মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২১ অক্টোবর ২০১১, ৬ কার্তিক ১৪১৮
ওয়ালস্ট্রিট ॥ রাজনীতি থেকে লোকনীতি
নিউইয়র্ক, শিকাগো, সানফ্রান্সিস্কো, রোম, মাদ্রিদ, লন্ডন, বার্লিন ... ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।

'ওয়ালস্ট্রিট দখল কর', বলছেন মানুষ। এ এক নতুন আন্দোলন। নতুন ভাবনার এক সুযোগ
রংগন চক্রবর্তী

ওয়ালস্ট্রিট দখল কর' আন্দোলন নিয়ে দুনিয়া নড়েচড়ে উঠেছে। আমেরিকা থেকে এই আন্দোলন আস্তে আস্তে দুনিয়ার নানান প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েক দিনে রোম, মাদ্রিদ, লন্ডন, বার্লিনসহ শত শত শহরে 'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলনের দাবির সমর্থনে যথেষ্ট বড় মাপের প্রতিবাদ সমাবেশ সংগঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনের সূচনা হয় কয়েক মাস আগে। বছরের মাঝামাঝি কানাডার 'এ্যাডবাস্টার মিডিয়া ফাউন্ডেশন' নামে একটি সংস্থা দাবি তোলে, প্রেসিডেন্ট ওবামাকে প্রেসিডেনশিয়াল কমিশন চালু করে ওয়াশিংটনের জনপ্রতিনিধিদের ওপর কর্পোরেট টাকার প্রভাব রুখতে হবে। এই প্রস্তাবটি টুইটার, ফেসবুক ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ডাক ওঠে '(আমেরিকার অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক) ওয়ালস্ট্রিট দখল কর'। বলা হয়, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এই দুই দলই যেহেতু ওয়ালস্ট্রিট বা বাণিজ্যের টাকার ওপর নির্ভর করে দল চালায়, ওয়ালস্ট্রিটই হল দুর্নীতির উৎস। তাই বদল আনতে হলে তাকেই আক্রমণ করতে হবে। তবে এই আন্দোলন করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে। আন্দোলনকারীরা গিয়ে ওয়ালস্ট্রিটের কাছে জুকোটি পার্কে অবস্থান শুরু করে। এই পার্কটি সরকারী নয় বলে পুলিশ ওদের তুলে দিতে পারে না।
নেতাহীন আন্দোলন

১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই অবস্থান ধর্মঘট শুরু হয়। প্রথম দিকে বেশিরভাগ আন্দোলনকারীই ছিল অল্পবয়সী। আসত্মে আসত্মে নানান বয়সের মানুষ যোগ দিতে থাকেন। অনেক পরিবার তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসার ফলে এখন ওই পার্কে অনেক বাচ্চাও দেখা যাচ্ছে, কারও হাতে পোস্টার : 'তোমরা আমার সঙ্গে আছ বলে, আমিও তোমাদের সঙ্গে আছি।' বেশ কিছু ট্রেড ইউনিয়নও এখন এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে, যদিও তারা এই আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা নিতে চায় না। তাদের বক্তব্য হলো : কর্পোরেট লোভবিরোধী আন্দোলনে তারা পাশে থাকবে।
ছড়িয়ে পড়া আগুন। ফিলাডেলফিয়ার রাসত্মায় 'অকুপাই ওয়ালস্ট্র্রিট' আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল।
'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলনকে নেতাহীন আন্দোলন বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। আন্দোলনের মানুষেরা ও সংবাদমাধ্যম এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্রের ওপর খুব জোর দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগঠন বা ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার মতো উদ্দেশ্যে নয়, মানুষ কতগুলো আদর্শের ভিত্তিতে, সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে পথে নেমেছে।
আদর্শ আছে, রাজনীতি নেই

