মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
আওয়ামী লীগের চরিত্র হনন ও খালেদার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দখল প্রসঙ্গে
মমতাজ লতিফ
বিগত ৫, ৬ মে শাপলা চত্বরে তেঁতুল তত্ত্বের উদ্ভাবক মাওলানা শফীর হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক আয়োজিত সমাবেশ ৫ তারিখ ৩টায় শুরু হয়ে পাঁচটায় শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেত্রীর কঠোর নির্দেশের কারণে এবং বিনাশ্রমে শুধু বসে থাকার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের লোভে ৫ তারিখ ঐ চত্বরে সারারাত অবস্থান নেয় তারা। মধ্যরাতে জামায়াত-শিবির-বিএনপির ক্যাডারদের দ্বারা ঐ স্থানে যে ভয়াবহ আগুন, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, মসজিদ, অফিস, ব্যাংক, ফুটপাথের দোকানের সর্বস্ব, এমনকি শত শত কোরান হাদিস পোড়ানো হলো, তার অনেক পরে পুলিশ শুধু সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছুঁড়ে পাঁচ মিনিটে যখন সবাইকে, অর্থাৎ কয়েক শ’ ভীতসন্ত্রস্ত শিশু-কিশোর মাদ্রাসা ছাত্রকে সরিয়ে দিল; তখন পুলিশের এমন ভদ্র আচরণে টিভিতে সারারাত লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে থাকা জনগণ খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিল। লাইভ টেলিকাস্টে আগুন, ধ্বংসযজ্ঞ, দোকানিদের কান্না, পোড়া কোরান-হাদিস, উপড়ানো বৃক্ষ, ক্ষতবিক্ষত ডিভাইডার, রাস্তাÑএগুলো দেখার সময় বর্বর আচরণের বিপরীতে পুলিশের ঐ নিরীহ আচরণ আমি কেন কেউই প্রত্যাশা করেনি। বরং পরদিন ঐ তেঁতুল শফীকে সরকারের উদ্যোগে বিমানে করে চট্টগ্রাম পৌঁছানো রীতিমতো অনেককেই বিস্মিত করেছে। অর্থলোভী মোল্লারা মাদ্রাসার শিশু কিশোরদের অজানা, অচেনা ঢাকার রাজপথে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা গ্রেফতার এড়াতে অনেক আগেই সরে পড়েছিল। আর এদের প্রতি রাজকীয় মেহমানের মতো আচরণ দেখে ক্ষুব্ধ হলেও জানি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাই শত্রুর প্রতি এই আচরণ করতে পারেন। অথচ খালেদা-তারেক, তাদের বিরুদ্ধবাদীদের জেলেই শুধু নয়, প্রাণে বাঁচতে দিত কিনা, সন্দেহ আছে! তারপরও তেঁতুল মোল্লারা তাদের স্বাভাবিক মিত্র খালেদার কাছে সবসময় নতজানু থাকবে, থাকছে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর খালেদা ক্ষমতা দখলের জন্য যে কাউকে ব্যবহার করবেÑ এ তো জানা কথা। আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পর মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিচালক ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম চার জাতীয় নেতা হত্যা কান্ডের পর দ্রুতগতিতে জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকারীদের এবং বিচারাধীন এগারো হাজার যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাদের নানাভাবে পুরষ্কৃতও করেন। উপরন্তু যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে, সংবিধানকে ইসলামী করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, অগণতান্ত্রিক পন্থার অনুসারী হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন জিয়াউর রহমান। অপরদিকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি, ভোটের রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করে তিনি গণতান্ত্রিক ভোটের রাজনীতিকে ‘ডিফিকাল্ট’ করে তোলার লক্ষ্যে মাঠে নামিয়ে দেন বন্দুক। যখন মোটরসাইকেল- পেশী-কালো টাকা ছড়িয়ে ‘মেধা’কে ব্যঙ্গ করে মেধাবীদেরই অপর দলের বিরুদ্ধে ‘ক্যাডার’ হিসেবে লাগিয়ে দেন, তখনই জিয়াউর রহমানের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নস্যাত করার সুদূরপ্রসারী নীলনকশাটি উদ্ঘাটিত হয়ে যায়!
সুতরাং তার স্ত্রী খালেদা নেতৃত্বাধীন বিএনপি যে ঐ নীলনকশার কুশীলব হিসেবে নির্ধারিত ভূমিকা পালন করবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকার কোন কারণ নেই। এতেও কোন দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই যে, সেই নীলনকশা বাস্তবায়নে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী দল ও এর নেতাদেরও নির্ধারিত ভূমিকা ছিল যা তারা ’৭১ থেকে পালন করে চলেছে । এবং একের পর এক মৌলবাদী, জিহাদী জঙ্গী গ্রুপ গঠন করে দেশে হত্যা, গুম, ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালিয়ে দেশের ও জাতির উন্নয়নকে বিঘিœত করে চলেছে। দু’টি বিষয় জিয়া, খালেদা, তারেক ও যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত জাতির কাছে স্পষ্ট করেছেÑ
১. ’৭১ থেকে যে বাংলাদেশ বিরোধী নীলনকশা বাস্তবায়ন করা শুরু হয়েছিল, তার প্রণেতা আইএসআই ও পাকিস্তানী সামরিক-বেসামরিক নেতারা এবং বাস্তবায়নকারী ছিল প্রধানত জামায়াত ও এর অঙ্গ সংগঠন ছাত্র সংঘ যা এখন ছাত্রশিবির, একদল বাঙালী সেনা কর্মকর্তা, তাদের স্ত্রী, পুত্র এবং বেসামরিক আমলা ও রাজনীতিক। পরে, এতে অন্তর্ভুক্ত হয় সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি, কিছু নীতিভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী, অন্য পেশাজীবী সদস্য। পরে জিয়া ও এরাই বিএনপি গঠনে ভূমিকা রাখে,যাদের পাশে থাকে জেলায় জেলায় জন্ম নেয়া টাউট-দুর্বৃত্ত দল।
২. এদের সবার যৌথ আক্রমণের টার্গেট ‘৭১ থেকেই মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী দল আওয়ামী লীগ, বাঙালী সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিন্দু ও সংস্কৃতি সেবী, প্রগতিশীল দল ও ব্যক্তি এবং গণতন্ত্র ।
গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে সহজতম উপায় শেখা যায় খালেদার কাছে তা হচ্ছে- যা নির্বাচন পরিচালনাকারী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে দখল করা এবং দখলকৃত নির্বাচন কমিশনের সাহায্যে এবং প্রশাসনের সাহায্যে বিপুল জাল ভোটার ব্যবহার করা। এই দু’টি কাজই খালেদা জিয়া-তারেক-লতিফুর গং করেছিল ২০০১-এর নির্বাচনে, যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বিদেশী শক্তি এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসন। ঐ দখলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুরোপুরি বিএনপি তথা খালেদা-তারেকের ইচ্ছা পূরণ করেছিল। শোনা যায় ঐ নির্বাচনে আইএসআই একটি বড় অর্থ সহায়তা দিয়েছিল, যার একটি বড় অংশ সেনাবাহিনীকেও প্রভাবিত করার কাজে প্রদান করা হয়েছিল। আরও শোনা যায়, তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যে সুন্দরী তরুণী সহকারী সচিব কর্মরত ছিল, সে এসব বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিল। নির্বাচনের ফল প্রকাশের দু’তিন দিনের মধ্যে সে তার স্বামীসহ নিজ সরকারী কোয়ার্টারে সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হয়। এই মৃত্যু এটা নিশ্চিত করে যে, দুর্বৃত্তায়নের সাক্ষীদের দুর্বৃত্তরা প্রাণে বাঁচিয়ে রাখে না। সে সময়ে সংবাদপত্রে এ বিষয়ে অনেক খবর বের হয়েছিল, যেমন নির্বাচনে চার সচিবের ভূমিকা সম্পর্কেও অনেক খবর বের হয়েছিল। তার পরের পাঁচ বছর যাবত যত দুর্বৃত্তায়নের, নির্যাতন-ধর্ষণের, হত্যার, গ্রেনেড-বোমা হামলার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যেভাবে সরকারী প্রশ্রয়ে বাংলা ভাই-রহমান গং-এর জেএমবির উত্থান ঘটেছে, যেভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতা-কর্মী, হিন্দু, আদিবাসীরা নির্যাতিত ও নিহত হয়েছিল, যে অন্ধকার অমানিশা নেমে এসেছিল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, প্রগতিশীল মানুষের ওপরেÑ তা এক কথায় ’৭১-কেও হার মানিয়েছিল।
