মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
হিলারির চৌকস কূটনীতি
ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর
এই হেমন্তে আবারও আমি যুক্তরাষ্ট্রে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলছে বিশাল বনরাজির পাতাগুলোর হলুদ-লালের সমারোহ। প্রকৃতির এই অপরূপ সমারোহের বিপরীতে পরিচিত রাজনীতির পটে এখন আলোচিত হচ্ছে একটি নাম। হিলারি রডহাম ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক নিশ্চিত প্রতিদ্বন্দ্বী।
২০০৮ সালে বারাক ওবামার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থিতা নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন হিলারি। একই সালের জুন মাসে তিনি তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ডেমোক্র্যাট দল কর্তৃক ওবামাকে সমর্থন, সে দেশে বর্ণবাদকে হারানো সামাজিক বিপ্লবের স্পষ্টতর প্রতিফলন এবং সম্ভবত সেই প্রেক্ষিতে আবারও জন কেনেডির উজ্জীবিত ক্যামেলিয়েটের পক্ষ থেকে এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি কর্তৃক ওবামাকে প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ কাজ করেছে। ক্যামেলিয়েটের ভাবধারায় সম্পৃক্ত হয়ে ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই হিলারিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে আমন্ত্রণ জানান। রাজনৈতিকভাবে নিযুক্তীয় সহযোগী ও সহকারীদের তিনি পছন্দমতো নিযুক্ত করতে পারবেন এই শর্তে হিলারি ওবামার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রায় ১৪,০০০ বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কূটনীতিবিদ কাজ করেন। এঁরা হলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অংশ ও প্রযুক্তীয় উপকরণ। তাঁদের সহায়তা করেন প্রায় ১১,০০০ ভিন্নতর সার্ভিস থেকে নিয়ে আসা সুশীলসেবক; এর বাইরে বিদেশে প্রায় ২৭০টি দূতাবাস ও কনসুলেটে প্রায় ৫০,০০০ স্থানীয় কর্মচারীবৃন্দ কাজ করেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অনুবিভাগ হিসেবে দায়িত্ব সম্পাদন করে থাকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রেসিডেন্টের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বাধীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব ও কার্যাবলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, স্বাদেশিক নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ সকল সংগঠনকে সংশ্লিষ্ট করে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের ভিত্তিতে নেয়া হয়। এ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন, তা নির্ভর করে তাঁর যোগ্যতা ও তাঁর অনুকূলে প্রেসিডেন্টের আস্থার ওপর।
হিলারি প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রথম মেয়াদের চেয়ে কিছু বেশি সময় বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির শপথগ্রহণ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালীন তিনি তাঁর নীতি ও কার্যক্রমে দুটি সূত্র অনুসরণ করেন। এক. প্রথাগত প্রত্যয়ের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকে তিনি অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, আইনী ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার সংবলিত করে সার্বিকভাবে সমন্বয়মূলক নীতি ও কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর ভাষায়, এ সব হাতিয়ার চৌকস ক্ষমতার উপকরণ এবং এই চৌকস ক্ষমতাকে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হওয়া সঙ্গত। দুই. বিদেশে এই চৌকস ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সে দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুখ্য নির্বাহীর ভূমিকায় থাকবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারির কার্যকাল বিশ্লেষণ করলে এ কথা স্পষ্টতর হয় যে, তিনি তাঁর নীতি ও কার্যক্রমে এই দুটি সূত্র সবসময় প্রতিপালন ও অনুসরণ করে গেছেন।
রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা বিষয়ক পরিবর্তন বা সংস্কার মূলত প্রশাসনিক বা পদ্ধতিমূলক। এই ভূমিকা কার্যকরণ সূত্র অনুযায়ী চৌকস ক্ষমতার প্রেক্ষিতে কূটনীতিকে জোরদার ও ফলপ্রসূ করার প্রশাসনিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচ্য। পক্ষান্তরে চৌকস ক্ষমতার ভিত্তিতে কূটনীতিকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রযুক্তকরণ বিশেষ পর্যালোচনার দাবিদার। বস্তুত সাম্প্রতিককালে হিলারিকে যুক্তরাষ্ট্র তথা অন্যান্য পশ্চিমা দেশের কূটনীতির এই রূপ রূপান্তরণের দিক-নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যায়।
বিল ক্লিনটন তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা যোশেফ নই (ঘুব) কূটনীতির ক্ষেত্রে চৌকস ক্ষমতা তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৪ সালে নই লেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভিন্নতর দেশকে প্রভাবিত করার জন্য সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সমন্বয়ে গঠিত শক্তি সাধারণভাবে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এর বাইরে কোমল ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমেও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। তাঁর মতে, এ সব ক্ষেত্রে অনুকূলতম নীতি হওয়া সঙ্গত কঠিন ও কোমল ক্ষমতার মিশ্রণ বা চৌকস শক্তির প্রয়োগ। তাঁর মতে, সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে এই চৌকস ক্ষমতাই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভিন্নতর দেশে প্রভাব স্থাপন ও বিস্তারের সবচেয়ে সফল মাধ্যম। এই প্রেক্ষিতে বাইরের পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার এবং স্বার্থ রক্ষা ও প্রসারণের জন্য প্রয়োজন হবে বাণিজ্যের প্রভাব, বিনিয়োগের প্রতিপত্তি, দানশীলতায় অংশীদারিত্ব এবং সামরিক সহযোগিতা। এ সবের জন্য প্রয়োজন হবে সরকারের বাইরেও কূটনৈতিক সম্পর্কযুক্ত দেশের সর্বপর্যায়ের সংগঠন ও জনগণের সঙ্গে সংযোগ ও সম্পর্ক রক্ষাকরণ ও প্রসারণ। বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সঙ্গে সহযোগিতা কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃত দেশে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক লালিত স্বাধীনতার অনুকূলে ভাবমূর্তি স্থাপন ও প্রসারণে হিলারির মতে সবচেয়ে বেশি কার্যশীল। ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেয়ার সময়ে হিলারি বলেন, কূটনীতি ও উন্নয়নকে পৃথিবীব্যাপী উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে এনে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা গর্ববোধ করেছেন। তাঁর এক সহযোগীর ভাষায় হিলারি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্কযুক্ত দেশভিত্তিক বহুধা বিভক্ত ও বিচিত্র পৃথিবীর কাছে পরিচিত করেছেন এবং পৃথিবী এ পরিচিতিকে স্বাগত জানিয়েছে।
হিলারির এই দেশভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সংবেদনশীল চৌকস কূটনীতির কথা বলেছিলাম গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনাকে। সে দিন এ দেশকে জানার আগ্রহে ৬৪ জেলা সফরের মাঝপথে মজেনা এসেছিলেন আমাদের পৈত্রিকবাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া থানার গুলবাহার গ্রামে। চা-পানের পর বাড়ির পাশে আমার পিতা কর্তৃক স্থাপিত স্কুল ও কলেজের মিলনায়তন ভরে আসা ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন তারা জীবনে কে কি হতে চায়।
(বাকী অংশ আগামীকাল)