মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৮ ভাদ্র ১৪২০
দারিদ্র্র্যবিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ ও রাজনৈতিক অর্থনীতি
ড. মিহির কুমার রায়
বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনের জনক এবং বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খান ১৯৫৯ সালে বার্ড প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬১-৬২ সালে এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর উপজেলায় ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচী চালু করা হয়। সে সময় কুমিল্লার অভয় আশ্রমে ইউনাইটেড ব্যাংক লি. নামে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা স্থাপন করা হয় সমবায়ীদের সঞ্চয় ও ঋণ সেবা প্রদানের জন্য। বার্ড থেকে প্রকাশিত ঞযব ঈড়সরষষধ জঁৎধষ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ ঊীঢ়বৎরসবহঃ (ঋরভঃয অহহঁধষ জবঢ়ড়ৎঃ, ১৯৬৬-৬৭) -এ উল্লেখ আছে যে, উল্লেখিত বছরে তিন হাজার টাকা ঋণ প্রদানের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৬৩-৬৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে চার হাজার সাত শ’ টাকায় উন্নীত করা হয়, যা ১৯৬৭-৬৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ঋণের সফলতার প্রেক্ষিতে বার্ড ১৯৭৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশের তিনটি জেলার আটটি গ্রামে শুরু করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আর্থিক সহায়তায়। এই প্রকল্পটি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সরকারী মালিকানায় প্রথম ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ছিল, যা বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ নামে প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৫-এ যদিও গ্রামীণ ব্যাংকের শুরু ১৯৭৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু ড. ইউনূস বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৭৯ সালে টাঙ্গাইলে প্রথম বড় আকারে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে, যা কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকায় সুদীপ্ত সেনগুপ্তের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি এ কথা বলেছেন। এতে আরও উল্লেখ আছে, ১৯৭৬ সালে ড. ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে জামিনদার হয়ে জনতা ব্যাংকের গ্রামীণ শাখা থেকে কয়েকজন ভূমিহীনকে দশ হাজার টাকা ঋণ পেতে সহায়তা করেছিলেন। তার পরপরই কিছুদিন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, মদনহাট শাখা, চট্টগ্রামে এই কর্মসূচীতে ক্ষুদ্রঋণ যোগান দিয়ে যায়। এই যদি হয় ক্ষুদ্রঋণের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার সময়কাল, তা হলে এ নিয়ে কোন দ্বিধা-দ্বন্দের কোন কারণ নেই অন্তত দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বিবেচনা করে। কিন্তু প্রায়শই যে প্রসঙ্গটি চলে আসে, তা হলো: ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস। এ বলতে কোন সংশয় নেই যে, গ্রামীণ ব্যাংক মডেলটি বিশ্বের দরবারে ক্ষুদ্রঋণকে সফল বিপণনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সহায়তা করেছে। এখানেই ড. ইউনূসের কৃতিত্ব। গ্রামীণ ব্যাংক তার ৮.৪ মিলিয়ন ঋণ গ্রহীতাকে এ কথাটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, গরিবের ঘরে জন্মগ্রহণ করা কোন ভুল নয়, কিন্তু গরিব থেকে মৃত্যু বরণ করা জীবনের জন্য মারাত্মক ভুল। তখনই প্রশ্ন আসে সারা জীবনের জন্য যদি একজন মানুষ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে থেকে নিজেকে বের করে আনতে না পারে তা হলে এর চেয়ে ব্যর্থতা কী হতে পারে। তাই প্রশ্ন আসে দায়বদ্ধতা নিয়ে- কে কার কাছে দায়বদ্ধ এবং কিভাবে দায়বদ্ধ? এর সঠিক উত্তর যদি পাওয়া যায়, তাহলে কোন সমস্যাই সমস্যা হিসেবে থাকে না, আর দারিদ্র্য বিমোচন হতে বাধ্য। ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের পরিবর্তে অধিকতর মর্যাদাশীল বিকল্প স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের এবং আয় উপার্জন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। বর্তমানে দেশের অন্তত সরকারী চৌদ্দটি মন্ত্রণালয় এবং তার অধীনস্থ বিভিন্ন আধা সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত এবং এডিপিভুক্ত কিছু সংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বিপুলসংখ্যক বেসরকারী সংস্থা ও সমবায় সমিতি ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জানা গেছে যে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার সংখ্যা প্রায় আটাশ হাজার, শাখার সংখ্যা ৬৮ হাজার প্রায় এবং এর মাধ্যমে প্রায় ৩.৩০ কোটি সুফলভোগী ক্ষুদ্রঋণের আওতায় এসেছে, যার ফলে বিগত এক দশকে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪.৭০ কোটি, যার অর্ধেক রয়েছে হতদরিদ্র। এই উপাত্ত অনুযায়ী, এখনও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যদিও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৬%, আর দারিদ্র্য কমার হার ১.৪৪% । এই যে সাফল্য, এতে এককভাবে কেউ কৃতিত্বের অংশীদার নয়। এটি সকলের সামগ্রিক চেষ্টার ফসল মাত্র। যদিও গ্রামীণ ব্যাংক মডেলটি বেশি করে স্বীকৃতি পেয়েছে এককভাবে নোবেল প্রাপ্তির ফলে। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই এই নোবেল প্রাপ্তির অংশীদারিত্বেরও দাবিদার হতেই পারে। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও তাদের প্রতিষ্ঠানসহ উদ্ভাবক এই বিষয়টিকে সাধারণভাবে নিয়েছেন কি? বাস্তবিক পক্ষে, সামষ্টিক প্রচেষ্টায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকাটা অনেক চলকের মধ্যে একটি প্রধান উপাদান বলে বিবেচিত। বিষয়টির একটি বড় অংশীদার সরকার । সেই প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর একটি সমন্বিত নীতিমালা গেজেট আকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংক, সরকারী সংস্থা এবং এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচী সমূহ বণ্টন ও ব্যবহারের দ্বৈততা, সুদের হার ও শর্তাদির বিভিন্নতা, শর্ত নির্ধারণে সমন্বয়হীনতা এবং অধিক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এই বিবেচনায় ঋণ বিতরণের অনুসরিত দীর্ঘসূত্রতা, ক্ষেত্রবিশেষে গতানুগতিকতা অনুসরণের প্রবণতা, নতুন আয়বর্ধনমূলক ক্ষেত্র শনাক্তকরণ এবং সঞ্চয় কার্যক্রম উদ্ভাবনে গতিশীলতার অভাব মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পণ্যের বহুমুখীতা আনয়নে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ভূমিকাকে শক্তিশালীকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে অর্থবহ করতে সমন্বিত নীতিমালার অপরিহার্যতা অনুভূত হয়। সে লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচীর আওতায় আবর্তক ঋণ তহবিলের সুশৃঙ্খল গঠন, পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন, বিতরণের অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়ন, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারের ফলপ্রসূতা সম্প্রসারণ, সুদের হার নির্ধারণে দাতা গ্রহীতার স্বার্থ সংরক্ষণ, পরিবীক্ষণ-নীরিক্ষাকে যুক্তিসঙ্গতকরণ এবং সর্বোপরি অব্যাহত মূল্যায়নের মাধ্যমে পদ্ধতি প্রক্রিয়াকে সরলীকরণের লক্ষ্যে যৌক্তিক, প্রয়োজনীয় ও সমীচীন বিবেচনা করে জনস্বার্থে সরকার সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) জড়িত ছিল প্রথম থেকে।
জাতিসংঘ ২০০৫ সালকে ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০০ মিলিয়ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু একটি কথা প্রায়শই শোনা যায় যে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ঢাকা স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আয়োজিত ৩৭তম বেঙ্গল স্টাডিজ কনফারেন্সে ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থানা পরিচালক ড. ইউনূসের তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়, এনজিওদের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কর্মসূচী ত্রুটিপূর্ণ, যা দরিদ্রকরণ প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত এক গবেষণায় দেশের ১৪ কোটি মানুষকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করে বলেছেন, এর মধ্যে ৬৪% মানুষ হলো দরিদ্র, যাদের ঋণের টাকা দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের এ সকল নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বে¡ও সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণের প্রচার ও প্রসার চালিয়েছে। বেসরকারী খাতে ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহের জন্য ১৯৯০ সালে সরকার পি.কে.এস.এফ. গঠন করে এবং ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত ২৬৫টি সহযোগী সংস্থার ৮০.৬২ লাখের মধ্যে মোট ৬০৭৯৪.২৭ কোটি টাকা বিতরণ করে যেখানে আদায়ের হার ৯৮.০৩% (উৎস : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১) । এম.আর.এ প্রদত্ত মতে দেশের বৃহৎ ত্রিশটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠ্ান (গ্রামীণ ব্যাংক ব্যতীত) ১৫.২৫ কোটি সদস্যের মাঝে ২১৩০৪ কোটি টাকা বিতরণ করে। গ্রামীণ ব্যাংক ৬৪ জেলার ৮১৩৭৬টি গ্রামে ৮.৪ মিলিয়ন দরিদ্র জনের মাঝে ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত ক্রমানুপঞ্জিত হারে ৬০৪০০.৪৭ কোটি টাকা বিতরণ করে যেখানে আদায়ের হার ৯৭.৩৮%। দেশের চারটি সরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত ৯৩.৭০ লাখ গ্রাহকের মাঝে মোট ১০১৯১৮৬.৬৯ কোটি টাকা বিতরণ করে যেখানে আদায়ের হার ৯৩.৩৬% ।একই সময়ে দুটি বিশেষায়িত ও ছয়টি বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৮.৮৫ লাখ ঋণগ্রহীতার মাঝে মোট ১৫৩৬৬৫.২ কোটি টাকা বিতরণ করে যেখানে আদায়ের হার ৯৫%। সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একই সময়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে ৮১৫৩৭.৪৮ কোটি টাকা যেখানে আদায়ের হার ৮৬% । গত ৩১ আগস্ট, ২০১৩ তারিখে ক্ষুদ্র ঋণের নানা দিক নিয়ে এক সাক্ষাতকারে ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফিনান্সের নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, ‘আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হবে ক্ষুদ্রঋণ। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে ।’ দেশে এখন ৩.৩০ কোটি সদস্য ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে জড়িত। সময়ের আবর্তে এই ঋণ এখন মাইক্রো এন্টারপ্রাইজে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে জামানতবিহীন ১০-১৫ লাখ টাকা করে ঋণ বিতরণ চলছে। এই যে ক্ষুদ্রঋণের প্রচার ও প্রসার তারপরও দেখা যায়, দেশে মোট ঋণ বিতরণের ক্ষুদ্র ঋণের হার শতকরা হারে নগণ্য। এর পরেও প্রতিনিয়তই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে শোনা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসই ক্ষুদ্রঋণের জনক ও তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই ঋণের প্রসারকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই বক্তব্যটি আংশিক সত্য হলেও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ক্ষুদ্র ঋণের চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেমন- আদর্শিক রাজনীতির অনুশীলন, সন্ত্রাসবাদ দমনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা , সম্প্রসারণ বাদ নীতি পরিহার, নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা ইত্যাদি। বর্তমান বাংলাদেশে দারিদ্র্যের রাজনীতি এবং এতে ক্ষুদ্রঋণকে ব্যবহার করার যে প্রচেষ্টা গ্রামীণ ব্যাংক ভবনের ১৬ তলায় প্রতিষ্ঠিত ইউনূস সেন্টার থেকে শুরু করা হয়েছে তা এই জাতিকে নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই কেন্দ্র থেকে সময় সময় যে সকল ঘোষণা আসছে, তা আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে কোন ফেক্টর হিসাবে দেখা দিবে কী না তা ঘরোয়া রাজনীতির একটি আলোচনার বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি ড. ইউনূস বলেছেন, রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে অনেক দলের নেতারা মতবিনিময় করতে আসছেন এবং সরকার যদি মনে করেন তবে তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘দেশে অশান্তির কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে, মানুষ এই অশান্তি চায় না,আমরা দেশে শান্তি চাই এবং কেয়ার টেকারের অধীনে নির্বাচন হলেই দেশে শান্তি আসবে’। তবে ড. ইউনূস নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবেন বলে মনে হয় না, কারণ তিনি জানেন ,এতে লাভ হবে না। তবে তিনি আওয়ামী সমর্থিত মহাজোট সরকারের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার নেতৃত্বে তার অনুসারী বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে যে রাজনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছেন তাতে বিএনপি জোট লাভবান হবে বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে ক্ষুদ্রঋণের জনক বলে পরিচিত ড. ইউনূস যে ক্ষুদ্রঋণকে রাজনৈতিক আসনে নিয়ে যাবেন তা কিন্তু ৮.৪ মিলিয়ন ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা ও পঁচিশ হাজার চাকরিজীবী বুঝে উঠতে পারছে না। কারণ তারা এটা ভাল করেই জানেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক খেলা চিরস্থায়ী ফলদায়ক নয়। এই ধারণা যদি সত্যি হয় তবে, এ খেলায় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাই বা কি? এবং ক্ষুদ্রঋণকে কেনইবা এর মধ্যে জড়ানো হবে যেখানে দরিদ্র জনগণের জীবনজীবিকার বিষয়টি রয়েছে। কোন ব্যক্তি বিশেষ গ্রামীণ ব্যাংককে ও ক্ষুদ্রঋণকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে তা হতে দেয়া যায় না বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে। তাইতো সরকার এ বিষয়টিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে এর সংস্কারে হাত দিয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোতে গণতন্ত্রায়ণ স্থান পাবে এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যা এতদিন অনুপস্থিত ছিল। সরকারের এই মহতী উদ্যোগ বিলম্ব হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আশার আলো হয়ে আগামী দিনে সমাজ উন্নয়নের পথকে কলঙ্কমুক্ত করবে এটাই প্রত্যাশা রইল।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, সিটি ইউনির্ভার্সিটি, ঢাকা