মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৮ ভাদ্র ১৪২০
রামু হামলা ॥ নিরাপত্তা বিষয়টি ভাবতে হবে
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়
রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়া এলাকায় বৌদ্ধদের ওপর হামলার এক বছর অতিক্রান্ত হতে আর অল্প ক’দিন বাকি। গত বছর ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২, শুভ মধু পূর্ণিমার বরণ রাতে হামলে পড়েছিল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। সেদিন পূর্ণিমার রাতেই বৌদ্ধরা মধু পূর্ণিমা উদযাপন করছিল। অভিযোগ: ফেসবুকে কোরান অবমাননার ছবি দেখা গেছে এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুক এ্যাকাউন্টে। সে দিন হামলার কিছু আগেও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন বিন্দুমাত্র ধারণা করতে পারেনি এ ভয়াবহতম হামলা সম্পর্কে। তারা ভেবেছিল যে অভিযোগ আনা হয়েছে, হয়ত কিছুক্ষণ মিছিল মিটিং করে অভিযুক্ত যুবককে আইনের আওতায় এনে, অভিযোগকারীরা চলে যাবে। রাত যত ঘনীভূত হচ্ছিল, চারিদিক থেকে সশস্ত্র লোক ট্রাক, মিনিবাস, হোন্ডাযোগে আসা শুরু করেছিল। তারা আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাড়িঘরের বেড়া ভাংচুর চালিয়েছিল। মিছিল নিয়ে যেয়ে প্রথমে আগুন দিয়েছিল লাল চিং বিহারে। আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলতে থাকে রেঙ্গুনী কাঠের কারুকার্যময় কয়েক শত বছরের লাল চিং বিহার। প্রাণভয়ে ছুটতে থাকে নিরীহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়। যে যে দিকে পেড়েছিল বাড়িঘর ছেড়ে, সহায়-সম্বল ফেলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছিল। মুহূর্তের মধ্যেই যেন তা ভয়াল একাত্তর, যেন পাক হানাদার বাহিনীর দোসরা হামলে পড়ছে নিরীহ জনতার ওপর।
লাল চিং বিহার আগুনে পোড়া শেষ না হতেই মৈত্রী বিহারে আগুন দেয়া হয়েছিল। লাল চিং, মৈত্রী বিহার, সাদা চিং, অপর্ণাচরণ পাশাপাশি বিহার। দেখতে লাওসের লুয়ানপবন এলাকার মতো। পর্যটকদের দৃষ্টি আর্কষণ করে সহজেই। মৈত্রী বিহারে থাইল্যান্ড থেকে আনীত পিতলের বুদ্ধমূর্তিটি আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। লাল চিং এর বুদ্ধমূর্তি আগুনে পুড়ে নির্ভীক ধ্যানস্থ হয় খোলা আকাশের নিচে। একই সঙ্গে অপর্ণাচরণ বিহারে আক্রমণ ও আগুন লাগানো হয়েছিল। বিহারের গেটে দুটো সিংহ মূর্তি ছিল, ভেঙ্গে চুরমার করে দিল হামলাকারীরা। বিহারে স্থাপিত সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তিসহ সব শেষ করে দেয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে সাদা চিং এ আক্রমণ করে শ্বেতপাথরের বুদ্ধমূর্তির মাথা ভেঙ্গে দেয়া হলো। তবে বিহারে অনেক চেষ্টা করে আগুন লাগাতে ব্যর্থ হলো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। দানবাক্সসহ লুট করল বিহারের দামী জিনিস। ধর্মাসনে উঠে আনন্দে উলঙ্গ নৃত্য করতে লাগল, যেন মহাবিজয়ী মহাবীর। সারা রাত তা-ব চলছিল অন্য বিহারগুলোতেও। এর পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া, পটিয়ায় হামলা হলো। কী এক ভয়ানক দৃশ্য। মুহূর্তে শেষ করে দিল তিন চার শত বছরের ইতিহাস।
সবাই মনে করেছিল অন্তত রামুর সর্বজন শ্রদ্ধেয় প-িত সত্যপ্রিয় মহাথের’র রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারে আগুন দেবে না। কিন্তু হামলাকারীদের কে ঠেকায়, স্থানীয় প্রশাসন একেবারেই চুপ ছিল। যেন রামুকে স্বাধীন করে ফেলল সে দুবৃর্ত্তের দল। সীমা বিহারে আগুন লাগিয়ে দিল, সত্যপ্রিয় মহাথের পিছন দিয়ে পালিয়ে কোন রকম জীবনটা রক্ষা করল। কিন্তু শেষ হয়ে গেল ৩৫০ বছরে সঞ্চিত শত শত বুদ্ধমূর্তি, প্রাচীন পুঁথিপত্র, লাইব্রেরি, কিছুই বাকি রইল না। রাতব্যাপী অধিকাংশ বিহারে হামলা হলো।
কিন্তু কেন এ হামলা? এ হামলা করে কার লাভ হলো? এখনো আমরা হিসেব মিলেতে পারিনি। কারণ শত বছর ধরে বৌদ্ধ-মুসলমানদের সঙ্গে তো অন্তত রামুর বৌদ্ধদের কোন দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিল না। ছিল না কোন মতবিরোধ। একসঙ্গে ফুটবল মাঠে খেলা করা, ধর্মীয়-সামাজিক উৎসবে যোগ দেয়া, রামুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। তৃতীয় কোন পক্ষ চেয়েছে-কী বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হোক? হয়ত যারা চেয়েছে তারা এখন লাভবান। সেদিন মুসলমান বন্ধুটিকে কখনো মুসলমান মনে হয়নি, বন্ধু মনে করেছি। এখন আর সহজে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত তাদের অনেকের উপর হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঐদিন তারাও হয়েছে বিবেকহীন। এখনো তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় দেখে আমরা আতঙ্কিত হচ্ছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা সেদিন দেশে ছিলেন না। আমেরিকায় জাতিসংঘে শান্তি মিশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ছিলেন। ফিরে এসে ৮ অক্টোবর ২০১২ রামুতে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘোষণা করলেন, বৌদ্ধ বসতবাড়ি ও বিহারগুলো পুনর্নির্মাণ করার। তিনি তাঁর কথা রাখলেন। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে বৌদ্ধ বিহার, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করে দিলেন। দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহারগুলো আবার পেল তাদের হৃতগৌরব। কক্সবাজারে যারা সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যায়, তাদের দ্বিতীয় পছন্দ হলো কক্সবাজার রামু’র বৌদ্ধ বিহারগুলো। এ কাজে হয়ত পর্যটন শিল্পের বিকাশ হবে। বৌদ্ধরা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস ফিরে পাবে। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে। যেখানে অবস্থার সঙ্কট, অবিশ্বাসের দেয়াল সৃষ্টি হয়েছে; সেখানে সে নরপশুগুলোর আবারো হামলে পড়ার আশঙ্খাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
গত ৪ সেপ্টেস্বর, ২০১৩ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা নতুন নির্মিত সব বৌদ্ধ বিহারের শুভ উদ্বোধন করলেন। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোন আন্তরিকতার অভাব আমরা দেখিনি। তাছাড়া সেনাবাহিনী না হলে এ অল্প সময়ে এক সঙ্গে এত বিহারের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া দুরূহ ছিল। নিজে বেশ কয়েকবার গিয়েছি নির্মাণ কাজ স্বচক্ষে দেখার। সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদসস্যরা কী কষ্ট করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নতুন বৌদ্ধ বিহার হলো। প্রাণচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর। কিন্তু বৌদ্ধদের শঙ্কা কী কেটেছে? যারা ২৯ সেপ্টেম্বর হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল প্রকাশ্যে এখনও তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনা যায়নি। রহস্য উদঘাটিত হয়নি কেন এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটল? দেশ বিদেশে যারা দেশের সুনাম ক্ষুণœ করল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করল, তাদের কী সাজা হবে না? এ প্রশ্ন সাধারণ বৌদ্ধদের মতো আমারও। নান্দনিক বৌদ্ধ বিহারগুলো দেখে আমিও খুশি হয়েছি। অজানা শঙ্কা এগুলোর ওপর কী আবার আঘাত আসবে না? অনেক অভিযুক্ত আসামি প্রধানমন্ত্রীর আগমনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি’র সঙ্গে তাদের ছবি লাগিয়ে পোস্টারিং করেছে, যা গণমাধ্যমে খবর এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে তাদের অপরাধ ঢাকার প্রয়াস অপকৌশল ছাড়া আর কী?
আচার্য সত্যপ্রিয় মহাথের প্রধানমন্ত্রীর সামনে দেয়া ভাষণে, নিরাপত্তা বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘কেবল একজন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, এ পর্যন্ত আপনি যা করেছেন, তা আমার কাছে মনে হয়েছে মানবতাকেই রক্ষা করেছেন। জাতির জনকের কন্যার পক্ষেই সম্ভব অসাম্প্রদায়িক, সুখী, সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে। আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং আমাদের স্থায়ী নিরাপত্তা প্রত্যাশা করছি।’
আমি এ কয়দিন রামুতে অবস্থান করে উপলব্ধি করেছি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এত কিছু করার পরও বৌদ্ধ যুবকদের মনে অজানা কিছু ক্ষোভ রয়ে গেছে। সেটা অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনা। যারা এ হামলার পরিকল্পনাকারী, যারা সম্প্রীতি নষ্টকারী, অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টকারীদের। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের সব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটা না হলে রাষ্ট্রের ওপর দায় থেকেই যায়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে যারা ফায়দা লুটতে চায়, সেই সুযোগ সন্ধানীরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টিই এসব হামলা ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে দেশেকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চাইলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তা একমাত্র সম্ভব সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মুক্তবুদ্ধির মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যেমে। আমরা চাই না এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। স্থায়ী নিরাপত্তাই দিতে পারে বৌদ্ধদের স্বস্তি ও বিশ্বাস।

লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন
ংড়ঁমধঃধ৯৫@মসধরষ.পড়স