মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১১, ২৬ অগ্রহায়ন ১৪১৮
বিজয়ের ৪০ বছর, স্বাধীনতার + ৯ মাস
মুহম্মদ শফিকুর রহমান
এ লেখা পাঠকের হাতে যাবে ১০ ডিসেম্বর। শনিবার। অর্থাৎ ছাপা হবে। মাঝে মাত্র ৫ দিন, তারপরই ১৬ ডিসেম্বর বাঙালীর হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণের দিন_ 'বিজয়ের ৪০ বছর এবং স্বাধীনতার ৪০ বছর+ ৯ মাস।' শিরোনামটিও যে কারণে আমি ওভাবে দিয়েছি।
এভাবে শিরোনাম দেয়ার পেছনে একটা কারণ আছে। প্রায়ই শুনি নেতারা বক্তৃতায় বলেন, 'স্বাধীনতার ৪০ বছর।' পত্র-পত্রিকা কিংবা টিভি চ্যানেলওয়ালারাও এ ভুলটি করেন। বস্তুত ৪০ বছর স্বাধীনতার নয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের। স্বাধীনতার ৪০ বছর তো পূর্ণ হয়েছে তারও ৯ মাস আগে ২৬ মার্চ ২০১১। তাই ১৬ ডিসেম্বর 'বিজয়ের ৪০ বছর, আর স্বাধীনতার ৪০ বছর ৯ মাস।'
এ ভুলটি যে সবাই করছেন তা নয়, কেউ কেউ করছেন। কিংবা তারা যে ইচ্ছে করে করছেন তাও নয়। বলে ফেলছেন এই আর কি? কিন্তু আমাদের মহান স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বাঙালী জাতির জীবনের সবার বড় ঘটনা, সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গা, সবচেয়ে বড় অর্জনের দিন। একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় বেদনারও দিন। এদিন আমরা যেমন হানাদার পাকি সামরিক জানত্মাকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছি, তেমনি ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও পৌনে ৩ লাখ মা-বোনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, সম্ভ্রমহানি ও শাহাদাতবরণ করতে হয়েছিল। দিনটি যেমন আনন্দের তেমনি বেদনারও। কাজেই এ দিনটি বা এ দিনের ইতিহাস বলতে গিয়ে সামান্য একটি ভুলও হওয়া উচিত নয়। গর্হিত অপরাধ।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন। এ বিজয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বাঙালীর সুদীর্ঘ লড়াই ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। অথচ যারা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছি বা করছেন কি সহজে আমরা ভুলে যাই সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস। আমরা যদি চর্যাপদের কবিদের দিকে তাকাই দেখতে পাব তাদের লড়াইয়ের চিত্র। কিভাবে 'ব্রাহ্মণ নাড়িয়াদের' অত্যাচারের চিত্র চর্যাপদের কবিরা জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন, যে কারণে তাদের জীবন পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে এবং তারা প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বস্তুত হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মানুষের বিচ্ছিন্ন লড়াইগুলোই বাঙালী জাতি গঠনের ভিত্তি গড়ে তোলে। এ ৰেত্রে বাংলা মায়ের যেসব শ্রেষ্ঠ সনত্মান অবদান রেখেছিলেন তাদের মধ্যে অতীশ দীপঙ্কর, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, স্যার সৈয়দ আহমেদ, হাজী শরীয়তুল্লাহ, সৈয়দ ইসমাইল হোসনে সিরাজী, তিতুমীর, ঈশা খাঁ, রানী ভবানী, শমসের গাজী, মওলানা আমিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বিশ্বকবি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম, বিপ্লবের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, দেশবন্ধু সি আর দাশ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সর্বজন শ্রদ্ধেয়া কবি সুফিয়া কামাল কিংবা বীর ক্ষুদিরাম_অবিরাম এবং রফিক-শফিক-সালাম-বরকতের রক্তাক্ত শার্ট গায়ে তুলে যে মহানায়ক ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও উচ্চারণ করেছিলেন, 'আমি বাঙালী, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাদেশ আমার দেশ', তিনি টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান। অদম্য সাহসী এই মানুষটিই জীবন বাজি রেখে ব্রিটিশ ও পাকি শাসকদের চ্যালেঞ্জ করে পূর্বসূরিদের বিচ্ছিন্ন লড়াইগুলোকে একই