মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
জেনারেল আইয়ুবের আমলে ১৯৬৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর কাশ্মীরে ‘হযরতের পবিত্র কেশ’ চুরির অজুহাতে ১৯৬৪ সালে রক্তক্ষয়ী রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় দশ হাজার হিন্দু নিহত হয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ‘বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও’ প্রতিরোধে ‘ত্রিশজন মুসলিম যুবক হিন্দুদের প্রাণরক্ষার জন্য আত্মত্যাগ করেন’ (বৃহত্তর ঢাকা জেলা গেজেটিয়ার, বাংলাদেশ সরকার, ১৯৯৫, পৃঃ ১০২)।
পাকিস্তান সরকার ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধ ও ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত আইয়ুব খান ও লাল বাহাদুরের মধ্যে ‘তাসখান্দ’ চুক্তি প্রেক্ষাপটের ফলশ্রুতিতে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ৬ দফাÑ বাঙালীর বাঁচার আন্দোলন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে বাঙালী সম্বিত ফিরে পায়, বাঙালী জাতীয়তাবাদ বেগবান হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং সর্বোপরি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিক ও নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ জাতীয় ১৬৭/১৬৯ ও প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮/৩০০টি আসনে বিরাট বিজয় অর্জন করে। ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের শেষপাদে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার কারণে ২৫-২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১০ এপ্রিল ১৯৭১ অপরাহ্ণে জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত স্বাধীনতা ঘোষণা মতে, বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী মর্মে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী কারাগারে বন্দী থাকায় উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথগ্রহণ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত গীত হয়। বঙ্গবন্ধুর একাত্তরে অনুপস্থিতিতে তাঁর বিশ্বস্ত সহচর জাতীয় নেতৃবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলী প্রমুখের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতায় ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়।
পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্বিচার গণহত্যা, এক কোটি বাঙালীকে ভারতে আশ্রয় প্রদান, প্রচারমাধ্যমে বাংলাদেশের পাক-অত্যাচার ও গণহত্যাকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের অজুহাত প্রতিহত করে বাইরের পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ভারতের বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) প্রতিষ্ঠার সহযোগিতা, শরণার্থীদের আশ্রয়দান, যুবশিবির স্থাপনে সাহায্য ও মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত বাহিনী তথা সেক্টর কমান্ডার সেনাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রসদ ও সর্বপ্রকার সাহায্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন, বিশ্বব্যাপী গণসংযোগ ও প্রচার, প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের অর্থাৎ মুজিবনগর সরকারকে সব রকম সহযোগিতা প্রদান। একাত্তরে অমুসলিম নাগরিকগণ পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংস অত্যাচার, গণহত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মুখোমুখি হয় এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৯৮,৯৯,৩০৫ জন বাঙালী শরণার্থী হিসেবে ভারতে ৮২৫টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয় এবং মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
ভারতে এক কোটি বাঙালী শরণার্থীদের আশ্রয় গ্রহণ, তাদের আহার, বাসস্থান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণসহ জাতিসংঘ, পাশ্চাত্যের দেশসহ গণমাধ্যমে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ভারতের জনগণ ও সরকারের সার্বিক সমর্থন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ মাত্রা পায়। এছাড়া পাকিস্তান সরকারের শরণার্থী সম্বন্ধে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর শরণার্থীর পরিসংখ্যান, উদ্দেশ্যমূলক উপ-নির্বাচন আয়োজন ও সেপ্টেম্বর মাসে ইয়াহিয়া খানের জনপ্রতিনিধিদের কাছে ২৭ ডিসেম্বর ’৭১ ক্ষমতা হস্তান্তর করার ঘোষণা থেকে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ওপর বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ ত্বরান্বিত করা হয়।
ইন্দিরা গান্ধী ২৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনের মধ্যে মস্কো সফরে যান এবং পরিস্থিতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাজি করান। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন করে। জাতিসংঘে পোল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে প্রস্তাবও এনেছিল।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখে কলকাতায় প্যারেড গ্রাউন্ডে শ্রীমতী গান্ধীর জনসভা ছিল। আমরা এ দিন জনসভায় উপস্থিত ছিলাম। মিটিং চলাকালে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় একটা চিরকুট দিলেন। ইন্দিরাজী ভাষণ ক্ষণকাল বন্ধ করে দ্রুত তা শেষ করলেন।