আন্দোলনের সমর্থকরা এই আন্দোলনের সঙ্গে মিসরে পালাবদল ঘটানো তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের তুলনা করছেন। এঁরা নিজেদের জনগণের ৯৯% বলে বর্ণনা করে বলছেন, সমাজের ১% লোভীরা 'আমেরিকান ড্রিম' খুন করেছে, সেই খুনীদের ধরতে এবং শায়েসত্মা করতে হবে। কর্পোরেট লোভই হল খুনের মোটিভ। আন্দোলনে খ্রিস্টীয় সংগঠনদেরও দেখা যাচ্ছে, তাদের হাতে পোস্টার : 'যীশু ৯৯%-র সঙ্গে আছেন।' রিপাবলিকান দলের নেতা এরিক ক্যান্টর এই আন্দোলনকারীদের রায়ট বাধানো জনতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিপাবলিকান সমর্থনে জেতা নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল বস্নমবার্গ বলেছেন, এই আন্দোলন অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। আবার ডেমোক্র্যাটরা নানান কায়দায় এই ক্ষোভের ফসল তুলতে নেমে পড়েছেন। ওবামা বলেছেন, এই আন্দোলন সঙ্গত, এ হলো অর্থনৈতিক অব্যবস্থার বিরম্নদ্ধে গভীর ক্ষোভের প্রকাশ। তাতে অবশ্য আন্দোলনকারীরা খুব গলেননি, তাঁদের বক্তব্য : তিনি তো বলছেন অনেক, করছেন না কিছুই।
নেতাবিহীন বলা হলেও তো একেবারে অগোছাল হয়ে কোন আন্দোলন চালানো যায় না। তাই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই কিছু সংগঠন তৈরি হচ্ছে। এত মানুষের চিকিৎসা, খাবার, মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, পুলিশ সামলানো এই সব নানা দিক দেখার জন্য স্বেচ্ছাসেবক সমিতি তৈরি হচ্ছে। আন্দোলনের মানুষরা দিনে দু'বার জেনারেল এ্যাসেম্বলি করে নানান সিদ্ধানত্ম নিচ্ছেন।
মানব মাইক ও অন্যান্য গল্প

ইরাকে বা আফগানিসত্মানে পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে সিভিলিয়ানদের অমস্নানবদনে মারতে পারে, নিজেদের দেশে তা পারে না। তবু 'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলন একটা পিকনিক, এ রকম মনে করার কোন কারণ নেই। ইতোমধ্যেই ৮০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। জেলে তাঁদের কুৎসিতভাবে রাখা হচ্ছে। নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁদের আইনী সহায়তা দেওয়ার জন্য সংগঠিত হয়েছেন। লঙ্কা গ্যাস ছেটানো হচ্ছে, উচ্ছেদের নানা চেষ্টা চলছে। পুলিশ মাইক ব্যবহার করতে দিচ্ছে না বলে আন্দোলনকারীরা 'মানব মাইক' ব্যবহার করছেন। ব্যাপারটা এক অর্থে আমাদের কীর্তনের আসরের মতো। বক্তা কিছু বলে থামছেন। সামনের লোকেরা সবাই মিলে চিৎকার করে সেটা রিপিট করছেন, যাতে পেছনের লোকে শুনতে পায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রক্রিয়াটা বেশ কাজ করছে, আর মনোবল বাড়াচ্ছে। 'পুলিশ কেমন জব্দ হলি', এ রকম একটা ভাব। পাশাপাশি নানান সমালোচনাও চলছে। অনেকে বলছেন, সিস্নপিং ব্যাগের ভেতরে যৌনতা চলছে, মেয়েরা নিজেদের নগ্ন শরীরকে পোস্টার হিসেবে ব্যবহার করছে। এক জনের ছবি বেরিয়েছে, সে পুলিশের গাড়িকে গ্রাহ্য না করে তার ওপরেই বাহ্যে করছে। আবার বাজারও পিছিয়ে নেই, আমাদের দেশে যেমন অন্না টি-শার্ট বেরিয়ে গিয়েছিল, ওখানে নানান রকম কা- চলছে। 'অকুপাই' বলে নাকি একটা পাই-জাতীয় খাবার পিৎজার দোকানে বেরিয়ে গেছে। ওই নামে কম্পিউটার গেম তৈরি হচ্ছে, বাজারে এল বলে।
পার্টি নেই, আন্দোলন আছে

