মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২৬ জানুয়ারী ২০১৪, ১৩ মাঘ ১৪২০
যুদ্ধাপরাধ বিচার ও নতুন ষড়যন্ত্র
তুরিন আফরোজ
একাত্তরে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে গত ১৫ জানুয়ারি মামলা করেছে প্রজন্ম ’৭১ নামের একটি বাংলাদেশী সংগঠন। বাংলাদেশে আমরা যে ‘প্রজন্ম ’৭১-কে চিনি, যার সভাপতি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের পুত্র সাংবাদিক শাহীন রেজা নূর, যে সংগঠনকে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ ২০০০ সালে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতি পদক’-এ সম্মানিত করেছেÑ এটি সেই সংগঠন নয়। অপরাধের বিচার দাবি করা, যে কোন সভ্য সমাজেরই নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সেখানে অপরাধটি যদি হয় গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ তাহলে সামাজিক-রাজনৈতিক কোন রকম আপোসের প্রশ্নই আসে না। এ সকল ঘৃণ্য অপরাধের বিচার হওয়া মানব সভ্যতার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বিচার দাবি করাটাই যদি কোন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, আইনী জটিলতার সুযোগ নিয়ে প্রকৃত অপরাধী ব্যক্তি বা সংগঠনের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ভূলুন্ঠিত হয় মানবতা, সফল হয় অপরাধী-চক্রান্ত।
বিজয় লাভের পর থেকেই বাংলাদেশের জনগণ একাত্তরের সংঘটিত অপরাধের বিচার দাবি করে আসছে। এই দাবিকে সত্য মেনে প্রণীত হয়েছে ১৯৭২ সালের দালাল আইন এবং ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন। ১৯৭২-এ গঠিত হয়েছে দালাল আইনের অধীনে বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র শুধু আইন প্রণয়ন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করেই থেমে থাকেনি, বরং দৃঢ়তার সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে প্রমাণ করেছেÑ এই বিচার বিষয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র জোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
পঁচাত্তরপরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বাধ্য করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধ বিচারের অঙ্গীকার থেকে সরে দাঁড়াতে। রাজনৈতিক পরিম-লে যুদ্ধাপরাধী চক্রের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিটিকে ‘সামগ্রিক বিস্মৃতি’ (ঈড়ষষবপঃরাব গবসড়ৎু খড়ংং)-এর অন্তরালে পর্যবশিত করার পুরোদস্তুর প্রয়াস চালানো হয় বছরের পর বছর। ধ্বংস করা হয় প্রয়োজনীয় দলিলপত্র, নিপীড়ন চালানো হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর, জাতিগত মগজ ধোলাইয়ের উদ্দেশ্যে একাত্তরের ইতিহাসকে পাল্টে ফেলার নগ্ন-ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চালানো হয়।
১৯৯২ সালে ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলন’ সময়ের গতি পাল্টে দেয়। ‘গণআদালত’ থেকে যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিটি আবারও ইতিহাসের রাজপথে নতুন সেøাগানের জন্ম দেয়, নতুন আবেগ নিয়ে আবির্ভূত হয়। কিন্তু থেমে থাকেনি বিচারবিরোধী চক্রান্ত। নিত্য নতুন কৌশল নিয়ে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে তারা একের পর এক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।

