মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২৫ জুলাই ২০১১, ১০ শ্রাবণ ১৪১৮
ইভিএম ॥ দূর হোক সন্দেহ আর অনাস্থা
ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ
ড. একেএম রিয়াজুল হাসান ও এমজি কিবরিয়া সরকার
এক. সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ই-ভোটিং নিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ লাখ ইভিএম_ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন-এর আওতায় সারা দেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার গুরুদায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনের। একইভাবে এটি সফল করার দায়িত্বও অনেকাংশে নির্বাচন কমিশনের। প্রতিটি ইভিএম-এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা এবং সর্বসাকল্যে বাজেটের পরিমাণ ৬শ' কোটি টাকা। দেশীয় প্রযুক্তিতে এই ইভিএম তৈরি হচ্ছে বুয়েটের বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে গাজীপুরের মেশিন টু্যলস ফেক্টরিতে। ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচন সফল করার জন্য ইতোমধ্যে কমিশন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিরোধী দলের সঙ্গে ই-ভোটিং বিষয়ে বৈঠক এবং জেলায় জেলায় নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো ইত্যাদি এর অন্যতম। কমিশন বলেছে, সব কিছু সময়মতো শেষ করে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই ইভিএমের সর্বাত্মক ব্যবহার করা সম্ভব। যদি নির্বাচন কমিশনের এই পরিকল্পনা সফল হয় তাহলে পৃথিবীর ইতিহাসে স্বল্পোন্নত দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই হবে অতি অল্প সময়ে ইভিএম বাসত্মবায়নকারী দেশ। সে ৰেত্রে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ সারা বিশ্বে সমাদৃত হবে সন্দেহাতীতভাবে। পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশ ই-ভোটিং বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। তার অন্যতম কারণ, একদিকে জনগণের কাছে ইভিএম সম্পর্কে সন্দেহ আর অস্পষ্টতা। অন্যদিকে রাজনৈতিক ৰেত্রে পারস্পরিক আস্থার অভাব। আমরা আশা করব বাংলাদেশে অনত্মত তেমনটি ঘটবে না।
দুই. নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের যে নীতিমালা করেছিল তার আলোকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীতিমালা করলে কিছু বিষয় অবশ্যই সংযোজন কিংবা বিয়োজনের প্রয়োজন হবে। আমরা জানি, সংসদ নির্বাচন এদেশে সবচেয়ে বড় নির্বাচন। সে কারণে, বৃহৎ পরিসরে নীতিমালা আরও সুসংবদ্ধ ও যথোপযুক্ত হওয়া উচিত। নির্বাচন পর্যবেৰক হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন তাঁদের এই ইভিএম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ইভিএম নীতিমালায় বলা হয়েছিল, পোলিং বুথে ইভিএম ভোট নেবার জন্য যখন প্রস্তুত করা হবে তখন সেটি কিভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে সমগ্র প্রক্রিয়াটি ভিডিও করতে হবে। একজন নির্বাচন পর্যবেৰক ভিডিওটি দেখতে চাইলে তাকে দেখানোর নিয়ম অবশ্যই থাকতে হবে। যে চিপটি ব্যবহার করা হচ্ছে যন্ত্রের স্থায়ী স্মৃতিশক্তি হিসেবে তা আদৌ স্থায়ী কিনা সেটি বোঝার জন্য নির্বাচন পর্যবেৰকগণ কি করতে পারে তার স্পষ্ট বিধান থাকাও জরম্নরী। একইভাবে যেহেতু ইভিএমের মাধ্যমে প্রথম নির্বাচন সে জন্যে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র থেকে ভোটারদের অভিমত সংগ্রহ করে কোন ভুল-ত্রম্নটি হয়ে থাকলে তা ভবিষ্যতে সংশোধন করা। আরেকটি খুব গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়, এই বিধিমালার ৬-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে_ 'প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীদের নাম এবং প্রতীকের বিপরীতে কোন্ কোন্ সুইচ বরাদ্দ হইয়াছে তাহা লিপিবদ্ধ করিয়া সংরৰিত হইবে।' প্রশ্ন হলো, কোন পোলিং এজেন্ট যদি নির্বাচন চলাকালীন তাঁর সুইচটি আদৌ তাঁকে পূর্বে বলা সুইচে আছে কিনা, তা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে কি হবে? সেটি স্পষ্ট করতে হবে।
তিন. চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ইভিএম প্রজ্ঞাপনের ৭ নং ধারায় বলা আছে_ ইভিএমের যাবতীয় কারিগরি দিক পরীৰা-নিরীৰা করার জন্য থাকবে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একটি কারিগরি কমিটি। ২ লৰাধিক ইভিএমের জন্য এত বিপুল কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকবল কিভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই কমিটির পৰে যোগান দেয়া সম্ভব হবে, সেটি ভেবে দেখা জরম্নরী। কারণ যন্ত্র মানেই যান্ত্রিক জটিলতা থাকার সম্ভাবনা। তাই, এই জটিলতা দূর করার জন্য এমন কমিটির বিকল্প নেই। ওই বিধিমালার ১৯ নং ধারায় ভোট গণনা ও প্রদর্শন নিয়ে যেসব কথা উলেস্নখ করা হয়েছে তা কেবল একজন ইভিএম সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পৰেই বোঝা সম্ভব এবং সেই ব্যক্তির প্রযুক্তিগত ধারণা থাকতে হবে। নির্বাচন কেন্দ্রে যে পোলিং এজেন্ট থাকবেন তাঁদের সবার এই জ্ঞান না থাকলে তিনি ভাল করে বুঝতেই পারবেন না প্রযুক্তির এই দিকগুলো। এ অবস্থায় তখন তাঁর মনে সন্দেহ দানা বাধতেই পারে। সে কারণে, নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এ বিষয়ে আগে থেকেই এমন কোন ব্যবস্থা করা যাতে এই আশু সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। এদিকে মাস্টারকার্ডকে ইভিএম ব্যবহারে অতি গুরম্নত্বপূর্ণ কিছু ভূমিকা দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো, মাস্টারকার্ড ছাড়া ফল প্রদর্শন করবে না ইভিএম (বিধি নং ১৯-এর ৩)। সেৰেত্রে মাস্টারকার্ড সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা বিধিমালায় উলেস্নখ থাকা প্রয়োজন। এই কার্ডের গঠন কিরূপ এবং কিভাবে এটি কাজ করে সে সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা থাকা জরম্নরী।
