মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০১০, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪১৭
চবির জনপ্রিয় ভিসি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন, জানাজায় ঢল
সুজন ঘোষ, চবি থেকে ॥ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'দুবারের জনপ্রিয় ভিসি ও প্রোভিসি অধ্যাপক মরহুম ড. আবু ইউসুফ আলমের দু'দফা নামাজে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে সোমবার তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মাঠ ও নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ময়দানে বাদ জোহর ও বাদ আছর অনুষ্ঠিত এ দুটি জানাজায় হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ঢল নামে। মরহুমের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কবরস্থানে দাফন করা হয়। নামাজে জানাজায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, চট্টগ্রাম মেয়র আলহাজ মনজুর আলম, সাবেক মেয়র আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আবুল কাশেম মাস্টার এমপি, শামসুল ইসলাম এমপি, জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সরকারী- বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বসত্মরের শিক্ষক ও ছাত্র ছাড়াও তাঁর নিজ বাড়ি হাটহাজারী এলাকার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী নুরম্নল ইসলাম নাহিদ মরহুম উপাচার্যের হাটহাজারীর বড়দীঘিপাড়ার বাসভবনে গিয়ে তাঁর শোকসনত্মপ্ত পরিবারকে সানত্ম্বনা দেন।
দীর্ঘদিন জটিল রোগে আক্রানত্ম হবার পর রবিবার রাত সাড়ে ১০টায় তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইনত্মেকাল করেন। তিনি স্ত্রী, ১ কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭। তাঁর ইনত্মেকালে বিশ্ববিদ্যালয় ও নগরজুড়ে সর্বত্র নেমে এসেছে শোকের ছায়া। উলেস্নখ্য, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যনত্ম তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ও ২০০৯-এর ফেব্রম্নয়ারি থেকে মৃতু্যর আগ পর্যনত্ম ভিসি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর মৃতু্যতে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক শোক জ্ঞাপন করেছেন।
বাসস জানায় রাষ্ট্রপতি এক শোক বার্তায় মরহুমের কর্মময় জীবনের কথা উলেস্নখ করে বলেন, শিৰা, গবেষণা ও সমাজ গঠনে তিনি যে অবদান রেখেছেন জাতি তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর মৃতু্যতে দেশ একজন বিশিষ্ট শিৰাবিদ ও কৃতী সনত্মানকে হারাল। তিনি মরহুমের শোকসনত্মপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। টোকিও থেকে পাঠানো এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের শিৰা খাতে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর শোকসনত্মপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন এবং বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
শোক প্রকাশকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন ডা. আফসারম্নল আমীন, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস, সিটি মেয়র মনজুর আলম, সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, ঢাবি উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী, চবি প্রোভিসি ড. এম আলাউদ্দিন, চবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নসরম্নল কদির, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ জহুর, চবি বঙ্গবন্ধু পরিষদ সভাপতি অধ্যাপক ড. তৌহিদ হোসেন চৌধুরী, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি শহীদ উল আলম, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ আহ্বায়ক ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. অনুপম সেন, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অধ্যাপক রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ ছালাম, চবি কর্মচারী সমিতি, চবি ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রসেনা। এ ছাড়া তাঁর মৃতু্যতে জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ উপাধ্যৰ মোঃ আব্দুস শহীদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান, উপউপাচার্য প্রফেসর নূরম্নলস্নাহ এবং খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জানাজায় শিক্ষামন্ত্রী নুরম্নল ইসলাম নাহিদ উপাচার্য আবু ইউসুফের কীর্তি স্মরণ করে বলেন, ভালবেসে ও নৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আবু ইউসুফদের প্রজন্ম শিক্ষকতায় এসেছেন। বর্তমানে এ প্রজন্মের উত্তরসূরি দিন দিন কমে আসছে। এ দুর্দিনে ছাত্র, শিক্ষক ও জনগণকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে ওপারে চলে গেলেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষক ও ছাত্রদের আবু ইউসুফের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। প্রথম জানাজায় উপউপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরম্নত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অনেক অপ্রিয় সিদ্ধানত্ম নিতে হয়। উপাচার্য আবু ইউসুফ বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।
প্রমিথিউসের অপেক্ষায় চবি ক্যাম্পাস ॥ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০-এর মধ্যে সেশন জট বিদায় করার ঘোষণা দিয়েছিলেন অধ্যাপক আবু ইউসুফ। এ জন্য গ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন পদক্ষেপ। ফলে প্রায় প্রত্যেকটি বিভাগেই কমে আসছিল সেশন জট। কিন্তু ২০১০ সালের আগেই এ জগত থেকে বিদায় নিলেন তিনি। সেশন জট নিরসনে উপাচার্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করেছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতরের কর্মকর্তা খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন। উপাচার্যের মৃতু্যর পর চমেক হাসপাতাল চত্বরে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু এটুকুই বললেন, আরেকজন প্রমিথিউস আসবে তো চবি ক্যাম্পাসে...।
অভিভাবকহীন অভিভাবক ॥ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদে নিজেকে ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে পরিচয় দিতেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ। তাদের স্বার্থে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। শিক্ষকতা জীবনের ৩৭ বছরের প্রতিটি মুহূর্তে এ পরিচয় দিয়েছিলেন আবু ইউসুফ। ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর প্রিয় এ অভিভাবক জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নিজেই হয়ে পড়েন অভিভাবকহীন। গুরম্নতর অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে তাঁর কাছ থেকে একে একে সরে পড়েন এক সময়ের তাঁরই ঘনিণ্ঠরা। উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এ সময়ে তাঁকে নিয়ে শুরম্ন হয় নোংরা রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতালোভী একটি চক্র নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অসুস্থ উপাচার্যকে নিয়ে শুরম্ন করে টানাহেঁচড়া আর অন্যদিকে ক্ষমতার আস্বাদ পেতে তাঁরই এক সময়কার ঘনিষ্ঠ কিছু শিক্ষক চালিয়ে যায় জোর তদ্বির। সব কিছু মিলিয়ে ক্ষমতার চক্রে পড়ে ব্যাহত হয় তাঁর সুচিকিৎসা। অতঃপর জীবন চক্রের নিয়মে আকাশের তাঁরা হয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাচার্য অধ্যাপক আবু ইউসুফ। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশসত্ম সূত্র এ তথ্যর সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
আরেক মুক্তি সেনানী ॥ অন্ধকার শক্তির দাপটে দীর্ঘদিন অবরম্নদ্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আঁধারের শিক্ষাঙ্গনে মুক্তির আলো পৌঁছায়নি তাই। কিন্তু ড. আবু ইউসুফ উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়ার পর কাটতে শুরু করে ঘোর অমনিশা। প্রথম বছরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে গড়ে তোলা হয় 'মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কর্নার'। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয় মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের স্মরণে বিজয়সত্মম্ভ 'স্মরণ'। স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য প্রাঙ্গণে বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নিয়ে বানানো হয় 'স্বাধীনতার মু্যরোল চিত্র'। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত বীরপ্রতীক মোহাম্মদ হোসেন স্মরণে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ ভবন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে পরিচালনা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্যক্তি জীবনে অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ ॥ ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীর মাদারবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন এ শিক্ষাবিদ। তাঁর গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার পশ্চিম ধলই গ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ হতে মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে ১৯৭৩ সালে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যনত্ম সেখানে উচ্চতর গবেষণা করেন এবং জওহরলাল নেহরম্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রম্নয়ারি উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি উপউপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।