মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২ ভাদ্র ১৪২০
ডলি ও মিতা- দু’টি খসে পড়া তারা
বেগম মমতাজ হোসেন
‘মানুষ মরণশীল’- এই প্রবাদটি সব চাইতে বড় সত্য। শৈশবকালে পাঠ্য পুস্তকে পড়েছিলাম। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে।’ এত বড় সত্যি কথা মানব জীবনে স্থায়ী হয়ে রয়েছে, তাই আমরা একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নেই তার ললাটে মৃত্যুর সঙ্কেতও লেখা হয়ে গেছে। একজন মানুষের মৃত্যুর খবর পেয়ে যারপরনাই ব্যথিত হলেও জীবনের এই চির সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করি। কিন্তু কিছু মৃত্যু যখন অস্বাভাবিকভাবে ঘটে থাকে তখন এই মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করা যায় না। খুন-খারাবি, আত্মহত্যা- এ ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে এমন সব দুঃখ ও রহস্যজনক ঘটনা লুকিয়ে থাকে যা সকলের অজ্ঞাত থাকে। তবু এ অজ্ঞাত ঘটনাগুলো জানার জন্য প্রিয় বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনের মন আকুলী-বিকুলী করে। কখনও বা রহস্যময় ঘটনাগুলো উন্মোচিত হলেও তার কোন বিচার হয় না। হয় না কোন মিটিং মিছিল, গর্জে ওঠেনা কোন প্রতিবাদের ঝড়। অথচ কাছের বা ভালবাসার মানুষগুলোর হৃদয়ে প্রতিনিয়ত অব্যক্ত যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত। মনে পড়ে প্রখ্যাত অভিনয় শিল্পী ডলি ইব্রাহিমের কথা- আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগে, বাংলাদেশের বেতার টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত জন নন্দিত অভিনয় শিল্পী ডলি আনোয়ার বিষপান করে আত্মহত্যা করেছিলেন। কেন করেছিলেন সে বিষয়টির চাইতে ডলির আত্মহত্যার চিত্রটি পত্রিকায় রং চং মাখিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। সংবাদের মূল বক্তব্য ছিল- সন্ধ্যা বেলায় দুই বান্ধবী তার কাছে আসে এবং একটি খাম হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। তারপর ডলি সুন্দর করে সাজগোজ করে লম্বা পাড়ের শাড়ি পরে কপালে লাল টিপ দিয়ে ঘরে রাখা ইঁদুর মারা ওষুধ র‌্যাটম পান করে বিছানায় শুয়ে থাকে এবং মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। গৃহে একমাত্র পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাই পাড়াপ্রতিবেশীরা ডলিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। ডলির স্বামী প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন অনেক পরে ফিরে আসেন। ডলি ইব্রাহিমের মাতা ড. নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নারী নেত্রীদের পুরোধা। পিতা ছিলেন চিকিৎসক। ডলির বাপের বাড়িতে মৃত্যু সংবাদ দেয়া হলে তাঁরা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে চলে যান। ডলির বোনের বর্ণনায় জানা যায়, ডলির মৃতদেহটি অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে, মর্গে- পরনে ছিল কালো লম্বা স্কার্ট এবং গায়ে ঝোলানো কোর্তা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত শৈল্পিক মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল কোথায়? ডলির মৃত্যুর পর তাঁর স্বামীর ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না, পথে পথে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ানোর মাঝে ডলির বিরহে কাতরতায় তাঁর কাতর চিত্তের নমুনা তখনকার মানুষের মনে গভীর সমবেদনার উদ্রেক করেছিল। কিন্তু পরে সত্য ঘটনা চাপা থাকেনি। ডলির মৃত্যুর কারণ ছিল তাঁর স্বামী। অভিযোগ : পরকীয়ায় একরকম পাগল হয়ে তিনি ডলিকে তালাকনামা প্রেরণ করেন সেই দুই বান্ধবীর মাধ্যমে। ডলির মতো একজন শিক্ষিত উচ্চবংশীয় নারীর এই তালাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার কথা নয়। বেশ কিছুদিন ধরে তার স্বামীর সঙ্গে মনমালিন্য চলছিল বিধায় স্বামীর গৃহত্যাগ করে পিতৃগৃহে আশ্রয় চেয়েছিল ডলি, কিন্তু তাঁর মা একজন- উচ্চশিক্ষিত নারী নেত্রী হওয়া সত্ত্বে¡ও পুরনো দিনের সংস্কারকে পরিত্যাগ করতে পারেননি। তিনি ডলিকে স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিয়ে থাকতে বলেন। সবকিছুর পেছনে ছিল আত্মসম্মান ও সামাজিক মান-মর্যাদা। ডলির মৃত্যুর পরে তাঁর মা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছিলেন, আমার মেয়েকে আমি আশ্রয় দেইনি বলেই সে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে, এজন্য আমিই দায়ী। মাতার এই মহান স্বীকারোক্তিতে পার পেয়ে গেল তাঁর স্বামী যে অতি ঠা-া মাথায় সুকৌশলে ডলিকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিল। ডলির হারিয়ে যাওয়ায় বাংলা সংস্কৃতি অঙ্গন অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল।
কিন্তু ডলির স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করে সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করেছেন- একথা জনমুখে শোনা যায়।
ঠিক বাইশ বছর পর একই তারিখে ডলির মতো আর একজন শিল্পী মিতানূরের অস্বাভাবিক মৃত্যু গোটা নারী সমাজকে নাড়া দিয়েছে। দুটি জীবনের ঘটনা ও মৃত্যু এমন গোটা নারী সমাজকে নাড়া দিয়েছে। দুটি জীবনের ঘটনা ও মৃত্যুর এমন মিল দেখে অবাক হতে হয়। ডলি এবং মিতানূর অপরিণত বয়সে ভালবেসে অনুপযুক্ত দু’জন তরুণকে বিয়ে করে পরিবারকে না বলে। ডলির পরিবার কুসংস্কারমুক্ত বিধায় এ বিয়েকে মেনে নেয়। কিন্তু মিতানূরের পিতা গ্রাম্য শালিসীতে বিচার দেন এবং মিতাকে শরিয়ত মতে মাতা- পিতার অবাধ্য হওয়ার কারণে ৭০টি র্দোরা মারার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই গল্পটি মিতা নিজেই আমাদের অনেকের সামনে হাসতে হাসতে বলেছিলÑ আমি ভয়ে শিহরিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি সত্তর ঘা দোররার আঘাত কি করে সইলে? মিতা উত্তরে বলেছিল, প্রথম তিনটি আঘাত জোরে মারা হয়েছিল, পরেরগুলো টুকটুক করে মেরেছিল। কথাগুলো বলতে বলতে মিতা হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে। গর্বকরে বলেছিল, ওর স্বামীর মতো এত ভাল মানুষ আর হয় না। ওকে এত ভালবাসে, এত উপহার দেয় যা খুব কম মেয়ের ভাগ্যে জোটে। তবে তাঁর মাতা-পিতা ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কঠিন ব্যবহার তাঁকে অনেক কষ্ট দেয়। মিতা অল্প বয়সে বিয়ে করে অসচ্ছল স্বামীর সংসারের জন্য রাত-দিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। বিজ্ঞাপন ও নাটক করাই ছিল তার প্রধান উপার্জনের পথ। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পরিশ্রমে একটি ফ্ল্যাট, একটি গাড়ি কিনে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছিল। তাতে মিতা গর্বিত ছিল। দুটি পুত্র সন্তান নিয়ে মিতার রঙিন স্বপ্নের কথা আমাদের কাছে হরহামেশাই বলত। মিতাকে দেখে কখনও মনে হয়নি তাঁর সংসারে কোন অশান্তির স্পর্শ আছে। মিডিয়ার অভিনেতা অভিনেত্রীদের নামে নানা রকম দুর্নাম প্রচার করা হয়, কিন্তু মিতার ক্ষেত্রে কোন দুর্নাম বা স্ক্যান্ডাল জাতীয় মন্তব্য শোনা যায়নি। মিতা কিভাবে আত্মহত্যা করতে পারে সেটা আমাদের কাছে একটা বিরাট বিস্ময়।
বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার রচিত একটি সুবৃহৎ ধারাবাহিক নাটক ‘ললনা’ প্রচারিত হচ্ছে। মিতা এই নাটকের মূল নায়িকা চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় করছিল। বিগত আড়াই বছর যাবত সপ্তাহে অন্তত তিনদিন নাটক রেকর্ডিং ও রিহার্সেলে দেখা হতো। গত ২৮/৮/২০১৩ পত্রিকায় জানতে পারলাম মিতার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আত্মহত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং মিতার পিতা এর সমর্থন করে জানিয়েছেন এর আগেও মিতা দু’দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। কথাটি বিশ্বাস করা যায় না, কারণ আত্মহত্যা ব্যাপারটি ঘটলে তাকে অন্তত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো। তাতে আমাদের নাটকের রেকর্ডিং অবশ্যই ব্যাহত হতো। মিতা তাঁর কাজের প্রতি এতটা মনোযোগী ছিল যে রেকর্ডিংয়ের দিন তিনি সব শিল্পীর আগেই টেলিভিশনে উপস্থিত থাকতেন। দু’একদিন দেরি হলে তিনি তা আগেই ফোন করে জানাতেন। মিতার পিতার জবানবন্দীতে জানা যায়, তাঁর স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হতো না। পিতার অমতে বিয়ে করে প্রায় ৪২ বছর জীবনের অধিকাংশ সময়ই স্বামীর সঙ্গে সুখের সংসার করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। এখানেও মিতার ভক্তদের মনে নানা রকম প্রশ্নের উদয় হয়েছে। জানিনা কি কারণে মিতাকে অকারণে জীবন বিসর্জন দিতে হলো?
ডলি ইব্রাহিমের মাতার যে আক্ষেপ ছিল সেই আক্ষেপের সঙ্গে মিতার পিতার সাফাই জবানবন্দী এক নয়। ডলির মাতার আক্ষেপের ভেতর ছিল সমাজ মানবতা এবং সমাজের কঠিন সংস্কার কিন্তু মিতার পিতার জবানবন্দীতে আমরা কোন গ্রহণযোগ্য সান্ত¡Íনা খুঁজে পাইনি। এই পৃথিবীতে মাতা-পিতার সন্তান হারানোর বেদনা সব চাইতে দুঃখজনক। কিন্তু মিতা ও ডলিকে হারানোর বেদনা সংস্কৃত অঙ্গনকে চিরকাল কুরে কুরে খাবে। আমি উভয়ের আত্মার শান্তি কামনা করি। যেখানেই তারা থাকুক না কেনÑ পৃথিবীর সব জ্বালা যন্ত্রণার উর্ধে যেন থাকে। সবার কাছে তারা অমর।
সবশেষে রবিঠাকুরের কবিতার একটি চিরসত্য লাইন মনে পড়েÑ
‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’

লেখক : নাট্যকার