অনেক সময় অন্য সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ঘটা কোন কিছুকে বিচার করতে গিয়ে আমরা তার কয়েকটা অস্বসত্মিকর দিকের ওপর জোর দিয়ে তার দাবিগুলোর গুরম্নত্বকে বুঝতে ব্যর্থ হই। এতে যে ব্যবস্থাটা টিকে আছে, তারই সুবিধে হয়। ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন হচ্ছে সাদা দেশে, যাদের সুবিধাভোগী বলে ভাবার একটা অভ্যেস আমাদের আছে। সিস্নপিং ব্যাগ আর সাদা লোকজন দেখলেই আমরা কী রকম হলিউড ছবি আর বিদেশ থেকে আত্মীয়দের পাঠানো সুখের ভিডিয়োর গলে ঢুকে যাই।
তা কিন্তু ঘটনা নয়। দুনিয়া জোড়া অর্থনীতিতে যে টালমাটাল চলছে তাতে আমেরিকার সাধারণ মানুষ আর আমাদের চেয়ে কম বিপন্ন নয়। আমাদের দেশে যে বাজার মডেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্রমশই মধ্যবিত্তেরও হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সে ঘটনা তাদের দেশে বহুদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবেই ঘটে চলেছে। এখন মার্কিন অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় লোকের নাভিশ্বাস উঠেছে। প্রতিবাদ তাই বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত এটা হয়ত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আরও বেশি দীর্ঘদিন একটা বাম আন্দোলনের আবহাওয়ার মধ্যে থাকার ফলে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনীতির প্রতি একটা অবজ্ঞা আছে। আমাদের ধারণা, একটা পার্টর্ি না থাকলে কোন আন্দোলন হয় না। ঘটনা কিন্তু একেবারেই তা নয়। বিশ্বজোড়া নারীবাদী আন্দোলনের কোন বিশাল পার্টি ছিল না। সমকামী আন্দোলনেরও না। পরিবেশ আন্দোলনের একটি গ্রিন পার্টি থাকলেও, সে আন্দোলন পার্টিবাহিত রাজনীতি দিয়ে ছড়ায়নি। এই শতকের গোড়ায় ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম বলে যে আন্দোলন দেখেছিলাম, তা-ও কোন রাজনৈতিক দলবাহিত না হয়েও কর্পোরেট লোভ আর ধ্বংসের দিকে আমাদের নজর টেনেছিল। এই আন্দোলনগুলো নানাভাবে আমাদের ধারণা বদলায়, সমাজ বদলায়। নারীবাদী আন্দোলন, সমকামী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন যে আমাদের বোধ, অভ্যাস, বিশ্বাসে বেশ কিছু বদল এনেছে, সমাজের পরিবেশ বদলেছে, এটা নিশ্চয় আমরা অস্বীকার করব না।
ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন মানুষের বাঁচার স্বপ্নের খুনী হিসেবে সমাজের ১% মানুষের লোভের কথা বলেছে। কথা হলো, সমাজের বাকি ৯৯%-এর মধ্যে ওই লোভের ভাগ ছড়াতে না পারলে তো তাদের ঠকিয়ে ওই ১% লাভটাকে নিজের ঘরে তুলতে পারে না। ধনতন্ত্রের গায়ের জোরের ব্যবহার অবশ্যই আছে, কিন্তু ধনতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় মানুষের সমর্থন না থাকলে সে ব্যবস্থা কি বাড়তে পারত? তাই বিপদটাকে কেবল বাইরের শত্রম্ন বলে না চিনে নিজেদের মধ্যেও চিহ্নিত করতে না পারলে, বদল আসবে কি? আমাদের আন্না-আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখেছি। সরকার তো করাপ্ট বটেই, কিন্তু কোম্পানিগুলো তো সমান লোভী। আর 'পবিত্র আন্দোলনকারী' বলে কিছু হয় কি? আমাদের চার পাশে পঞ্চায়েত আন্দোলন তো সব দুর্নীতিগ্রসত্ম মানুষ নিয়ে শুরম্ন হয়নি, তবে এই রকম হয়ে গেল কেন? ক্ষমতার লোভ যে জলের মতো গড়িয়ে ঢুকে সব আদর্শকে কাদা করে দেয়, সেটা না মানলে বিকল কাঠামো কল্পনা করা কঠিন।
এই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে খ্যাতনামা দার্শনিক সস্নাভোজ জিজেক বলেছেন : 'আমার শুধু এটা নিয়েই ভয় যে এক দিন আমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাব। আর তার পর আমরা বছরে একদিন দেখা করব। বিয়ার খেতে খেতে ভাবব, এই [আন্দোলনের] দিনগুলো কী দারম্নণ ছিল। আসুন আমরা নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞা করি, সেটা হতে দেব না। জানেন তো, মানুষ অনেক সময় কিছু কামনা করে কিন্তু সেটা ঠিক চায় না, যা কামনা করেন সেটা সত্যি সত্যি চাইতে ভয় পাবেন না। (পুরো বক্তৃতার জন্য দেখুন : যঃঃঢ়://িি.িষধপধহ.পড়স/ঃযবংুসঢ়ঃড়স/?ঢ়ধমবথরফ=১৪৭৬)
জিজেক খুব সহজ করে একটা খুব সত্যি কথা বলেছেন। কামনা করাটা সহজ, সেটা একটু অলসভাবে, নিজেকে না বদলেও, করা যায়। তার মধ্যে যেন একটা না পাওয়ার সানত্ম্বনা বিল্ট-ইন থাকে। সেটাকে একটা সুউচ্চ আইডোলজি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। 'চেয়েছিলাম, পেলাম না' বলে দুঃখবিলাস করা যায়। কিন্তু চাওয়াটা দৃঢ় একটা রাজনীতি দাবি করে, যার জন্য নিজেদের বদলাতে হয়, অত সহজে ঘরে ফেরা যায় না। এই আন্দোলনটা কঠিন। কারণ, সাধারণ মানুষ এই কাজটা করবে কী করে? আমাদের তো নিজেদের জীবনটা চালাতে হয়। তখনই পেশাদার রাজনীতিবিদরা আসেন, আসে ক্ষমতা, লোভের গল। ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন আমাদের এই সব জরম্নরী বিষয় নিয়ে 'ভাবা প্র্যাকটিস' করতে বলে।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে