মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১, ২২ ভাদ্র ১৪১৮
মনমোহন সিংয়ের সফর এবং উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
ড. হারুন রশীদ
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে গত কয়েক মাসই ব্যাপক আলোচনা-প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ ৬ সেপ্টেম্বর ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসছেন। তিনি শুধু একাই আসছেন না, চারটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও আসছেন তাঁর সঙ্গে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সে যাই হোক। বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে বিভিন্ন মহল থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনি এক সংবাদ সম্মেলনে এই সফরকে 'ঐতিহাসিক' বলে উলেস্নখ করেছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বের রবিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সম্পর্কে সাংবাদিকদের বিস্তারিত ধারণা দেন। এই সময় তিনি উলেস্নখ করেন, মনমোহনের দু'দিনের সফরে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। এই সফরে দু'দেশের মধ্যে বৃহত্তর কাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সই হবে। এর বাইরে পানি বণ্টন, সীমান্ত, রেল সংযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়, সুন্দরবন সংক্রান্ত দশ-বারটি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল এবং ট্রানজিট বিষয়ে সম্মতিসূচক পত্র বিনিময় হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সাংবাদিক সম্মেলনে আরও জানান, ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের যে নব দিগন্তের সূচনা হয়েছিল ড. মনমোহন সিংয়ের আগমনের মাধ্যমে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। দেড় বছর ধরে দু'দেশের সরকার একযোগে কাজ করে নয়াদিল্লী ইশতেহারের বিষয়গুলো এগিয়ে নিয়ে গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দু'দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য সহায়ক হবে। এ কথা বলার অপেৰা রাখে না যে, মনমোহন সিংয়ের এই সফরকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাঁর এই সফরের মধ্যদিয়ে উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে যাবে_রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমনটিও মনে করছেন। তাঁর এই সফর নানা দিক থেকে অত্যন্ত গুরম্নত্বপূর্ণ। এই প্রথম ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাৰিক চুক্তি করতে বাংলাদেশে আসছেন। এর আগে ভারতের অনেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেও তারা দ্বিপাৰিক কোন চুক্তি সই করার জন্য আসেননি। এসেছেন কোন সম্মেলন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাহায্য সহানুভূতি জানাতে। সেদিক থেকে মনমোহন সিংয়ের এই সফরকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনির ভাষায় 'ঐতিহাসিক' বললেও অতু্যক্তি হবে না। এছাড়া এই সফরের মধ্যদিয়ে গত ৪০ বছরের দু'টি দেশে বিদ্যমান নানা সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। যা শুধু দু'টি দেশই নয়, এই অঞ্চলের মানুষের ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্যও মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ। এটা ঠিক, ভৌগোলিক কারণেই দু'টি দেশের মধ্যে আনত্মঃসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যনত্ম জরম্নরী। এছাড়া বিদ্যমান বিশ্ববাসত্মবতায় প্রতিবেশী দেশ তো বটেই স্বার্থসংশিস্নষ্ট প্রত্যেকটি দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ব্যতিরেকে কোন দেশের পৰেই এককভাবে চলা সম্ভব নয়। দেশে দেশে পারস্পরিক সহযোগিতা, লেন-দেন এবং উন্নয়ন কর্মকা-ে একটি দেশ আরেকটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে তৎপর। এ পরিপ্রেৰিতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অত্যনত্ম নিবিড় এবং আস্থাশীল হওয়া অত্যনত্ম জরম্নরী।
