মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৬ জুন ২০১০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭
এ কান্না থামবার নয় ৪৩ নম্বর বাড়ি এখন মৃত্যুপুরী
'আবাসিক এলাকায় কোন কারখানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চাই না'
সৈয়দ সোহরাব
এ কান্না থামবার নয়। এ শোক ভুলবার নয়। কোন শব্দ বা বাক্য দিয়ে কারও পৰেই এই শোক প্রকাশের ক্ষমতা নেই। স্বজন ও সর্বস্বহারা মানুষগুলো এখন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। অতি পরিচিত, অতি চেনা মানুষদের হারিয়ে নির্বাক চোখে শুধু ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছেন তাঁরা। সে চোখে অশ্রুও আর ঝড়ে না। তবে হৃদয় ৰরণ যে হয়ে চলেছে তা স্পষ্ট তাঁদের চোখে, মুখে, শরীরে। পুরান ঢাকার নিমতলীতে ইতিহাসের মর্মান্তিক অগ্নিদগ্ধের ঘটনায় পরিবার পরিজনসহ সবকিছু হারিয়ে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা এখন জানে না কি তাঁর করণীয়, কি তাঁর ভবিষ্যত? কেনই বা তাঁরা বেঁচে আছেন? এ বাঁচার চেয়ে সবার সঙ্গে কেন তাঁরও মৃত্যু হলো না, এমনও বলেছেন অনেকে। শুধু বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষ স্তম্ভিত, শোকে মুহ্যমান। স্মরণকালের এই ভয়াবহতায় পুরো এলাকার জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। এমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি যে, এ শোক তাঁকে স্পর্শ করেনি। যাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকেরই কণ্ঠ বারবার কেঁপে উঠছিল বৃহস্পতিবার রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে।
শনিবার দুপুরে মুষলধারে যখন বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন গিয়ে পৌঁছি নাজিমউদ্দিন রোডে। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি কমলে যাই ঘটনাস্থল নিমতলীর নবাবকাটরা রোডে। স্তম্ভিত হয়ে যাই বৃহস্পতিবার রাতের অগ্নিতাণ্ডব দেখে। বাড়ি_ঘরের দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি_ট্রান্সর্ফমার, বেকারি কারখানা, সেলুন, এমন কি নবাবকাটরার সেই সরু রাস্তাটিও বয়ে চলেছে অগ্নিঝড়ের মর্মস্পর্শী স্মৃতিচিহ্ন। গত দু'দিনের (শুক্র ও শনিবার) মুষলধারের বৃষ্টিও পারছে না মুছে নিতে, আগের রাতের হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মৃতিগুলো। পোড়া গন্ধ এখনও লাগছে নাকে এসে, এমনকি রাস্তার কালিমাও ধুয়ে_মুছে নিতে পারেনি এ বৃষ্টি। আর ৪৩ নম্বর বাড়িটি যেন পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে বাড়ি হিসাবে। অগ্নিঝড়ের পুরো তা-বটাই যে-এর ওপর দিয়ে গেছে, তার চিহ্ন রয়ে গেছে এর পরতে পরতে। চারতলা এ বাড়িটির মূল ফটক থেকে শুরু করে সিঁড়িকোঠা, প্রত্যেক ফ্ল্যাটের দরজা, জানালা, আসবাবপত্র সবকিছুই হয়ে আছে এই অগ্নিকণ্ডের নির্মম সাৰী। বাড়ির প্রধান লোহার ফটকটি আগুনের তাপে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। প্রধান ফটকের ভিতরেই চলছিল বিয়ের রান্নার কাজ। অগি্ন বিস্ফোরণে রান্নার সেই গ্যাসের চুলা ও তার ওপর রাখা একটি বড় সাইজের কড়াই দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে গিয়ে দেখি সিঁড়িতে পড়ে আছে অনেক পোড়া কাপড়, কাঁথা, বালিশ, স্যান্ডেল, জুতাসহ আরও নানা সামগ্রী। দোতলার ফ্ল্যাটগুলোতে ঢুকতেই বুক কেঁপে উঠল। এক ধরনের ব্যথাও অনুভব করলাম। দেখি ফ্রিজ, টিভি, কাঠের আসবাবপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মানুষ জীবিত থাকার কথা নয়ই। দোতলাতেই কথা হয় এ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা শওকত আলীর সঙ্গে। তিনি ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই তাঁর পরিবারের। তাঁর সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখন লক্ষ করলাম বারবারই তাঁর গলা কেঁপে আসছিল। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী ও ১৪ বছরের একমাত্র কন্যা ইতি প্রাণ হারিয়েছেন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। চকবাজার তাঁর টুপির কারখানা থাকায় তিনি বেঁচে গেছেন। তবে এ বেঁচে থাকা থেকে তাঁর মৃত্যুই শ্রেয় ছিল বলে জানালেন। তিনি আরও বলেন, এখন কি জন্য বাঁচব, কার জন্য বাঁচব, আমার তো সবই শেষ। এ কথা বলার সময়ই কেঁপে উঠেছিল তাঁর গলা। তাঁকে যে সান্তনা দেব, সে ভাষা আমি খুঁজে পাইনি। তাঁর সঙ্গে কথা শেষ করে পুরো ফ্ল্যাট যখন ঘুরে দেখছিলাম, তখন দেখলাম সব ঘরেরই আসবাবপত্র পুড়ে ছাই, দেয়ালে ছোপ ছোপ দাগ, তা কিসের দাগ বুঝা যাচ্ছিল না। তবে এলাকাবাসীর দাবি এগুলো বিস্ফোরিত কেমিক্যালেরই দাগ হবে। কেমিক্যালের এ দাগ চারতলা বিল্ডিংয়ের প্রত্যেক ফ্ল্যাটের প্রতিটি রুমেই লৰ্য করা গেছে। কেমিক্যালমিশ্রিত আগুনের এই তাপ প্রত্যেক রুমের দরজা, জানালাসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রও একেবারে দুমড়ে_মুচড়ে দিয়েছে। এ বিল্ডিংয়েরই তিনতলায় চলছিল বিয়ের আয়োজন। এখানে এসে দেখি অতিথিদের জন্য তৈরিকৃত খাবার এখনও তেমনটিই পড়ে আছে। ডেকরেটরের বড় বড় হাঁড়িতে পোলাও, রোস্ট, রেজালা, বোলে টিকিয়া_ডিমচপ, মিষ্টি, পানসহ নানা খাবার। বিয়ে বাড়ির নানা চিহ্ন এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই ফ্ল্যাটে। বেশ অবস্থাসম্পন্ন পরিবারই যে বসবাস করত এখানে, তা ফ্ল্যাটের জৌলুস দেখেই বোঝা যায়। বাথরুমের বাথটাব, ড্রইং রুমের বিশাল ঝারবাতি, কারুকাজখচিত বেড সবই আজ বহন করে চলেছে মৃত্যুর মিছিলের স্মৃতি। আগুনের উত্তাপে ঝারবাতি ঝলসে গেছে, বাথটাব ফেটে গেছে। ডাইনিং টেবিলে রাখা তৈজসপত্রগুলোও উত্তাপে ভেঙ্গে চৌচির।
বিয়ে বাড়ির এই ফ্ল্যাটেই কথা হয় ফায়ার ব্রিগেডের কর্মী আরজু আহমেদের সঙ্গে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এই বাড়ি থেকেই ৮৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে এই তিনতলা থেকেই ৪৩টি। এমনকি সিঁড়িতেও পড়ে ছিল অনেক লাশ। এতে বোঝা যায় ভিতরে আটকে পড়ারা বাঁচার জন্য বেশ ছোটাছুটি করেছে। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাস বন্ধ হয়ে এখানেই (সিঁড়িতে) মৃত্যু হয়েছে অনেকের। ধোঁয়া আর উত্তাপের কারণে বিল্ডিংয়ের ভিতরে অক্সিজেনের অভাব হয়ে গিয়েছিল এবং কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াতেই দ্রুত বেড়ে গেছে মৃতের সংখ্যা। ফলে পুরো বাড়িটিই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরিতে।
এদিকে এলাকার একাধিক বাসিন্দা জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আর দেখতে চাই না আমাদের স্বজন ও প্রতিবেশীর লাশ। চাই না এই বীভৎসতা দেখতে। আপনারাই (মিডিয়া) সমাজের প্রতিবিম্ব, আপনারাই পারেন আমাদের এই সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে। আপনারা লিখুন, পুরান ঢাকার কোন আবাসিক বাড়িতেই কোন কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকতে পারবে না। সরকার যেন এদিকে দৃষ্টি দেয়। এর জন্য পৃথক মার্কেট গড়ে দেয়া হোক। শুধু ট্রান্সর্ফমার বিস্ফোরণে তো এত বড় মর্মন্তত ঘটনা ঘটতে পারে না। কেমিক্যালই এই দুর্ঘটনাকে বীভৎসতা রূপ দিয়েছে। এই যে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল, এখন কে এর দায়ভার নেবে? তাই আপনাদের কাছে দাবি আমাদের বাঁচান।