চার. সম্প্রতি বিরোধী দল একতরফাভাবে ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছে। এৰেত্রে একতরফা বিরোধিতা না করে গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত বলে আমরা মনে করি। কারচুপি হোক এটি কেউ চায় না। আর সে জন্যই কারচুপির পথ বন্ধ করতে দরকার গঠনমূলক সমালোচনা। বিরোধী দল অন্ধ বিশ্বাসে বলে দিয়েছে, নির্বাচনে ডিজিটাল কারচুপি হবে ইভিএমের মাধ্যমে। কিন্তু কিভাবে কারচুপি হবে সেটি স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। নির্বাচনে ভোট প্রদান ও গণনার একটি আধুনিক যন্ত্র ইভিএম। এই যন্ত্রের ব্যবহার আজ অথবা কাল আমাদের নির্বাচনে হবেই। তাহলে বিরোধিতা কেন? নির্বাচনে যেকোন কিছুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐকমত্যে না পেঁৗছলে তার ফল ভাল হয় না, এরূপ অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। সেজন্যে ইভিএমের ব্যাপারে দুই দলের সহমত অবশ্যই জরম্নরী। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সহমতের নয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক উন্নতির বিষয়ে সহমতের কোন বিকল্প নেই। আলোচনা-সমালোচনাই একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার জন্য উন্নতির পথ বাতলে দিতে পারে। কিন্তু বিরোধিতা করে যেকোন ধরনের উন্নতি থামিয়ে দেয়া এবং একইভাবে বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে এককভাবে উন্নতির চেষ্টা করা; কোনটিই কাজের কথা নয়। আখেরে এতে কেউ খুব বেশি সফল হয় না। ১৯৯০ উত্তর আমাদের রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিরোধী দল ছায়া সরকারের ভূমিকায় রয়েছে এমনটি আমরা যেমন দেখিনি তেমনি সরকার থেকে বিরোধী দলের প্রতি যেকোন বিষয়ে গুরম্নত্ব দিয়ে মতামত বিবেচনার সংস্কৃতিও আমাদের রাজনীতিতে এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু উন্নতির সংস্কৃতি বাসত্মবায়নের জন্য এই ধারা বদলানো জরম্নরী। এৰেত্রে সরকার ও বিরোধী দল দু'পৰের উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। বিরোধী দল যদি ইভিএমের ব্যাপারে গঠনমূলক সমালোচনা না করে একতরফাভাবে এর বিরোধিতা করে যায় তাহলে এটি প্রমাণ করা সরকারের পৰে খুব কঠিন হবে না যে বিরোধী দল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চায় না। পাশাপাশি এটিও মনে রাখা দরকার, উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে প্রযুক্তির বিরোধিতা করা ছাড়া রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিরোধিতা বিরোধী দলের নিজের ইমেজকেই ৰতিগ্রসত্ম করবে।
পাঁচ. বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ৰমতায় এসেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ছাড়াও দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচন, কয়েকটি উপনির্বাচন এবং সবশেষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন গত আড়াই বছরে সম্পন্ন হয়েছে যেখানে নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের প্রভাব বিসত্মারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। যদিও রূপকল্প-২০২১ এ ই-ভোটিং-এর বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উলেস্নখ নেই তবুও এটি যে সে লৰ্য পূরণে সরকারকে উলেস্নখযোগ্য সাফল্য এনে দেবে, সম্ভবত এমনটি উপলব্ধি করেই সরকার ইভিএম বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনকে জোরালো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের একটি উদ্যোগের ফলে, দেশের সর্বসত্মরের মানুষ এমন একটি সুযোগ পাবে যেটি প্রযুক্তির অন্যান্য ৰেত্রে এত বিশদভাবে কখনই সম্ভব হবে না। সে কারণে ইভিএমের সফল বাস্তবায়ন সরকারের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জের তেমনি অনেক বড় একটি সুযোগ নিজেদের কর্মৰমতা দেখানোর। তবে যেহেতু বিরোধী দল বিষয়টি নিয়ে আস্থাহীনতা প্রকাশ করে যাচ্ছে সে কারণে সরকারের উচিত হবে ইভিএম সম্পর্কে জনমনে বিরাজিত সন্দেহ আর অস্পষ্টতা দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়া; পাশাপশি ইভিএমের সাফল্যের অংশীদার হতে বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানানো। যাতে তাঁরা উভয়ে এই বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করে প্রযুক্তি ৰেত্রে নিজেদের অবদান তুলে ধরতে পারেন, যেমনটি তাঁরা পেরেছিলেন ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন করে।

লেখকবৃন্দ : প্রফেসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সহযোগী অধ্যাপক, বিসিএস শিক্ষা এবং গবেষক
janipop1995@gmail.com