মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১০, ১৭ ভাদ্র ১৪১৭
ওঠ ওঠ মমিন, সেহরির সময় নাই_ শেষ রাতে চেনা সুর
পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কাসিদা
সৈয়দ সোহরাব
'আ গায়া অ্যায় সায়েমো মাহে মোবারক আ গায়া/ ছা গায়া সারি ফিজা পার নূর বানকার ছা গায়া...' অর্থাৎ 'এসে পড়েছে হে রোজাদারগণ, মোবারক মাস এসে পড়েছে/ সমসত্ম প্রকৃতিতে আলোস্বরূপ ছেয়ে গেছে।' অথবা 'আমরা কাসিদাওয়ালা যাই ডেকে যাই,/ ওঠ ওঠ মমিন সেহরির সময় নাই।' পবিত্র রমজান মাসে রাতে সেহরি খাওয়ার জন্য রোজাদারদের জাগরণের উদ্দেশ্যে পুরনো ঢাকার অলিতে গলিতে এভাবেই পরিবেশিত হয় কাসিদা। নতুন ঢাকায়ও রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর রেওয়াজ এখন অবশ্য দেখা যায়। তবে তা কাসিদা পরিবেশনের মাধ্যমে নয়_ লাঠি, বাঁশ দিয়ে রাসত্মার খাম্বায় বাড়ি দিয়ে বা 'ঘুম থেকে উঠুন' বলে চিৎকার করে।
তবে পুরনো ঢাকার কাসিদার রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। মোঘলদের হাত ধরে ঢাকায় কাসিদার আগমন। তখন ফার্সিতে লেখা হতো কাসিদা। কারণ তখন ফার্সিই ছিল মোঘলদের দরবারী ও প্রশাসনিক ভাষা। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতেই এ ভাষার চর্চা করতেন মোঘলরা। পূর্ববঙ্গে কাসিদার প্রাচীনতম তথ্যটি পাওয়া যায় মোঘল সেনাপতি মির্জা নাথানের 'বাহারিসত্মান_ই_গায়বি'তে। মির্জা নাথানের বর্ণনানুসারে বলা যায়, কোন বিষয়কে প্রশংসা করে রচিত হতো কাসিদা। বিশেষ বিশেষ উৎসবকে আরও বর্ণময় করে তোলার জন্যই লেখা হতো কাসিদা। এর শাব্দিক অর্থ 'কবিতার ছন্দে প্রিয়জনের প্রশংসা করা।' মূল আরবী শব্দ 'ক্বাসাদ' বিবর্তিত হয়ে কাসিদা শব্দে রূপ নেয়। প্রাক- ইসলাম যুগেও আরবী সাহিত্যে কাসিদার চর্চার কথা উলেস্নখ রয়েছে। মাহে রমজান, ইদ-উল-ফিতর ও মহররম উপলৰেই মূলত কাসিদা রচনা করা হয়। আর এ অঞ্চলে এসব বেশি করতেন ঢাকার আদি অধিবাসীরা। এই ঢাকাবাসীরা আবার দু'ভাগে বিভক্ত। এক দলে ছিল 'সুব্বাসী' বা 'সুখবাসী'। তাঁরা নিজেদের মধ্যে খুব করে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চা করতেন। ঢাকার মোঘল ঘরানার শেষ ধারক বাহক ছিল এই সুব্বাসীরা। নিজেদের মধ্যে তাঁরা উদর্ু বা ফার্সি চর্চা করতেন। আদি অধিবাসীর আরেকটি দল হচ্ছে 'কুট্টি'। বাংলার সঙ্গে উদর্ু ও হিন্দি শব্দ মিশিয়ে কথা বলে থাকেন এঁরা। তাঁদের কাসিদার ভাষাও উদর্ু ও ফার্সি।
ঢাকায় কাসিদার প্রচলন কবে থেকে শুরম্ন হয়েছিল তার দিনৰণ কেউ বলতে পারেন না। তবে মুঘল আমল থেকে বলে অনুমান করা হয়। তখন এই সুবে বাংলায় সুখ_ শানত্মি অৰণ্ন ছিল। তবে এ কথাও ঠিক ঢাকার নবাবজাদা আব্দুল গণির আমলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হলে, মহলস্নায় মহলস্নায় ঘর নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এই কাসিদা কাব্যের প্রসার ঘটে। নবাব আহসান উলস্নাহর আমলে এর প্রসার আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ তিনি আরবী, ফার্সি, উদর্ু প্রভৃতি ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। কাব্য জগতে তাঁর বেশ খ্যাতি ছিল। তিনি উদর্ু কাব্য জগতে 'শাহীন' নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত গজল আজও ঢাকার মিলাদ মাহফিলে পাঠ করা হয়। তাঁর মতো আরও অনেকেই কাসিদা রচনা করে গেছেন। এগুলোর সুরারোপও তাঁদেরই করা।
কাসিদা মূলত রমজান মাসে মাঝ রাতে গাওয়া হয়। এসব কাসিদা উদর্ু, ফার্সি ও আরবী শব্দের সংযোজনেই হয়। কাসিদা গানের দু'টি পর্ব রয়েছে। একটি চলে রমজানের প্রথম ১৫ দিন। এতে রমজানের আগমনের আনন্দ ফজিলত ও স্বাগত জানানোর বাণী থাকে। পরবর্তী তথা রমজানের শেষ ১৫ দিনের কাসিদায় বিদায়ের দুঃখ, বেদনা জড়িত ভারাক্রানত্ম হৃদয়ে রমজানের আলবিদা গাওয়া হয়। আর কাসিদার এই পর্বটিই শুনতে বেশি ভাল লাগে। ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন মানুষের মনে এই কাসিদা বাড়িয়ে দেয় রমজানের আবেদন। সেকাল থেকেই ঢাকায় উদর্ু কাসিদার প্রচলন। আজও তেমনি আছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে বেশ কিছু দলকে বাংলা কাসিদা গাইতে দেখা গেছে। তবে উদর্ু কাসিদায় যেমন ধর্মীয় অনুভূতি আকর্ষণ করে, বাংলা কাসিদায় তেমনটি আকর্ষণ পাওয়া যায় না বলে আজও উদর্ু কাসিদাই প্রচলিত। এখনও পুরনো ঢাকার বকশীবাজারে জুম্মন মিয়ার দল, খাজে দেওয়ান এলাকায় মোহাম্মদ আলীর দল, মগবাজারে ফাতেমার দল ছাড়াও মিরপুরের কাসিদার দল, হোসনী দালানের কাসিদার দল ও বংশালের কাসিদার দল আজও শেষ রাতে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগাতে কাসিদা পরিবেশন করে চলেছে।
এক সময় নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ধর্মানুরাগী সংস্কৃতিকামী বিত্তশালীদের উদ্যোগে রমজানের শেষে হতো কাসিদা প্রতিযোগিতা। এতে পুরস্কৃত করা হতো বিভিন্ন মহলস্নাকে। আজও এই প্রথা একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। টিম টিম করে বাতির মতো এখনও জ্বলছে পুরনো ঢাকায়। ২০ রোজায় পুরনো ঢাকায় সেই কাসিদারই প্রতিযোগিতার আসর বসেছিল। সোবহান বেপারী স্মৃতি কাসিদা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় জুম্মন মিয়ার দল এবং রানারআপ হয় মানিক চাঁদের দল। এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল ঢাকাবাসী।