মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৬ জুন ২০১০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭
জনবসতিতে অতিরিক্ত চাপই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি বাড়িয়েছে
নিমতলীর অগ্নিগ্রাস থেকে প্রতিবেশীকে বাঁচাতে জীবন বিলিয়ে দেয়ার নজির সৃষ্টি
মামুন-অর-রশিদ ॥ নগর রাজধানী ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ করতে হবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এই মুহূর্তে জনবসতির সংখ্যা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৮ হাজার। আর ঢাকা জেলায় সিটি কর্পোরেশনের বাইরের এলাকায় এই বসতির সংখ্যা কমপক্ষে ৬ হাজার, যা বিশ্বে বিরল। বছরে কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে মোট জনসংখ্যার ২৩ দশমিক ১ ভাগ লোক শহরমুখী হয়, যার সংখ্যা ২ কোটি ৮০ লাখ। প্রতি ১২ বছরে শহরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়। ঢাকার আবাসিক এলাকায় নানা ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। জনজীবনকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে জীবন্মৃত্যুর সন্ধিৰণে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অগ্নিসংযোগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঢাকার মানুষকে বাঁচাতে হলে শহরায়ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত পরিবর্ধনের উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের 'গত ৫৫ বছরে ঢাকার অবকাঠামোগত ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন' শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণা সমীৰায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুরনো ঢাকার নিমতলীতে একটি ভবনের গা-ঘেঁষে আরেকটি ভবন। সরু-চিকন পথ। যেখানে কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেখানেই আবার জনবসতি। অতিরিক্ত জনবসতির কারণে আটটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও পাঁচটি ভবন মারাত্মক দগ্ধ হয়েছে এবং এতেই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গলিপথ ধরে অসংখ্য বাড়ি গড়ে ওঠার কারণে বাসাবাড়ি থেকে বের হওয়াই দুষ্কর। জনবসতি অতিরিক্ত চাপই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়িয়েছে। সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসের অগি্ন নির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সময় লেগেছে। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগরায়নের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে ঢাকার যে কোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় ঢাকাবাসী ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্গতদের রৰার প্রাণপণ দৃঢ়তা নিয়ে। নিমতলীর ভয়াবহ অগি্নকাণ্ডেও ঢাকার মানুষের মানবিকতার পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রতিবেশীকে অগ্নিগ্রাস থেকে বাঁচাতে এখানে প্রাণহানির দৃষ্টান্তও সৃষ্টি হয়েছে।
অপরিকল্পিত নগরী হিসেবে বেড়ে ওঠার কারণে রাজধানী ঢাকা যে কোন সময়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ক্রমাগত এই মহানগরী বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে খালি জায়গা, খেলার মাঠ আর উদ্যান পড়ছে আবাসন আগ্রাসনের কবলে। নদী দখল থেকে পার্ক দখলে নেয়া ক্ষমতাসীনদের কাছে এখানে মামুলি ব্যাপার। ফলে এখানে প্রকৃতির স্বাভাবিক বায়ু সঞ্চালন হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সাম্প্রতিক এক 'গত ৫৫ বছরে ঢাকার অবকাঠামোগত ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন' শীর্ষক গবেষণা সমীক্ষায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকার চারদিকে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ যে কোন মুহূর্তে ঢাকাকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। গবেষণায় ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ছয়টি পৃথক সময়ে ভাগ করা হয়েছে। গবেষণা সমীৰার জন্য বর্তমান ঢাকার ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং ৭২ নম্বর ওয়ার্ড বেছে নেয়া হয়েছে। এই গবেষণা সমীৰায় বলা হয়েছে, এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকার জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়বে। সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে এখনই ঢাকাকে বাঁচানোর কাজ হাতে দেয়া দরকার।
দেশে এই মুহূর্তে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪৮ ভাগ। বার্ষিক শহরায়ন প্রক্রিয়ায় জমি ব্যবহৃত হয় শতকরা ৭ ভাগ। শহরায়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে অপরিকল্পিত নগরায়নে নাগরিক জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে জনবসতি গড়ে তোলা চলতে থাকলে ভয়াবহ বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা । পরিকল্পিত শহরায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারী বিধিবিধান মেনে চলাই মারাত্মক বিপর্যয়ের হাত থেকে রাজধানী ঢাকা শহরকে রৰা করতে পারে। যানজটসহ নানা প্রতিবন্ধকতা এখন নগরবাসীর জন্য মারাত্মক সঙ্কট তৈরি করেছে। মূমূর্ষু রোগী যথাসময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে না পেরে পথেই হয়ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। সোয়া কোটি মানুষের নগরী ঢাকার লাখ লাখ মানুষ যানজটে আটকে থেকে কয়েক কোটি শ্রম ঘণ্টা নষ্ট করছে রাস্তাঘাটে। এসব সঙ্কট থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে এখনই সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