সম্পর্ক জোরদার হয় লেন-দেনের মাধ্যমে। আর এই লেন-দেন কেবল অর্থনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়টিও যুক্ত। এছাড়া দু'টি দেশের জনসাধারণের নিবিড় সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধনের বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য। এসব কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অত্যনত্ম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে দেখতে হবে। কেউ কারও কাছ থেকে কিছু পেতে হলে দু'টি দেশকেই সন্দেহ-অবিশ্বাসের উর্ধে উঠে এগিয়ে যেতে হবে। দু'টি দেশের মধ্যে সীমানত্ম সমস্যা, অভিন্ন নদীসহ অন্য যে সব সমস্যা রয়েছে তা মিটিয়ে ফেলতে হবে সবার আগে। এবারের বৈঠকে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা কিংবা সম্মতিপত্র সই হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রানজিট। নব্বইয়ের দশক থেকেই বাংলাদেশের কাছে ভারত ট্রানজিট সুবিধা চাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যনত্ম বিষয়টি অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ট্রানজিট দিলে উভয় দেশই সুবিধা পাবে বলা হলেও বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিটের বিনিময়ে কি পাবে, সেটি পরিষ্কার নয়। যদিও এর আগে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছেন, 'ট্রানজিট ফি প্রদানের বিষয়ে ভারত প্রস্তুত আছে'। এ ব্যাপারে কি হারে ফি নির্ধারণ করা হবে এবং কোথায় দিয়ে কি ধরনের ট্রানজিট সুবিধা ভারত পেতে চায়; সেসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। এছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্তিই বা কি, এ বিষয়েও ভাবতে হবে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে কতটা প্রস্তুত, সে বিষয়টিও দেখতে হবে।
ভারতকে ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট কিংবা করিডর যাই দেয়া হোক না কেন, সেটির ভিত্তি অবশ্যই হতে হবে সহযোগিতাসুলভ মনোভাব। ট্রানজিট সুবিধা দিলে বাংলাদেশও যাতে এরূপ সুবিধা কিংবা সমমানের কিছু পায়, সেদিকটাও ভারতকে দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি তা কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে হবে। নেপাল, ভুটান, পাকিসত্মানে বাংলাদেশী পণ্য পরিবহনের সুবিধার ব্যাপারেও ভারতসহ সংশিস্নষ্ট দেশগুলোকে সহযোগিতাসুলভ মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোও মিটিয়ে ফেলতে হবে। সমুদ্রসীমা নির্দিষ্টকরণ, স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণ, সীমানত্মে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশী হত্যা, আনত্মঃদেশীয় নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া, ফারাক্কা এবং টিপাইমুখ বাঁধের প্রতিক্রিয়া_এসব বিষয় জিইয়ে রেখে কি কোন অবস্থাতেই আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব? অস্বীকার করার উপায় নেই, ট্রানজিট চালু হলে ভারত-বাংলাদেশ দু'টি দেশই লাভবান হবে। এ জন্য বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তা ভোলার নয়। বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে তা স্মরণ করে। এ কারণেই এ দেশের মানুষের ভারতের প্রতি একটি আত্মিক দুর্বলতা রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতির একটি ধারা প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। কিন্তু বর্তমান মহাজোট সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।' এ অবস্থায় উভয় দেশের জনসাধারণের মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে তা যদি দু'টি দেশের সরকারের মধ্যে সংক্রমিত হয় তাহলেই সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে_দেবে আর নেবে, মিলবে আর মেলাবে; এই মন্ত্রে দীৰিত হলেই কেবল দু'টি দেশই পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে এগিয়ে যেতে পারে। এর বাইরে একক চিনত্মায় কোন ফল নেই, এ কথা বলা যায় নিশ্চিত করেই। মনমোহন সিংয়ের সফরের মধ্যদিয়ে দু'টি দেশের সম্পর্ক অত্যনত্ম জোরদার এবং মজবুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সীমানত্ম সমস্যাসহ অন্যান্য অমীমাংসিত ইসু্যতে ভারত ইতোমধ্যেই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। দু'টি দেশের মধ্যে সীমানত্মহাট চালু হয়েছে। এটা সম্পর্কোন্নয়নের ৰেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। দ্বিপাৰিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এই অঞ্চলের মানুষ কয়েক যুগ ধরে অপেৰায় আছে। মনমোহন সিংয়ের সফর সেই প্রতীক্ষার সফল সমাপ্তি ঘটাবে এবং এই অঞ্চলের মানুষ উন্নয়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।