ইচ্ছা আছে এখানে। আমরা তো আর সারাজীবন এর দায়িত্বে থাকব না, কিন্তু এটাও যেন গোস্বামীর আশ্রমের মতো বেহাত না হয় সে চেষ্টা করে যাব বলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অঙ্গীকার আমাদের। যমুনা মাঈয়ের আশ্রমের জমির পরিমাণ প্রায় দশ কাঠা। এ জমিটুকু গোস্বামীর আশ্রমের নয়। এই জমি যমুনা মাঈয়ের এক শিষ্য নারম্ন গোপাল গোস্বামী কিনে দিয়েছিলেন যমুনা মাঈয়ের জীবদ্দশায়। এখন এটিও দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবেই রেকর্ডভুক্ত। ১৯২৩ সালে (১৩৩০ বঙ্গাব্দের ১৩ ফাল্গুন) তাঁর মৃতু্য হলে আশ্রমের পাশেই তাঁর সমাধি মন্দির নির্মাণ করা হয়। তবে স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দাদের সরকারের কাছে দাবি_ গোস্বামীর বিশাল আশ্রমের পুরনো কাগজপত্র পরীৰা_নীরিৰা করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে এই ঐতিহাসিক আশ্রমটি উদ্ধার করা হোক।