মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ১০ ফাল্গুন ১৪১৯
যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় কিছু বিদেশী পত্রিকার জেহাদ
শাজাহান মিয়া
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য উন্মুখ প্রায় ১০ লাখ আবেগ-উদ্বেলিত শ্রোতায় পরিপূর্ণ রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে মুক্তি ও স্বাধীনতার উদাত্ত ঘোষণা সংবলিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের দিনটিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজী দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় নানা রকম উৎসাহব্যঞ্জক শিরোনামে খবর ছাপা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলনের অগ্নিঝরা উত্তাল দিনগুলোতে প্রায় সব পত্রিকার মতো তখন এদেশের মহান স্বাধীনতার পক্ষের নির্ভীক ইংরেজী দৈনিক ‘দ্য পিপল’-এর সহযোগী প্রকাশনা ‘গণ বাংলা’র ব্যানার হেডিং ছিল, ‘রেসকোর্স আজ বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু বলবেন।’ একেবারে পাশেই শাহবাগ এলাকায় স্বাধীনতা প্রজন্ম চত্বর এখন বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রত্যাশিত বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠেছে ঐ বিশাল চত্বরে। গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও অভাবনীয় তারুণ্যে উদ্দীপ্ত দেশের নতুন প্রজন্মের সূর্যসন্তানদের অর্ধ মাসাধিকাল ধরে দেয়া অত্যন্ত অভিনব ও স্বাতন্ত্র্যের মহিমায় সমুজ্জ্বল কর্মসূচী ও কার্যক্রমের আভায় বাঙালী জাতি চমৎকৃত। বিমুগ্ধ। এদেশের স্বাধীনতার শত্রু ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে ঘোষিত কর্মসূচী দেশের সাধারণ মানুষকে বিপুলভাবে আন্দোলিত করেছে। তাঁরা বিমোহিত। জিয়াউর রহমানের কূটচাল ও দেশের অতি ডান ও অতি বামপন্থী রাজনীতিকদের হীনম্মন্যতার কারণে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে অফুরন্ত সাহস ও শক্তি সঞ্চারণে স্মরণীয় সেøাগান ‘জয় বাংলা’ হারিয়ে যাচ্ছিল। মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে মুখরিত স্বাধীনতা প্রজন্ম চত্বর হারিয়ে যাওয়া এই কালজয়ী সেøাগানটিকে শুধু ফিরিয়েই আনেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাঙালীর প্রাণে নবজাগরণের উদ্ভব ঘটিয়েছে। ‘জয় বাংলা’ নতুন প্রাণ পেয়েছে। দেশের ভবিষ্যত কা-ারি শিশু-কিশোররাও বুঝে গেছে ‘জয় বাংলা’ সেøাগানের মহিমাময় ইতিহাস। আবেগপূর্ণ কণ্ঠের মোহিনী শক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে হৃদয়কাড়া সেøাগানে সেøাগানে মানুষের মন উতালা করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলে ওরা সত্য-ন্যায়ের কঠিন সংগ্রামে অবতীর্ণ। নতুন প্রজন্মের নিরস্ত্র সদস্যরা শব্দের শক্তির বিস্ময়কর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশকে জাগিয়ে তুলেছে। ওদের বিজয় সুনিশ্চিত। ইতোমধ্যে তার কিছু ইতিবাচক ফললাভ হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন (সংশোধন) বিল ২০১৩ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। বিলটি পাশের ফলে যুদ্ধাপরাধে জড়িত ব্যক্তির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সংগঠনকেও বিচারের আওতায় আনা যাবে। বিলটির বিধান অনুযায়ী এখন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নয়, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে শুধু রাষ্ট্রপক্ষ, বাদী ও বিবাদীপক্ষ সর্বোচ্চ আদালতে আপীল করতে পারবে। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান আইনটিতে সম্মতিও প্রদান করেছেন। আগামী সপ্তাহেই কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপীল করবে বলে জানা গেছে। কিছুটা সাফল্যলাভ তাদের খানিকটা স্বস্তি এনে দিলেও চূড়ান্ত বিজয়লাভের জন্য এখনো তারা উদ্বিগ্ন দিন কাটাচ্ছে। ঠিকমতো নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। নেই ঘুম। তারপরও ক্লান্তি নেই। নেই কোন অবসাদ। দিবানিশি ওখানে অবস্থান করে সিংহের মতো গর্জে ওঠে শাহবাগ এলাকা প্রকম্পিত করে তুলছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে জামায়াত-শিবিরের ঘৃণ্য ঘাতকদের চাপাতির আঘাতে এক সহযোগী বীর যোদ্ধা রাজীব হায়দার শোভনকে হারিয়েছে ওরা। শরীরের শক্তি দিয়ে বঙ্গ-শার্দুলের মতো গর্জে উঠে সেøাগান তুলতে তুলতে আরেক বিশাল যোদ্ধা তরিকুল ইসলাম শান্তর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দুই সাথীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হলেও ওরা ভেঙ্গে পড়েনি। শোককে শক্তিতে পরিণত করে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ওরা হয়ে উঠেছে আরো দুর্বার-দুর্নিবার।
বলতেই হচ্ছে, জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েও রাজীব নিস্তার পেল না। ওর বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধী অপপ্রচার চালানোর অপবাদ দিয়ে ওকে এখন মুরতাদ বলা হচ্ছে। ইসলাম রক্ষার নামে ওরা এখন জঘন্য মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে। মওদুদীর শিষ্যদের এমনটাই হওয়ার কথা। তা নাহলে হাইকোর্টের একজন জামায়াতপন্থী মাননীয় বিচারপতি কেন এ রকম অপকর্মে শামিল হবেন। মাত্র কয়েকদিন আগে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো ছেলের বয়সের এক তরুণের নামে জামায়াতপন্থী পত্রিকায় প্রকাশিত অপপ্রচারমূলক সংবাদ কপি করে সুপ্রীমকোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের কক্ষে বিতরণ করতেন না। বিচারপতি মোঃ মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সারাদেশ। তিনি যে কত বড় অপরাধ করেছেন তাও বোধ হয় বিচার করার বিবেকবোধ নেই এই বিচারপতি মহোদয়ের। তাকে আমি চিনি। মাস চারেক আগে হঠ্যাৎ তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিল। সে এক মজার কাহিনী। দেশের দু’চারজন সাবেক প্রধান বিচারপতিসহ অনেক বিচারপতি আমাকে চেনেন বলে জানি। দেশের প্রখ্যাত আইনজীবীও আমাকে নিশ্চয়ই ভালভাবে জানেন। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বা কোন আইনজীবী ভাই বা কোন সংসদ সদস্য এই মজার ঘটনা জানতে আগ্রহী হলে তাঁদের আমি জানাতে পারি।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলে জাফর মুন্সি নামে একটি ব্যাংকের একজন গরিব নিরীহ লিফটম্যান যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে লাগানো পোস্টার ছিঁড়তে বাধা দিলে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের নৃশংসতার শিকার হন। পরের দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই বীর বাঙালী মারা যান। তিনি স্ত্রী ও ছোট তিনটি বাচ্চা রেখে গেছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি একই সময় বিকেল ৪টা থেকে তিন মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সারাদেশ নিশ্চল হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে যায়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় দেশের সব বাড়ি-ঘর, অফিস-কল-কারখানা-মার্কেট ও গণপরিবহনসহ প্রাইভেটকারে মোমবাতি জ্বালানো হয়। মোমের আলোতে আলোকিত হয়ে যায় পুরো ঢাকা মহানগরী। মোমবাতি প্রজ্বলন যেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে মনের ভেতরে প্রজ্বলিত আগুনেরই বহির্প্রকাশ। মোমবাতির শিখা যেন প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ হয়ে শাণিত করল জাগরণের শক্তি। প্রজন্ম চত্বরের ডাকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময় সকাল ১০টায় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। আকাশে লাল-সবুজ পতাকা ও বাতাসে প্রিয় জাতীয় সঙ্গীত ‘সোনার বাংলা’র মধুর সুরের জালে গোটা দেশকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলেছিল। ওদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর তীব্রতা-তীক্ষèতা ও অন্তর্নিহিত বিরল সম্মোহনী শক্তি সর্বজনীন রূপ লাভ করে পুরো জাতির কাছ থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান লাভ করে। তরুণ প্রজন্মের বিরল উদ্ভাবনী শক্তির জ্বলন্ত স্বাক্ষর হিসেবে গত ২০ ফেব্রুয়ারি ওদের আহ্বানে পালিত হয়েছে আরো এক অত্যন্ত অভিনব কর্মসূচী। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে শাহবাগের পাশেই রেসকোর্স ময়দানে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সদস্যরা বিকেল ৪-১৩ মিনিটে আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই সময়টা স্মরণ রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বেলুনের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রজন্ম চত্বর থেকে আকাশের ঠিকানায় প্রতীকী চিঠি লিখে তাঁদের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়। এই কর্মসূচী দেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহর-নগর-বন্দরে অত্যন্ত ভাব-গাম্ভীর্য পরিবেশে পালিত হয়।
জামায়াতে ইসলামী নেতারা বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানি দোস্ত ও দোসর হওয়ার সুবাদে এবং কট্টর ইসলামপন্থী দলটির দলটির সঙ্গে বিএনপির আরও কিছু নেতার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের সখ্যের কারণে তারা পড়েছে মহা ফাঁপরে। ক্ষমতায় আরোহণ করার পর প্রথম তিনটি বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজাট সরকারের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন হলেও ২০১২ সালে নানা কারণে তা যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। তারপরও বিরোধী দল খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না। শাহবাগস্থ প্রজন্ম চত্বর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি তোলার পর সরকার চাঙ্গা হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, বিএনপির কিছু নেতা-নেত্রীর উল্টাপাল্টা বক্তব্য-বিবৃতি জামায়াত তথা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যাওয়ায় তারা এখন পড়েছে বিপাকে। জামায়াতের দুরবস্থা দেখেও বিএনপি দলগতভাবে তেমন পরিষ্কার কোন অবস্থান নিতে পারছে না। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ফাটা বাঁশের ফাঁকে পড়লে যেমন দশা হয়, বিএনপির এখন সেরকম অবস্থা। এদিক ওদিক কোনদিকে মোড় নেয়া বা ঘোরার উপায় থাকে না। এদেশের একজন বরেণ্য সাংবাদিক ষাটের দশকে এ অবস্থাটিকে তাই ‘মাইনকা চিপা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতা দাবি করেছেন যে, প্রজন্ম চত্বর থেকে সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয়গুলো ওঠা উচিত। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বিশেষ কোন দলের পক্ষে বিপক্ষে কাজ করা হচ্ছে না। যদি বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা তুলতে হয়, তাহলে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে বেগম জিয়ার ছেলেদের নেতৃত্বে যে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে সেটাই তো সবার আগে ওঠাতে হবে। ওরা কোন দলের নয়। ওরা দেশের। ওরা যে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি তুলেছে সেটা মুষ্টিমেয় কিছু লোক ব্যতীত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের দাবি। এদেশের গণমানুষের প্রাণের দাবি। আর সেজন্যই দেশের মানুষের মধ্যে এমন সাড়া পড়েছে। ওরা কোন বিশেষ দলের স্বার্থ দেখছে না, ওরা দেখছে দেশের স্বার্থ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল সেই সব কুলাঙ্গারদের ফাঁসির দাবিতে জাতি আজ একাত্ম হয়েছে।
