মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২১ অক্টোবর ২০১১, ৬ কার্তিক ১৪১৮
সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী
স্মরণ
রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে যে ক'জন নারী ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে সিলেট জেলায় মহিলাদের পৰে পূর্ববঙ্গের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছিল তার অন্যতম উদ্যোক্তা ও স্বাক্ষরদাতা ছিলেন শাহার বানু চৌধুরী। গণভোট, ভাষা আন্দোলনসহ সিলেটের সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। সৈয়দা শাহার বানুর জন্ম সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুরে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। পিতা সৈয়দ আবুল বাশার চৌধুরী। মরমী কবি সৈয়দ আশহর আলী তাঁর দাদা। এই বংশের দেওয়ান সৈয়দ ওয়াছিল আলী চৌধুরী নবাবী আমলে সদরআলা ও দেওয়ান ছিলেন। প্রপিতা দেওয়ান সৈয়দ আজমল আলী চৌধুরী ছিলেন জমিদার।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিয়ে হয় এ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের সঙ্গে। গৃহশিৰক এবং স্বামীর কাছে লেখাপড়া শেখেন। সংগ্রামী নারী রাজনীতিবিদ বেগম জোবেদা খানম চৌধুরী এবং স্বামী আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ আব্দুল হাফিজের সঙ্গে রাজনৈতিক কাজে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বামীর সব কাজের সহযোগী এবং সিলেটের নেতৃস্থানীয় সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কর্মী। তিনি সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের প্রথম দিকের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং ১৯৪৫-৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের গণভোটের সময় ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি মুসলমান মহিলাদের সংগঠিত করেন। কংগ্রেসের সহযোগী সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্ররোচনা মোকাবেলার জন্য তখন মৌলনা সহুল আহমদ উসমানীর ফতোয়া মাথায় রেখে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। একজন নারী হয়ে তৎকালীন রৰণশীল সমাজের শত প্রতিকূলতাকে উপেৰা করে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক ৰেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাৰরে লেখা থাকবে। সিলেটের নারী শিৰা প্রসারে তাঁর অবদান উলেস্নখযোগ্য। তিনি সিলেটে মহিলা কলেজের শুরু থেকেই এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে যখন কলেজটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় তখন এর অসত্মিত্ব রৰায় তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কলেজের ছাত্র সংগ্রহে তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান এবং মেট্রিক পাস মুসলমান মেয়েদের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। চালি বন্দর বালিকা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দীর্ঘকাল জড়িত ছিলেন। মৃতু্যর আগ পর্যন্ত তিনি এ স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি সিলেট মহিলা সমিতিরও সভাপতি ছিলেন।
রত্নগর্ভা সৈয়দা শাহার বানু তেরো সন্তানের গর্বিত জননী। সাত ছেলে ও ছয় মেয়ের সবাই উচ্চশিৰিত এবং দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। ডক্টর আবু আহমদ আব্দুল মুহসি (সাবেক অধ্যাপক ও ডিন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), আবুল মাল আবদুল মুহিত সিএসপি (বর্তমানে অর্থমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার), ডক্টর একে আবদুল মুবিন (সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সচিব), ডক্টর একে আবদুল মোমেন (জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও সৌদি আরব সরকারের সাবেক অর্থনীতি উপদেষ্টা, ডা. শাহলা খাতুন (জাতীয় অধ্যাপক), তাঁর সনত্মানদের মধ্যে বহুল পরিচিত। সৈয়দা শাহার বানু ১৯৮৩ সালের ২১ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।
এম.আর. মাহবুব