মোহনায় প্রবাহিত করিয়ে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ বাঙালী জাতি গড়ে তুলেছিলেন এবং পাকিসত্মানের ধ্বংসস্তূপের ওপর বাঙালীর নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী', 'বঙ্গবন্ধু' এবং 'বাঙালী জাতির জনক' হিসেবে প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালীর হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন। এ পর্যায়ে আসতে তাঁকে গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলে অধ্যায়কালে প্রথমে গ্রেফতার হতে হয়। সেই থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৩ বছরে অন্তত ১১ বছর কারাগারে কাটাতে হয়। দুই দুইবার ফাঁসির কাঠে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু কোন লোভ, এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদও তাঁকে দুর্বল করতে পারেনি। বাঙালী জাতির প্রশ্নের কাছে আর কোন কিছুই তাঁর কাছে বড় ছিল না।
অথচ এক শ্রেণীর কুলাঙ্গার বঙ্গসন্তান আছে, যারা ইতিহাসের ঋণ শোধ করা দূরের কথা বরং বিকৃত ইতিহাস রচনা করে জাতিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে চলেছে এখনও। তারা কি অবলীলায় এক জিরোকে হিরো বানাতে চাইছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এক সাধারণ মেজরকে সামনে আনায় ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। বস্তুত ওই শ্রেণীর মানুষেরা হীনম্মন্যতায় ভোগে, কারণ তারা বাংলা মায়ের অভাগা সনত্মান। তাদের জীবনে গৌরবের কোন ইতিহাস নেই। মহান বাংলা ভাষা আন্দোলনের পর থেকে ধাপে ধাপে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এদেশে গড়ে ওঠে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে জগত কাঁপানো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, অর্থাৎ যারা এই ধারায় সম্পৃক্ত হতে পারেনি তাদের মতো অভাগা তো আর নেই। এ কারণেই তাদের মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা কাজ করে। নিজেদের গৌরবের ইতিহাসও তাদের কাছে দুর্ভাগ্যের পদাবলি। ভাল কোন কিছুই তারা গ্রহণ করতে পারছেন না। এই যেমন আমাদের সম্মানীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কিছুতেই মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ধারণ করতে পারছেন না। আর তাই তো যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দিশা মনে করছেন। জিয়ার ঢাল ভেঙ্গে গেছে, তাই গোলাম আযমের ঢাল ধরেছেন।
ভাবতে অবাক লাগে, গোলাম আযমের মতো এক ঘৃণ্য জীবকে সমর্থন করে বাংলাদেশে রাজনীতি করছে কি করে? তবু তারা রাজনীতি করছে, মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো বিভ্রান্ত নষ্ট মানুষের তো অভাব নেই এই বাংলাদেশে! ভদ্রলোক এতই নষ্ট হয়েছেন যে, বিলেতে লেখাপড়া করা একজন ব্যারিস্টার লেখাপড়া না-জানা একজন মহিলাকে সমর্থন করছেন। তাতেও দোষ নেই। কিন্তু যখন তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাওয়া এক দুর্নীতিবাজ তারেক রহমানের জন্য কাঁদছেন তখন তো ভাবতেই হয়। ছেলে চোর-বাটপার যাই হোক মার কাছে ছেলে ছেলেই। সে হিসাবে বেগম জিয়া ছেলের জন্য কাঁদবেন, বুকে আগলে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মওদুদ সাহেব কেন মাতম করছেন? করছেন এ জন্য যে, তিনি বিলেতি শিৰা নিয়েও তৃপ্ত নন। আরও কিছু চাই। সে জন্য তারেক রহমানের গুণকীর্তর্ন। যদি আবারও মন্ত্রীটন্ত্রী হওয়া যায়।