॥ ষড়যন্ত্র ১৯৯৩ ॥

গণআদালতের অব্যাবহিত পরই হঠাৎ করে দেখা যায় দেশজুড়ে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিরুব্ধে একের পর এক ফৌজদারী আইনে মামলা করা হচ্ছে। এই তৎপরতায় অনেকেই যারপরনাই খুশি হলেন, ভাবলেন এই তো বেশ বিচার শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটিই ছিল একটি গভীর চক্রান্তের অংশ। ফৌজদারী আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রচুর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, এমনও হতে পারে যে একজন প্রকৃত অপরাধী বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের লোক দিয়ে মামলা করিয়ে একবার খালাস পেয়ে গেলে তাদের আর পুনর্বার বিচারের সুযোগ থাকবে না। এতে লাভ অনেকÑ বিচারের নামে বিচারও হলো, আবার সসম্মানে খালাসও পেল। দায়মুক্তির এর চাইতে বেশি ভাল কৌশল আর কি-ই বা হতে পারে? জাহানারা ইমামের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সামাজিক প্রতিহতকরণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এই ‘পাইকারী দরে’ ফৌজদারী আইনের অধীনে মামলা দায়ের করার ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করা হয়েছে।

॥ ষড়যন্ত্র ২০০৬ ॥

এর পর যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয় দেশের বাইরে থেকে। রেমন্ড সোলেমান নামে এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী যুবক হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ার আদালতে বাংলাদেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বসে। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বেশ দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এরূপ মামলা দায়ের করায় প্রবাসী স্বঘোষিত আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ একজন তো সোলেমানকে ‘বাঘের বাচ্চা’ নামে অভিহিত করে ফেললেন, তাঁর পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণাও চালিয়ে গেলেন। বললেন, নির্মূল কমিটি যা পারেনি, অস্ট্রেলিয়ার এক বাঙালী যুবক তা করে দেখিয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রটি ছিল অন্যরকম। কোনভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদালত থেকে মামলাটি খারিজ করাতে পারলে প্রতিষ্ঠিত হবে যে, একাত্তরে পাকিস্তান বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেনি। এতে লাভবান হবে দু’পক্ষÑ এক, পাকিস্তান রাষ্ট্র কলঙ্কমুক্ত হবে; দুই, পাকিস্তান রাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশী দোসররা পাবে দায়মুক্তি। এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ার কারণে মামলাটি অস্ট্রেলিয়ার কোর্ট গ্রহণ না করে ফেরত দিয়ে দেয়ায় সেই ষড়যন্ত্রটি সফলতার মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়।
মজার ব্যাপারটি হলো, পরে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই সোলেমান ছিল একজন শিবিরকর্মী এবং আইএসআই-এর মদদপুষ্ট এবং অর্থাশ্রিত তথাকথিত ‘বাংলাদেশপ্রেমী’(!)। আর সেই যে আন্তর্জাতিক আইন বিশারদ যিনি সারাবিশ্বে ‘বাঘ মামা’ হয়ে সোলেমানের দায়েরকৃত মামলার পক্ষে ব্যাপক জনপ্রচারণা চালালেন, তিনি পরবর্তীতে ‘স্কাইপি কেলেঙ্কারির’ অন্যতম নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন।

॥ ষড়যন্ত্র ২০০৯ ॥

২০০৮ সালের নির্বাচনপরবর্তী সময়ে যখন যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুটি বাংলাদেশে নতুন গতি পায় ঠিক তখনই শুরু হলো আরেক নতুন ষড়যন্ত্র। এবার যুদ্ধাপরাধ বিচারবিরোধীরা নামল নতুন দাবিতেÑ বিচার হলে তা করতে হবে ওঈঈ-তে। সুতরাং রোম স্ট্যাটিউটে বাংলাদেশকে পক্ষ বানিয়ে ওঈঈ-তে বিচার না করা গেলে নাকি কোন বিচারই হবে নাÑ ‘আন্তর্জাতিক মান’ লঙ্ঘিত হবে। সোলেমানের সেই ‘বাঘ মামা’-কে হঠাৎ দেখা গেল ঘন ঘন বাংলাদেশে আগমন করতে। উদ্দেশ্য একটাইÑ দেশীয় ট্রাইব্যুনাল নয়, বরং ওঈঈ-তে যেন যুদ্ধাপরাধ বিচারটি করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিম-লে জামায়াত-বিএনপি জোটও একই দাবি তুলল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় অনেক প্রথিতযশা আইনজীবীকেও দেখা গেল নির্ভাবনায় দাবি জানাতে যেন ওঈঈ-তে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করা হয়। আর শুরু না হওয়াতে দেশে-বিদেশে সরকার পতনের আন্দোলনকে গতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, ওঈঈ-র কোন এখতিয়ার নেই ২০০২ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে সংঘটিত কোন অপরাধের বিচার করার। তাহলে ১৯৭১-এ সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার কি করে ওঈঈ-তে করা সম্ভব? একটি অর্থহীন অবাস্তব দাবিকে সামনে রেখে যুদ্ধাপরাধ বিচারকে নস্যাত করাই ছিল এই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য।

॥ ষড়যন্ত্র ২০১৪ ॥

গত ১৫ জানুয়ারি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাত্তরের অপরাধের বিচার চেয়ে অভিযোগ এনেছে প্রজন্ম ’৭১ নামক সংগঠনটি। মামলার কপি ১৯ জানুয়ারি জাতিসংঘ অফিস নেদারল্যান্ডের দূতাবাসে দেয়া হয়েছে। (জনকণ্ঠ, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১, কলাম-২) ঐ একই তারিখে (১৯ জানুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদ এক বিবৃতিতে জানান যে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল বাংলাদেশের ভূখ-ের বাইরে কোথাও নতুন করে গঠন করার পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। (প্রথম আলো, ২১ জানুয়ারি, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১৪, কলাম-৮)
ঘটনাপ্রবাহে প্রতীয়মান হয় যে, গত ১৯ জানুয়ারি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলে একই সঙ্গে দুটো সংগঠন (প্রজন্ম ’৭১ ও জামায়াতে ইসলামী) বাংলাদেশে সংঘটিত একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার এবং এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। বিশ্বাস করার জন্য ঘটনাটি খুব বেশি কাকতালীয়। তবে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যে দাবিটি প্রজন্ম ’৭১ তুলেছে তা দুরভিসন্ধিমূলক। কারণ—
প্রথমত
প্রজন্ম ’৭১ নামক সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিচার চেয়ে কোন দাবি এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে গঠিত তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউসন টিম বা মাননীয় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে বলে আমার জানা নেই। উপরন্তু ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে মাননীয় ট্রাইবুু্যুনাল স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে যে, ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব। কাদের মোল্লার আপীলের রায়েও একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। ইতোমধ্যে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে তদন্তের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মাধ্যমে গঠিত তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউসন টিম। এই মর্মে বিশদ রিপোর্টও প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে (উযধশধ ঞৎরনঁহব, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১, কলাম-৬)। সুতরাং দেশীয় একটি তদন্ত ও বিচারিক কাঠামো বহাল থাকা অবস্থায় এবং সেখানে তদন্ত কাজ শুরু হওয়ার পরও কেন তারা ওঈঈ-তে মামলা দায়ের করতে গেলেন এটা মোটেও সুস্পষ্ট নয়।
দ্বিতীয়ত
ওঈঈ-তে যেখানে ২০০২ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে সংঘটিত অপরাধের বিচার কোনক্রমেই সম্ভব নয়, সেখানে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে ওঈঈ-তে মামলা করার মানেই হলো মূলত এই বিষয়ে আমাদের দেশীয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও মামলার অগ্রগতিকে অযাচিতভাবে প্রতিহত করা; অনর্থক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা; নতুবা নিহায়ত পক্ষে ওঈঈ-তে আন্তর্জাতিক বিচারের ধুয়া তুলে দেশীয় তদন্ত ও মামলার কাজকে দীর্ঘায়িত করা।
তৃতীয়ত
বাংলাদেশে চলমান নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার দাবি জানানো বা ঐ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করা হলো বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকীস্বরূপ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকা- রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। অবিলম্বে এ ধরনের ষড়যন্ত্র প্রয়াস নস্যাত করা জরুরী।

লেখক : আইন সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি