মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪২০
যেমন দেখলাম চলচ্চিত্র অগ্নি
ড. মাহবুব মোমতাজ
ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত অগ্নি চলচ্চিত্রের মহোৎসব চলছে। বাংলা চলচ্চিত্রের এমন উৎসব অনেকদিন দেখিনি। বলাকা সিনে ওয়ার্ল্ড এ চলচ্চিত্র দর্শকদের আগ্রহভরে হলে প্রবেশ করতে দেখে আশান্বিত হলাম। অগ্নি চলচ্চিত্রের গল্প গড়ে উঠেছে তানিশা (মাহি) নামের একটি মেয়ের পারিবারিক জীবনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তানিশার বাবার ব্যবসায়িক পার্টনার গুলজার, কামাল, গাউস, জাহাঙ্গীর ছোট্ট তানিশার সামনে তার বাবা মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তানিশা কোনরকম বেঁচে মামার কাছে আশ্রয় নিয়ে বাবা মা হত্যার প্রতিশোধ নিতে দুধর্ষ কিলারে পরিণত হয়। তানিশার ভয়ঙ্কর মূর্তি রূপ নেয় অগ্নিরূপে। গুলজারকে হত্যার উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ড গিয়ে গুলজারের নিরাপত্তারক্ষী ড্রাগনের সঙ্গে পরিচয় হয় তানিশার। ড্রাগনের আসল নাম শিশির (আরেফিন শুভ)। তানিশার টার্গেট গুলজার হত্যা হলেও গুলজারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ড্রাগন (শিশির) তা বুঝতে পারে না। শেষে তানিশার টার্গেট শিশিরের কাছে ধরা পড়লে গুলজার হত্যার মধ্য দিয়ে তানিশা আর শিশিরের মধ্যে ভালবাসা তৈরি হয়। কিন্তু ভালবাসাতেই শেষ হয় চলচ্চিত্রের গল্প।
অগ্নি চলচ্চিত্রের গল্প মূলত একটি হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে। বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ করে এফডিসির ফ্লোরে এরকম হত্যাকা- নিয়ে আরও শ’খানেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু অগ্নি তার থেকে একটু ভিন্ন। এ্যাকশন ছবির নায়িকা হিসেবে মাহির অভিনয় চিরায়ত ছবির তথাকথিত নায়িকাদের মতো নয়। তানিশার ভূমিকায় মাহির অভিনয় নিঃসন্দেহে চলচ্চিত্র দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছে। শত্রুর সঙ্গে লড়তে গিয়ে মাহিকে মনে হয়নি বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকা। মুম্বাই ছবির আদলে মারপিটের মুন্সিয়ানা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। দুর্ধর্ষ মাহির হাত এবং পায়ের সমন্বিত এ্যাকশন এবং চোখ আর ভ্রুর বৈদ্যুতিক গতিতে সঞ্চালন চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকাকে সার্থক করেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের পুরনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে জাজ মাল্টিমিডিয়ার সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার যে অনিবার্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে নিঃসন্দেহে অগ্নি সে প্রচেষ্টার অন্যতম সোপান। বর্তমান সময়ে বিগ বাজেটের অগ্নি চলচ্চিত্র দর্শক নন্দিত তো বটেই বাংলা বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের জন্য এক শুভ যাত্রার ইঙ্গিতবহ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অগ্নি চলচ্চিত্রের লোকেশন, কস্টিউম, সেট কিংবা গল্পের পটভূমি, চিত্রনাট্য সবকিছুই ভিন্ন মাত্রা নিয়ে সিনেমা প্রেমিক দর্শকদের হলমুখী করতে সক্ষম হয়েছে। চলচ্চিত্রে আরেফিন শুভ নবিন হলেও অভিনয়ে এ্যামেচার মনে হয়নি। তবে সংলাপ, উচ্চারণ ও শরীরের জেস্চারে একটু আধটু ত্রুটি চোখে পড়েছে। এ্যাকশন ছবির নায়ক হিসেবে শুভকে আরও পরীক্ষা দিতে হবে। এ যাত্রায় পরিচালকের নিপুণ নির্দেশনায় উৎরে গেলেও ভবিষ্যতে সচেতন থাকতে হবে। শুভ’র কস্টিউম ও থাইল্যান্ডের পাতাইয়া দ্বীপে স্পিডবোটে অসাধারণ উপস্থাপনা দর্শক মনে রাখবে। এ্যাকশন ছবির হিরো হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ শটের সঙ্গে নায়কের মানানসই শারিরীক জেসচার না হলে সিকোয়েন্সটি অর্থবহ হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে সহশিল্পীদের উপস্থাপনাও দর্শক নন্দিত না হয়ে নিন্দিত হতে বাধ্য। আরেফিন শুভ নায়িকা মাহির সঙ্গে অনেক দৃশ্যেই যুৎসই ডেলিভারি দিতে পারেননি। অগ্নি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও সম্পাদনা চমৎকার। গল্পের বুনন ও নাট্যরস দর্শকের চোখকে ক্লান্ত করেনি। বরঞ্চ দৃশ্য ও সিকোয়েন্সের মধ্যে নিঁখুত রসায়নের কারনে দর্শকের দৃষ্টিনিবদ্ধ ছিল পুরোপুরি পর্দাজুড়ে। ছোটখাটো দু একটি ত্রুটি চোখে পড়লেও ক্যামেরা ও আলোর ব্যবহার সবকিছুকে ছাড়িয়ে উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে অগ্নিকে। চিত্রগ্রহণের প্রশংসা করতেই হয়। অগ্নি চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটা চিত্রনাট্য। দর্শক যা দেখতে চেয়েছে তাই যেন ধারণ করা হয়েছে। তবে কোরিওগ্রাফিতে আরেকটু সচেতন হলে গানের দৃশ্যগুলো আরও উপভোগ্য হতে পারত। তারপরেও সুন্দর, উপভোগ্য ও দর্শকনন্দিত একটি চলচ্চিত্র উপহার দেয়ার জন্য পরিচালক ধন্যবাদ পেতেই পারেন। আগামী দিনে আরও সুন্দর সুন্দর চলচ্চিত্রের প্রত্যাশা করি।
লেখক : চলচ্চিত্র গবেষক