মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১১, ২৬ অগ্রহায়ন ১৪১৮
নোটস ফ্রম এ প্রিজন বাংলাদেশ ॥ প্রাপ্তির গভীরতা আর খোঁজার চেষ্টা করলাম না
মহীউদ্দীন খান আলমগীর
(পূর্ব প্রকাশের পর)

ইতোমধ্যে দাউদকান্দি-গৌরীপুরের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। আগের ফাঁকা জলাভূমির জায়গায় এখন ব্যস্ত বাজার। পানি ছাড়িয়ে বেড়ে ওঠা ধানের গাছ, দিগন্ত ছোঁয়া সবুজের গালিচা আর দেখা যায় না। দাউদকান্দি পৌঁছে তাকে বললাম এই সেই দাউদকান্দি যেখানে তাদের বাড়ি। জরিনার তখন বৃদ্ধ-নু্যব্জ দেহ, মুখে বয়সের ভাঁজ। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এটা দাউদকান্তি। যখন গৌরীপুর দেখা গেল, আমি তাকে বললাম। জরিনা দেখছেন, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমরা প্রায় তাদের বাড়ির কাছাকাছি। আমি তাকে বললাম না, যে এখানটাতেই তাদের বাড়ি। অন্যত্র বড় হওয়ায় তার অবস্থাটি এমন হয়েছে যে, তার জন্মস্থানটিকে পর্যন্ত চিনতে পারছেন না। কিন্তু আমরা যখন ৭৬ মাইল দক্ষিণে আমাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন তাকে আর বলতে হলো না। সবকিছু চিনতে পারলেন। গাছপালা, মাঠ, পাখির ডাক, পুকুর, মসজিদ সব। এটা ছিল তারই গ্রাম। মনে হচ্ছিল যেন এসবের জন্য একটা অপেৰা, একটা কান্না তার ভেতরেও ছিল। তার দৃষ্টিতে ছিল অন্যরকম নিস্তব্ধতা। আমি জীবনের ক্রুঢ়তা বা প্রাপ্তির গভীরতা আর খোঁজার চেষ্টা করলাম না।
এদিকে আমার রয়েছে হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, আইবিএস এবং মাইল্ড এনলার্জড প্রস্টেট। পরীৰা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা চিকিৎসা শুরু করলেন। দিনে এক ডজনেরও বেশি পিল-ক্যাপসুল খেতে দেয়া হয়েছে। ডায়াবেটিসের জন্য একটা সমন্বিত খাবারমেনুও ঠিক করে দেয়া হয়েছে। প্রফেসর আনোয়ারউল্লাহ মূল চিকিৎসক। তিনি নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তিনি আমাকে একজন ইউরোলোজিস্ট ও একজন গ্যাসট্রোএনটেরোলজিস্ট-এর কাছে রেফার করলেন। ইউরোলজিস্ট হিসেবে প্রফেসর কিবরিয়া এবং গ্যাসট্রোএনটেরোলজিস্ট হিসেবে এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মুজিবুর রহমান ভুঁইয়াকে ঠিক করা হলো। তারা প্রতি সকালে আমাকে দেখতে আসেন। ধীরে ধীরে আমার উন্নতি হতে থাকে। আমার উন্নতি আরও দ্রুত হতে পারত, কিন্তু জেলগার্ডদের নানা বাধা সমস্যা তৈরি করেছে। আমাকে সমন্বিত ডায়াবেটিস-উপযোগী যে খাবারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, এই খাবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে না। বাসা থেকে লোক মারফত আমার খাবার আনার ৰেত্রে শুরম্নতে এবং এরপর মাঝে মাঝেই জেলগার্ডরা বাধা দিয়েছে। তারা এটা ওটা নানা কারণ দেখিয়েছে। তিন রাত আমি রাতের খাবার খেতে পারিনি। আসলে আমার কাছে তারা কিছু উৎকোচ প্রত্যাশা করেছিল। এটা দেয়াকে আমি সবসময়ই ঘৃণা করি। আমি মনে করি আমার অবস্থানে থেকে আমি যদি এদের এটা দেই তাহলে দেশটা নিশ্চিতই একটা ব্যর্থতার দিকে যেতে শুরু করবে। প্রায় মাসখানেক পর গার্ডরা বুঝে নিল যে তারা আমার কাছ থেকে এ রকম কিছু পাবে না এবং ধীরে ধীরে ঝামেলা করা থেকে সরে আসলো।
তাদের এই প্রত্যাশা করার একটা মূল কারণ হলো তারা একই ফ্লোরে কেবিনে থাকা অন্য তিন রাজনৈতিক বন্দীর কাছ থেকে এটা পেয়ে অভ্যস্ত। একজন হলেন খালেদা জিয়ার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, আমি এখানে কেবিন নেয়ার ৫ দিন পর তিনি এই ফ্লোরে এসেছেন। এরপর এসেছেন, বিএনপির সাবেক সাংসদ এবং খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোসাদ্দেক আলী ফালু। এবং ফালুর সহযোগী এনায়েতুর রহমান বাপ্পীকে এখানে আমার পাশের রুমে আমি আসার সময় থেকেই পেয়েছি। এই তিন বন্দীর বেতনভুক্ত এ্যাটেনডেন্টরা, তিন শিফটে কাজ করা জেলগার্ড এবং পুলিশের জন্য তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা নিত। তাই কেবিনে খাবার পেতে বা কেন ভিজিটরকে ভেতরে আনতে তাদের কোন সমস্যা হতো না। তাদের এ্যাটেনডেন্টরা জানে যে টাকা কথা বলে। যতক্ষণ তারা তাদের বসদের চাহিদা মেটাতে পারছে, ততক্ষণ তারা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে পড়ল না ব্যর্থ হলো এসবের পরোয়া করে না। আমার কাছে এটা একটা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ, যা আমি ঘৃণা করি।(চলবে)
অনুবাদ : অর্ক হাসান