বস্তুত মানব সভ্যতা যে ন্যায়বিচারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার মৌল ভিত্তি হচ্ছেÑ নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্তের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, বলাবাহুল্য নির্যাতনকারী ও আক্রমণকারীর বিচার ও দ- প্রদানই ক্ষতিগ্রস্তের ন্যায়বিচার লাভকে নিশ্চিত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘অধিকার’ নামক সংস্থার সচিব বা প্রধান আদিলুর রহমানের গ্রেফতার প্রসঙ্গকে বিবেচনা করতে হবে। ৫ মের সারারাতের লাইভ টেলিকাস্ট তো আমরা সবাই দেখেছি। দেখে হেফাজতের ঔদ্ধত্য ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা- এবং খালেদার উস্কানি দান, এতে মাহমুদুর রহমান, পরে আদিলুর রহমান যেসব উস্কানিমূলক, মিথ্যা, বানোয়াট খবর ও ছবি প্রকাশ করেছেÑ তার জন্য খালেদা, মৌলানা শফীসহ মাহমুদুর, আদিলুরদের বিচার ও দ- প্রদান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই জরুরী। এর আগে আমরা দেখেছি, খালেদা-তারেক ও নিজামীর দ্বারা জঙ্গী ইসলামী দল জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ ইত্যাদিকে বিকশিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিতে, যার জন্যও এ তিনজনের বিচার হওয়া দরকার। বিচার হয়নি বলে এবার খালেদা, নেপথ্যে তারেক এই মৌলানা শফীর হেফাজতে ইসলামকে আবার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক রাষ্ট্রবিরোধী কাজে নিয়োজিত করতে দেখা গেছে। এছাড়াও দেখা গেছে, হিজবুত তাহরীর নামক শরীয়া রাষ্ট্র দাবিকারী সংস্থাটির প্রধান দু’তিন জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, বুয়েটের শিক্ষক। এছাড়া জড়িত হয়েছে এদের কিছুসংখ্যক ছাত্রও যা জনগণকে আশ্চর্য করলেও বিএনপির প্রশ্রয় এবং জামায়াতের অর্থ সহযোগিতা ছাড়া ঐ উচ্চ শিক্ষিতদের বা মৌলানাদের জঙ্গীবাদে জড়িত হওয়া সম্ভব হতো না বলে জনমানুষের বিশ্বাস। এরা সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী একটি জোট। স্মরণ রাখতে হবে, এরাই আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছে। জনগণ আবারও ২০০৬-এ খালেদা-নিজামী-তারেকের বর্বর যুগ শেষ হয়েছে ভেবে যখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল, তখন দেশী-বিদেশী, এমনকি তাদের মিত্রদেরও স্তম্ভিত করে দিয়ে খালেদা আবারও ‘দলীয় তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকার’ গঠনে এবং ‘দলীয় নির্বাচন কমিশন’ গঠনে দেশের সাংবিধানিক নিয়ম নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যখন দলীয় প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দীনকে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারপ্রধান এবং দলীয় নতজানু আবদুল আজিজকে দিয়ে ‘দলীয় নির্বাচন কমিশন’ গঠন করল এবং উত্তরা ষড়যন্ত্রে জড়িত অন্য প্রশাসকদের দিয়ে সোয়া কোটি জাল ভোটারসহ ভোটার তালিকা তৈরি করে একটি নীলনকশার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব আয়োজন শেষ করে, তখন পুরো জাতি, এমনকি অনেক বিএনপিপন্থীও অবাক বিস্ময়ে রাষ্ট্রের রঙ্গমঞ্চে খালেদা পরিচালিত এক অভিনব নাটক অনুষ্ঠিত হতে দেখছিল! সে সময় অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন দল, মানুষ এসবের প্রতিবাদ জানাচ্ছিল যার মধ্যে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, পেশাজীবী নারী সমাজ, অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠন ছিল উল্লেখযোগ্য।
কথায় বলে, বেড়ায় ঘাস খায়, শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে বিশাল সুশীল সমাজ ও জনগণ মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষার স্বার্থে যে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ-তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন দাবি করেছিলেন, দেখা গেল খালেদা-তারেক-নিজামী ঐ ব্যবস্থাকে বার বার ধ্বংস ও গ্রাস করেছেÑ ২০০১, ২০০৬-এ! অর্থাৎ নিরপেক্ষ নির্বাচন, সুষ্ঠু ভোটার তালিকা এবং নিরপেক্ষ সরকার তাদের পছন্দ নয়। তা না হলে খালেদা যদি বার বার এই নিরপেক্ষ তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করে ধ্বংস না করত, তাহলে আজ পর্যন্ত এ ব্যবস্থাই বলবত থাকত। ধ্বংস হয়ে যাওয়া, বার বার দখলের মুখে পরা এই ব্যবস্থা এখন মৃত। এখন জাতি সংবিধানস্বীকৃত, জাতির কাছে জবাবদিহি করার মতো জনপ্রতিনিধিদের হাতেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিতে ইচ্ছুকÑ এটি শেখ হাসিনা বলেছে বলে নয়, এ ব্যবস্থাটি যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া প্রভৃতি গণতান্ত্রিক দেশেই প্রচলিত। তত্ত্ব¡াবধায়কের পরীক্ষা যথেষ্ট হয়ে গেছে, সে ফেল করেছে। সুতরাং এবার সংবিধানসম্মত অন্য দেশে প্রচলিত ব্যবস্থায় নির্বাচন হোক। তবে ‘দখলে’ পারদর্শী খালেদা এই ব্যবস্থাকে অথবা নির্বাচনে ভূমিকা রাখা অন্য সংস্থার দ্বারা এ ব্যবস্থাকেও তছনছ করবে কিনাÑ সে সন্দেহ থেকেই যায়। পাশে আওয়ামী লীগের চরিত্র হননকারী আদিলুর, মাহমুদুররা তো আছেই।