ভুল নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। আমার বলার অর্থ হলো কেউ ইচ্ছাকৃত ভুল করে, আবার কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে হীন উদ্দেশ্য হাসিলে ইচ্ছাকৃত ভুল করার উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি। যেমন আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা। বিএনপি ও তাদের সমমনা কিছু দল মিলিটারি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে। অর্থাৎ তারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠককে ঘোষক বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। অথচ কে না জানে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের মার্চ মাসব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের মাঝে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু প্রথমে সে দিনের রেসকোর্সে ১০ লাখ জনতার উত্তাল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণে কিভাবে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ শত্রুমুক্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে, তার সামরিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা দেন। পাকিস্তানী হানাদার মিলিটারি ২৫ মার্চ রাতে যখন নিরস্ত্র মানুষের ওপর ট্যাংক-কামান নিয়ে হামলা চালায় তখন দিবাগত রাত দেড়টায় গ্রেফতার হবার পূর্ব মুহূর্তে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ঘোষণাটি আগেই ক্যাসেট করা হয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে প্রচার করা হয়। ২৬ মার্চ '৭১ বেলা ২টার মধ্যে মোটামুটি দেশের প্রতিটি বিভাগীয় এবং জেলা সদরে পৌঁছে। চট্টগ্রামে পৌঁছলে সেখানকার নেতা এমএ আজিজসহ নেতৃবৃন্দ তা চট্টগ্রাম রেডিও থেকে প্রচার করার ব্যবস্থা করেন। ২৬ মার্চ বেলা দেড়টায়। প্রথমে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নান। তারপর আরও কয়েকজন। ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করেন তখন চট্টগ্রামে কর্মরত মিলিটারি মেজর জিয়াউর রহমান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাকে দিয়ে পাঠ করান এ জন্য যে, যাতে বাঙালী মিলিটারিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ বিএনপি ঘোষণা পাঠককে 'ঘোষক' বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এখানে জিয়াকে ঘোষক বলে বিএনপি মূলত ইচ্ছাকৃত বা মতলবি ভুলটি করছে।
এখানে একটা কথা বলা দরকার, যে জিয়াকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার? তার কি সেই এখতিয়ার ছিল। সে তো তখন এক অখ্যাত মেজর। একজন মেজর এসে ঘোষণা দিলেই জাতি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এমনটি হয় কখনও?
বরং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার সাংবিধানিক এখতিয়ার অর্জন করেছিলেন ১৯৭০-এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬৭ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে জয়লাভ করেছিল। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু ছেলেবেলা থেকে বাঙালী জাতির প্রশ্নে সংগ্রাম করে, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন তবু এতটুকু আপোস করেননি। ফাঁসির মঞ্চে গেছেন তবুও পাকি মিলিটারি জান্তার কাছে মাথা নথ করেননি বলেই মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দেন। বঙ্গবন্ধু প্রথমে লড়াইয়ের মাধ্যমে জাতি গঠন করেন, তারপর একটি নিরস্ত্র জাতিকে সমগ্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন। এভাবেই ৩০ লাখ শহীদ ও পৌনে ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ও সর্বোচ্চ বলিদানের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।
বিএনপি নেত্রী সবচেয়ে বড় মিথ্যে বলেছেন, গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, সাকা, মোলস্না, কামারুজ্জামান তারা নাকি যুদ্ধাপরাধী নয়? এদের নাকি বিচার করা যাবে না?
কিন্তু বিএনপি নেত্রী ভুলে গেছেন বঙ্গবন্ধু যেমন '৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সাংবিধানিক এখতিয়ার লাভ করেছিলেন, তেমনি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে চার-পঞ্চমাংশ আসনে জয়লাভ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সাংবিধানিক এখতিয়ার অর্জন করেছিলেন। জাতিও ওই যুদ্ধাপরাধী ঘৃণিত ব্যক্তিদের বিচার করে শাস্তি দিতে প্রস্তুত।

ঢাকা ০৯.১২.১১
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক