মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, ১ পৌষ ১৪১৮
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলা চলচ্চিত্র
আব্দুল্লাহ রায়হান
একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এক বিশাল মাধ্যম হচ্ছে সে দেশের চলচ্চিত্র। তবে আধুনিক চলচ্চিত্র বোদ্ধারা এসব বিষয় মানেন কি না সন্দেহ। তাদের মতে, বড় ক্যানভাসে কিছু প্রেমালাপ ও গানের সমারোহ ঘটিয়ে ২ বা তিন ঘণ্টা পার করতে পারলেই চলচ্চিত্র হয়ে যায়! কিন্তু না। এভাবে যে চলচ্চিত্র তৈরি হয় তাকে মূলধারার চলচ্চিত্র বলা যেতে পারে না। অনত্মত বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য তো নয়ই। চলচ্চিত্র একটি বৃহৎ গণমাধ্যম। যেখানে ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে দেশের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পতিফল পাওয়া যাবে। মানুষের জীবন ও মূল্যবোধের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে।
বাংলা চলচ্চিত্রের শুরম্নতে যেসব কীর্তিমান পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আগমন ঘটেছিল তাঁরা তাঁদের কাজ দিয়েই এর প্রমাণ রেখে গেছেন।
কাল জন্ম দিন হিসেবে পালিত হবে বাংলাদেশের। বাঙালীর গৌরবময় মুুক্তিযুদ্ধের ইতি টেনে এই দিন বিজয় উলস্নাস করেছিল বলে আমরা এর নাম দিয়েছি বিজয় দিবস। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধেরা নানা কথা বিভিন্ন সময় আমাদের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। তবে তা ততটা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেননি অনেকেই। হাতেগোনা কয়েকটি চলচ্চিত্র ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের অমর গাঁথা হয়নি বাংলা চলচ্চিত্রে। এরই মধ্যে আমরা বিজয়ের ৪০ বছর পার করতে চলেছি। এই দীর্ঘ সময়েও অর্থাৎ ৪০ বছরে ৪০টি চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়নি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ এখনও আমাদের জন্য যেন গৌরবের তেমনি অহঙ্কারের একটি বিষয়ও বটে।
মুক্তিযুদ্ধের আগেই মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র
বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের আগেই ১৯৭০ সালে তৈরি করা হয়েছিল চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেয়া'। মূলত এটি নির্মাণ করেন কিংবদনত্মি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। ঊনসত্তরের গণ-অভু্যত্থানের পর এ দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করার লৰ্যেই প্রতীকীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল এই চলচ্চিত্রটি। এ ছবিতে একগোছা চাবির মধ্য দিয়ে শাসনক্ষমতা বোঝানো হয়। চলচ্চিত্রটি প্রতীকী হলেও এখানে যুক্ত হয়েছে প্রভাতফেরির সত্যিকার দৃশ্য দেখানো হয়, যা পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ হিসেবে কাজ করে। ১৯৭০ সালে 'জয়বাংলা' নামে স্বাধীনতার বাণী নিয়ে নির্মিত হয়েছিল আরও একটি চলচ্চিত্র। তবে এটি পাকিসত্মানী সেন্সরবোর্ড আটকে রাখে। জয়বাংলা নিমর্াণ করেছিলেন ফখরম্নল আলম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ছবিটি বাংলাদেশ সেন্সরবোর্ড ছাড়পত্র দেয়।
স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্র...