'মরফিলজিক্যাল চেঞ্জ অব ঢাকা সিটি ওভার এ পিরিয়ড অব ৫৫ ইয়ারস : এ কেস স্টাডি অব টুওয়ার্ডস' শীর্ষক গবেষণা সমীৰা সম্মিলিতভাবে করেন বায়েস আহমেদ, মুহাম্মদ রাকিবুল হাসান রাজ, ড. কে এম মনিরুজ্জামান। এতে বলা হয়, নগর রাজধানী ঢাকা শহরের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে ইটখোলা নির্মাণ (ব্রিকফিল্ড), জাতীয়-আঞ্চলিক সড়ক-মহাসড়ক, ভূমিদখল, সিনেমা, ক্লিনিক-মেডিক্যাল, ক্লাব, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডকইয়ার্ড, জেটি, হাইকমিশন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো, হাসপাতাল, হোটেল, গেস্ট হাউস, বাংলো, সরকারের প্রশাসনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, শিল্পায়ন, পার্কিং, পেট্রোল অকটেন ডিজেল ফিলিং স্টেশন, মাঠ, উদ্যান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাজার, গুদামঘর, পুকুর, জলাশয়, সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে প্রাথমিক স্কুল, বাস-লঞ্চ ও রেল টার্মিনাল, বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক অঞ্চল, শিল্প অঞ্চল, বন, খোলা মাঠ দখল ইত্যাদিতে নগর জীবন বিষিয়ে তুলছে।
ঢাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে '৫০'র দশকে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। এটি ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড হিসেবে পরিচিত। সমাজের বিত্তবান ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবাসনের জন্য গড়ে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা। কিন্তু স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এই এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায়ী অফিস, পেশাজীবীদের অফিস, বেসরকারী হাসপাতাল, বেসরকারী স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মিলনায়তন গড়ে ওঠে। মিরপুর রোড এবং সাতমসজিদ রোডের সঙ্গে অনেক কানেকটিং রাস্তা ধানমণ্ডির আবাসিক এরিয়াকে বাণিজ্যিক এরিয়ায় রূপান্তরে সহায়তা করেছে। অবকাঠামো উন্নয়নে জীববৈচিত্র রক্ষা করা সম্ভব না হলে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। ধানমণ্ডির মতো আবাসিক এলাকায় সাতমসজিদ রোড এবং মিরপুর রোডে ছদ্মবেশে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫২ সাল থেকে যেভাবে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে সময়ের ধারাবাহিকতায় তার কোন পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশীয় রাস্তার উচ্চ মাত্রায় সংযোগ সুযোগ থাকে। তবে আবাসিক এলাকায় এত বেশি সংযোগ সড়ক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটায়। যা ঢাকার মিরপুর রোড ও সাত রাস্তা সাক্ষী হয়ে আছে।
প্রায় শতবর্ষ আগে ১৯১৭ সালে ঢাকার বর্তমান ৭২ নম্বর ওয়ার্ড গড়ে ওঠে। এই ওয়ার্ডটিই বর্তমানে কোতোয়ালি থানা হিসেবে পরিচিত। এটি পুরনো ঢাকা হিসেবেই পরিচিত। অনেক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান-ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ হেডকোয়াটার্স, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস, লোয়ার কোর্ট এবং জজ কোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে এই ওয়ার্ডে। আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মতো দু'টি রাস্তা ইসলামপুর সড়ক এবং জনসন রোড অনেকগুলো স্থানীয় রাস্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই সড়ক দু'টির সঙ্গে সম্পৃক্ত শাঁখারীবাজার সড়ক, কোতোয়ালি সড়কসহ বেশ কয়েকটি সড়ক। কোতয়ালি সড়ক এবং শাঁখারীবাজার সড়ক সর্বোচ্চসংখ্যক সড়কের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বছরের পর বছর এই সম্পৃক্ততা বাড়ছে। অসংখ্য বাড়ি, গলিপথ ধরে শাঁখারীবাজার রোড এবং কোতোয়ালি সড়কের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই সম্পৃক্ততা একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন। যা পক্ষান্তরে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করছে। তৈরি করছে পুরনো ঢাকায় যানজট। তীব্র যানজট পুরনো ঢাকার জীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে। এমনকি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম সদরঘাট হচ্ছে নৌপথে যাওয়ার স্টেশন। সে কারণে এই এলাকায় সকালে ঢাকায় আগত মানুষের জন্য ভীষণ যানজট তৈরি হয়। আবার বিকেল সন্ধ্যায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলগামী মানুষের চাপে প্রচণ্ড যানজট তৈরি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অক্টোবর ট্র্যাজেডিতে ছাদ ধসে অসংখ্য ছাত্রমৃত্যুর পর নিমতলীতে অগি্নসংযোগে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা সবাইকে আঁতকে দিয়েছে। জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির সেই রাতে দুর্গতদের সহযোগিতার জন্য সবাই যেমন এগিয়ে এসেছেন, তেমনি নিমতলীর অগি্নকাণ্ডে আগুনের ভয়াল শিখা থেকে বাঁচাতে গিয়ে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কখনও এমন ভয়ঙ্কর হয় যেখানে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে । এই পরিস্থিতিতেও উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তবুও উদ্ধার তৎপরতা থেকে দূরে সরে যাননি। বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারী উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ সেই রাতে এগিয়ে এসেছিল। যার যা সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছিল অগি্নগ্রাসে আক্রান্ত মানুষদের উদ্ধারের জন্য।