মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশ গুপ্ত
দেশের মায়া ফেলে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের দেখে কে বলবে তাঁরা দূরে আছেন? যে যেখানে যে দেশে সেখানেই গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ভুবন। আপনি বরফাবৃত অটোয়ায় থাকুন কিংবা বুশ ফায়ারে উত্তপ্ত সিডনিতে থাকুন- কোন পার্থক্য নেই। একবার বাঙালী ভুবনে এসে পড়লেই হলো। সারাদিন যেভাবে কাটুক সন্ধ্যার পর আপনি থাকবেন মাছে-ভাতে। শুঁটকি ভর্তা, মৌরলা মাছের ঝোল, দেশের চাটনি, আচার এমনকি কাঁচালঙ্কাও বাদ পড়বে না। কোন অনুষ্ঠানে গেলে দেখবেন, দেশের চেয়ে এক শ’ গুণ বেশি আবেগে ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ কিংবা ‘আমি একদিনও না দেখিলাম’ গাইছেন শিল্পীরা। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ কিংবা জয় গোস্বামীকে এতটা আবেগে উচ্চারিত হতেও দেখেননি আপনি। বাংলাদেশের বাঙালীরাই আছেন এসব কর্মকা-ের অগ্রণী ভূমিকায়। সেই কবে মান্না দে এসেছিলেন সিডনি। তাঁকে উপস্থাপনের দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। সে সুবাদে তাঁর কথা শোনা ও অভিজ্ঞতা জানার বিরল সুযোগ মিলেছিল। সমুদ্রসম অভিজ্ঞতার যে বুদবুদ তিনি উগড়ে দিয়েছিলেন তাঁর একটি এখনও মনে গেঁথে আছে। মান্না দের মতে, বাংলা গান, কবিতা শিল্প সাহিত্যের প্রবাসী বা আন্তর্জাতিক ভবিষ্যত মূলত আমাদের হাতে। দুঃখ করে বলেছিলেন, যত দেশে যত শহরে তিনি গান গেয়েছেন বাংলাদেশের বাঙালীরাই তাঁর বাংলা গানের কদর করেছে, এমনভাবে শুনতে চেয়েছে, যা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ব্যক্ত ‘মোরে আরও আরও আরও দাও গানের মতো সর্বভুক।’ বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে বা আলাদা পরিচয় ও রাষ্ট্রসভা নিয়ে দাঁড়াতে না পারলে এই উদ্ভাস কি আদৌ সম্ভব হতো? পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা কিন্তু কোন অংশে পিছিয়ে নেই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তারাই অগ্রগামী। তাদের জীবনযাত্রা ও রাজনীতিতে আমাদের মতো উগ্রতা দেখা যায় না, যে কোন আনন্দ বিনোদনে তাদের চ্যানেল বা অন্য যে কোন মিডিয়া বাংলাদেশে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়ও বটে। বিদেশেও তাদের চ্যানেলের জয়জয়কার। তারপরও বাংলা সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ বা কাজরীর ভূমিকায় বাংলাদেশীরা। যার মূল কারণ আমরাই বাংলার পতাকাবাহী একমাত্র রাষ্ট্র। আমাদের রাষ্ট্র ও জাতির যে ইতিহাস বা অতীত তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা না থাকলে এ দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব। বিস্ময়ের ব্যাপার এই, বাংলাদেশীদের অভাবনীয় পরিশ্রম মেধা ও যোগ্যতায় বিষয়টা আমাদের হাতে আসার পরও রাজনীতি তা হতে দিচ্ছে না। বাংলা বাঙালীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে বাংলাদেশের জনকের বিরুদ্ধে বলতে পারে না কেউ। এই বলাবলি নিয়ে মাথা ঘামানো দেশের মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় হলেও আমাদের পক্ষে তা এড়িয়ে চলা অসম্ভব। প্রবাসে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের শাখা-প্রশাখা বিস্তর বা ব্যাপক হলেও আসল কাজে তাদের দেখা মেলা ভার। তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। অথচ শত্রুপক্ষ বসে নেই।
বলছিলাম প্রবাসীদের বাংলাপ্রেম ও দেশজ সংস্কৃতির প্রতি অপরিসীম ভালবাসা ও আনুগত্যের কথা, জামায়াত বিএনপি এখন যে জায়গায় আঘাত হানতে চাইছে। তারা জানে, সংস্কৃতির শক্তি অপরিসীম। শুধু তাই নয় বাংলা কবিতা, গান, নাটক ছড়া বা থিয়েটার সিনেমার কারণে তারা পেরে ওঠে না। এঁটে উঠতে পারে না। সে জন্য এ জায়গায় আঘাত হানার লক্ষ্যে ধর্মকে হাতিয়ার করে তুলতে চাইছে এরা। ধর্ম বিশ্বাস বা নিজস্ব কারণে কেউ তা করতেই পারে। কিন্তু মুশকিলটা অন্যত্র, দলবদ্ধভাবে উস্কানি ও প্ররোচনা দিয়ে বিদেশে এ জাতীয় অপপ্রক্রিয়া চালু রাখাটা অযৌক্তিক অন্যায়। আমরা নিশ্চয়ই এমন কোন সমাজ বা জাতির প্রত্যাশা করি না, যারা চল্লিশ অবধি আধুনিক থাকবে। উত্তর চল্লিশে মত পাল্টে জাতীয়তাবাদের নামে অন্ধকার গুহায় ঢুকতে ঢুকতে বার্ধক্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বাংলা শিল্প, সংস্কৃতি ও দেশবিরোধী হয়ে পড়বেন। দেশত্যাগের পূর্বে বা গত সতের বছরে যেসব কা- প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য হয়নি আজ তারই আকছার বাস্তবায়ন দেখে হতাশ হয়ে পড়ছি। এমন বাঙালী তো আগে দেখা যেত না। আমাদের দেশের মানুষ কখন ধার্মিক ছিল না? তাঁরা চিরকাল ধর্মপ্রাণ। বরং তখনকার মানুষরাই ছিলেন খাঁটি, তাঁদের জীবনে অসততা, অসুন্দর আর অকল্যাণের জায়গা ছিল না। এখন আমরা কী দেখছি? সন্ত্রাস, ধ্বংস, অসহিষ্ণু মনোভাব আর দলাদলি, নিজের অভিজ্ঞতায় বলছিÑ বিমানে চড়ে খবরের কাগজ মুড়িয়ে বিয়ার পান করা মানুষরা যখন অন্ধত্বের নামে ধর্মীয় রাজনীতির পতাকা ওড়ায়, হতবিম্বল হবার বিকল্প থাকে না। আজ প্রবাসেও এদের উৎপাত আর আহাজারি। আগেই বলেছি, বাংলা সংস্কৃতি ও দেশাত্মবোধে আমরা এগিয়ে। আমাদের নতুন প্রজন্মও সে পথে ধাবমান।