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরম্ন হয় মুক্তিযুদ্ধের পর পরই। কয়েকজন তরম্নণ পরিচালকের হাত ধরে কাজ শুরম্ন হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের। মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় দিনলিপি সেলুলয়েডে ধরে রাখার প্রত্যয়ে কাজে নেমে পরেছিলেন বেশ ক'জন নির্মাতা। এদের মধ্যে চাষী নজরম্নল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। ১৯৭২ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র 'ওরা ১১ জন' পরিচালনা করেন। এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন যাঁরা তাঁদের প্রায় অনেকেই ছিলেন যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা মুক্তিসেনা। এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয় ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার অদম্য সাহসিকতা ও দেশমাতৃকার জন্য জীবনপণ লড়াইয়ের চিত্র। এরপর একই বছর আরও বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। সুভাষ দত্ত নির্মিত 'অরম্নণোদয়ের অগি্নসাক্ষী', আনন্দ পরিচালিত 'বাঘা বাঙালি', মমতাজ আলী পরিচালিত 'রক্তাক্ত বাংলা' সহ আরও কয়েকটি ছবি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত।
১৯৭৩ সালে মেধাবী [প্রয়াত] চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির নির্মাণ করেন 'ধীরে বহে মেঘনা' চলচ্চিত্রটি। এতে চলচ্চিত্রকার কাহিনীর সঙ্গে মিল রেখে মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ সরাসরি সার্থকতার সঙ্গে ব্যবহার করেন। একই বছর খান আতাউর রহমানের 'আবার তোরা মানুষ হ', কবীর আনোয়ারের 'সেস্নাগান', আলমগীর কুমকুমের 'আমার জন্মভূমি' ছবিগুলোও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কার পরিস্থিতির ওপর নির্মিত হয়। বিশেষ করে খান আতাউর রহমানের 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবিটি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আলাদা আবেদন তৈরি করেছিল সবার কাছে।
এরপর ১৯৭৪ সালে 'আলোর মিছিল' নামে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন নারায়ণ ঘোষ মিতা। একই বছর চাষী নজরম্নল ইসলামের 'সংগ্রাম' ও এস আলীর 'বাংলার ২৪ বছর' চলচ্চিত্র দু'টিও মুক্তি পায় সমান তালে।
১৯৭৪-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণে কিছুটা ছেদ পরে। প্রায় দু'বছর কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। তবে ১৯৭৬ সালে হারম্নন-অর-রশীদ মুক্তিযুদ্ধের মানবিক দিকগুলো নিয়ে 'মেঘের অনেক রং' নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এর পরের বছর ১৯৭৭ সালে আবদুস সামাদের 'সূর্যগ্রহণ' ছবিতেও কিছুটা মুক্তিযুদ্ধের কথা ছিল। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলচ্চিত্র নির্মাণের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে থাকে। কেননা ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ কমে যায় শুধু রাজনৈতিক কারনেই। আশির দশকের শুরম্নতে কয়েক বছর বিরতির পর পরিচালক শহীদুল হক আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি উপহার দেন। 'কলমীলতা' নামে ছবিটি তিনি নির্মাণ করেন ১৯৮১ সালে। একই সময়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ না দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নানা কথা নিয়ে এ জে মিন্টুর 'বাঁধন হারা' আর মতিন রহমানের 'চিৎকার' ছবি মুক্তি পেয়েছিল। এরপর দেখা যায় লম্বা বিরতি।
বাণিজ্যিক ধারায় মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র
বলা হয় আশির দশকেই বাংলা চলচ্চিত্রের অধঃপতন শুরম্ন হয়। পুরো নব্বই দশক পর্যনত্ম যা অব্যাহত থাকে। এ সময়টাতে বিকল্পধারা হিসেবে স্বল্পদৈঘর্্য চলচ্চিত্র বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এবং বাণিজ্যিকীকরণ শুরম্ন হয় চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে। তবে স্বল্পদৈঘ্যর্ের ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রাধান্য ছিল বরাবরই। মোরশেদুল ইসলামের 'আগামী', তানভীর মোকম্মেলের 'হুলিয়া' ও 'নদীর নাম মধুমতি', নাসিরউদ্দিন ইউসুফের 'একাত্তরের যীশু', মোসত্মফা কামালের 'প্রত্যাবর্তন', আবু সাইয়ীদের 'ধূসর যাত্রা' প্রভৃতি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বল্পদৈঘর্্য চলচ্চিত্র ছিল বেশ আলোচিত। ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র 'চিত্রা নদীর পাড়ে'।
প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ একাত্তরে মার্কিন সাংবাদিক লিয়ার লেভিনের ধারণ করা ফুটেজ নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন প্রামাণ্য ছবি 'মুক্তির গান'। ছবিটি দেশজুড়ে বেশ প্রশংসিত হয়। নাগরিক জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনতে 'মুক্তির গান' জোরালো ভূমিকা পালন করে। এরপর কয়েকটি শিশুতোষ মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মিতও হয়েছিল সে সময়। দেবাশীষ সরকারের 'শোভনের একাত্তর', রফিকুল বারী চৌধুরীর 'বাংলা মায়ের দামাল ছেলে', জাঁ-নেসার ওসমানের 'দুর্জয়', হারনুর রশীদের 'আমরা তোমাদের ভুলব না', বাদল রহমানের 'ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ', ছটকু আহমেদের 'মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন', মান্নান হীরার 'একাত্তরের রঙপেন্সিল' চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের শিশুতোষ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য।
এরপর আবার একটি লম্বা বিরতি দিয়ে নব্বই দশকের প্রথমার্ধে যাত্রা শুরম্ন হয় মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। ১৯৯৪ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালনা করেন চলচ্চিত্র 'আগুনের পরশমণি'। হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় ছবি 'শ্রাবণ মেঘের দিন' চলচ্চিত্রটিতেও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ রেখেছিলেন। এটি মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালে। পরিচালক চাষী নজরম্নল ইসলাম ১৯৯৮ সালে কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি 'হাঙর নদী গ্রেনেড'। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তারেক মাসুদ নির্মিত 'মাটির ময়না' ছবিটিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত একটি উলেস্নখযোগ্য ছবি। দুই বছরের বিরতির পর
২০০৪ সালে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালক চাষী নজরম্নল ইসলাম তৈরি করেন ছবি 'মেঘের পর মেঘ'। একই বছর হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করেন 'শ্যামলছায়া' এবং অভিনেতা তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন 'জয়যাত্রা'। দুটো ছবিতেই মুক্তিযুদ্ধের খ- খ- চিত্র দেখানো হয়েছিল। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া তানভীর মোকাম্মেলের 'রাবেয়া' মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি উলেস্নখযোগ্য ছবি। তবে এসব চলচ্চিত্রে কারিগরি দিকটিকে যতটা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিকে সেভাবে দেখানো হয়নি।
নতুন ধারায় মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র
২০১১ সালকে চলচ্চিত্রবোদ্দারা মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন ধারা হিসেবে উলেস্নখ করছেন। এ ধারার সূচনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। রণাঙ্গনে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সৈয়দ শামসুল হকের 'নিষিদ্ধ লোবান' উপন্যাস অবলম্বনে তিনি এ বছরই নির্মাণ করেন 'গেরিলা' ছবিটি। ছবিটি সমপ্রতি কলকাতা আনত্মর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র (নেটপ্যাক) হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। দর্শকদের কাছেও 'গেরিলা' চলচ্চিত্রটি বেশ সমাদৃত হয়েছে। তবে এ বছর আরও দু'টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি মুক্তি পেয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেন 'আমার বন্ধু রাশেদ' এবং অন্যটি তরম্নণ পরিচালক রম্নবাইয়াত হোসেন নির্মিত 'মেহেরজান'।
'আমার বন্ধু রাশেদ' ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ তুলে ধরার মধ্যে চমক থাকলেও স্বল্প সংখ্যক প্রদর্শনীর কারণে সব শ্রেণীর দর্শকরা দেখতে পারেননি। অন্যদিকে রম্নবাইয়াত হোসেন নির্মিত 'মেহেরজান' ছবিটি মুক্তি পায় ২১ জানুয়ারি ২০১১। কিন্তু মুক্তির পরপরই ছবিটি নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। বিশেষ করে একজন পাকিসত্মানী সৈন্যের প্রতি মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন বাঙালী নারীর আসক্তি মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি দেখানো হলেও বাংলাদেশে এর প্রদর্শনী বর্তমানে স্থগিত করেছে সরকার। এ বছর মুক্তিযুদ্ধের ৩টি ছবি নির্মাণকে অনেকেই বলছেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের বছর। তবে বর্তমানে বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের কাজও চলছে। সব মিলিয়ে বলা যায় সামনে চলচ্চিত্র শিল্প মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আবার উদ্ভাসিত হবে নতুন ধারায় এ প্রত্যাশা আমরা সহজেই করতে পারি। ম