বিদেশী কয়েকটি নামী-দামী পত্রপত্রিকার মালিক বা ঐ সব পত্রিকায় কর্মরত কিছু বড় সাংবাদিক সুযোগ পেলেই উপদেশবাণী শুনিয়ে কান ঝালাপালা করে ফেলে। এটা তাদের বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিদেশে সাংবাদিকতায় পড়াশুনা, দেশের বাইরে সাংবাদিকতার ওপর কিছু আন্তর্জাতিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ এবং কিছুদিন বিদেশে চাকরি করার সুবাদে এ বিষয়ে আমার কিছু জানার সুযোগ ঘটেছিল। শিল্পোন্নত দেশের নাকউঁচু সাংবাদিক হয়ে সুযোগ পেলেই তারা স্বল্পোন্নত দেশের সাংবাদিকের ওপর মোড়লিপনা জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নৈতিকতার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা উল্লেখ করে এ পেশাকে একটি মিশন হিসেবে নেয়ার ছবক দিতে থাকেন। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত জন্মভূমি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সব সাংবাদিকেদের আচরণ দেখছি সম্পূর্ণ উল্টো। মনে হচ্ছে, এদেশের একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা দাগের টাকা পকেটস্থ করে তারা একবারে বিক্রি হয়ে গেছে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও চার লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম এই দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি ওরা মারমুখী হয়ে উঠেছেন। মৌলবাদী ঘাতকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা গিলে তা হালাল করতেই যে ওরা আদাজল খেয়ে এই জঘন্য কাজটি করতে মাঠে নেমেছে তা বোঝার আর বাকি নেই। একাত্তরের ঘাতক-দালাল বলে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতা যে টাকার কুমির এটা সাংবাদিক নামধারী ঐ বিদেশীগুলো জানে বলে টাকার লালসায় ওরা তাদের পোষ্যপুত্রের মতো কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। তাই অবৈধভাবে নেয়া হারাম টাকা হালাল করতেই এখন তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপতৎপরতায় মেতে উঠেছে। পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো দু’একটি মানবাধিকার সংস্থাও নির্লজ্জভাবে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের পক্ষ নিয়ে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বিবেচনায় ইসলামের ধ্বজাধারী লোকগুলো যে এদেশে একাত্তর সালে হত্যা, ধর্ষণ ও মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার মতো কত বড় জঘণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে মানবাধিকার রক্ষার নামে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তা আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কচকচে ডলার তাদের পকেটেও গেছে। তাই তারা মানবাধিকার রক্ষার নামে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর মতো চরম অমানবিক কাজে লিপ্ত হয়েছে।
বিশ্বের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার মিশনে অনেক আগে থেকেই জোরেসোরেই নেমেছে। বৃটেন থেকে প্রকাশিত এই ম্যাগাজিনটি গত চার বছরে আমাদের দেশের মানবতাবিরোধীদের বাঁচাতে এ পর্যন্ত যত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এতটা আর কেউ করেনি। মনে হয়, এই সাপ্তাহিকটির মালিকানায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর অংশীদারিত্ব আছে। তা নাহলে এই ম্যাগাজিনটি কোমরে গামছা বেঁধে এতটা ন্যক্কারজনভাবে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ গ্রহণ করত বলে মনে হয় না। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আর একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকা ওয়ালস্ট্রিট জার্নালও শাহবাগের গণজাগরণ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই ওকালতি করেছে। দুঃখের বিষয় হলো, পত্রিকা দু’টি একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের অপকর্ম সম্পর্কে তাদের পত্রিকার পাতায় একটি শব্দও তুলে ধরছে না। তাহলে হয়ত বিশ্বের অন্যান্য দেশের এ প্রজন্মের তরুণরা জানতে পারত একাত্তর সালে যুদ্ধপরাধীরা বাংলাদেশে কি নৃশংস ও নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছিল। মনে হচ্ছে, বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্য বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলাকালীন টাকায় বিক্রি হওয়া পত্রপত্রিকা এবং মানবাধিকার সংস্থা দু’টি ওদের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকেই আরো বেশী সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট