মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২৫ জুলাই ২০১১, ১০ শ্রাবণ ১৪১৮
সিডনির মেলব্যাগ
শীতার্ত সিডনি, উত্তপ্ত স্বদেশ ও ভবিষ্যত
অজয় দাশ গুপ্ত
প্রচণ্ড শীতের দাপটে কাবু হয়ে আছি আমরা। ডাউন আন্ডার দ্য ওয়ার্ল্ড নামে পরিচিত প্রশান্ত অঞ্চল পৃথিবীর একেবারে অন্যপ্রান্তে। অন্যান্য দেশে যখন হয় গ্রীষ্ম অথবা মৌসুমী অঞ্চলের বারিপাত, এদিকে তখন হিমবাহ। প্রায় গৃহবন্দী মানুষ কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপটে প্রকৃতির কাছে নতজানু। এই শীতলতার ভেতরও বাংলাদেশের উত্তেজনা মাঝে মধ্যে দোলা দিয়ে যায়। দেশের পরিবশে, অস্থির, উন্মাদনা, রাজনীতির উষ্ণতায় জেগে উঠি আমরা। বলাবাহুল্য হরতালের প্রভাব, এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এখানকার বাঙালীদেরও তর্কপ্রবণ করে তোলে। পার্থক্য এই, বাদানুবাদের পর্ব শেষ হলে প্রবাসী বাঙালীর মিলিত দীর্ঘশ্বাস ঘুরপাক খায়, প্রশ্ন হয়ে জেগে থাকে ভবিষ্যত বিষয়ক দেশজ ভাবনা। সবার এক কথা। কবে আমরা এ জাতীয় অপপ্রক্রিয়া মুক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শিখব? কবে আমাদের রাজনীতি বুঝতে শিখবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জীবন প্রগতি ভিন্ন বিষয়। তাকে নিয়ে ছেলেখেলার দিন নেই আর। এবারের হরতাল যেন এ বিষয়গুলোকে আরও প্রকট আরও মূর্ত করে দিয়ে গেল।
আগেও লিখেছি বাংলাদেশ এখন অগ্রসরমান এক দেশ। সে কেবল আমদানিনির্ভর সমাজ বা অনুদাননির্ভর রাষ্ট্র নয়, তার ডানা মেলা এখন চাৰুষ। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত দোকানপাটে বাংলাদেশী পণ্যের সমারোহ, প্রতিনিয়ত ঢুকছে নতুন নতুন পণ্যসামগ্রী। তৈরি পোশাক থেকে মসলা, আনাজ এমনকি বিক্রয়োত্তর সেবার মতো জরম্নরী বিষয়েও সম্ভাবনা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। বাংলাদেশের আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপের কথা মনে রাখলে এ সম্ভাবনাকে আশীর্বাদ ভাবার বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, এ দেশ না আমেরিকা, না ইউরোপ। সমুদ্রবেষ্টিত নিঃসঙ্গ এক দ্বীপ দেশ। দু'কোটির কিছু বেশি জনসংখ্যা। পরিমিত জনসংখ্যা হলেও বাজার কিন্তু ছোট কিছু নয়। ক্রয় ৰমতার কারণে এ বাজার প্রতিযোগিতার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের চাহিদা যেমন ব্যাপক, তেমনি বিক্রেতার আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মান দেখলেই বোঝা সম্ভব কেন সবাই এখানে পণ্য বিপণনের জন্য উন্মুখ। রেকর্ড শীর্ষে যাওয়া অজি ডলার আমেরিকান ডলারকেও পেছনে ফেলে দ্রম্নত এগিয়ে চলেছে। আমি যখন এ দেশে আসি, তখন আমেরিকান ডলার আর অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মূল্যমান ছিল আধাআধি, অর্থাৎ পঞ্চাশ সেন্ট বা আধুলি মার্কিন ডলারে পাওয়া যেত এক অস্ট্রেলিয়ান ডলার। সে দৃশ্যপট এখন একেবারেই উল্টো। অস্ট্রেলিয়ান ডলারের প্রতি বিশ্ব আগ্রহ, বাণিজ্য বা অন্যান্য উপায়ে তাকে বাগে আনতে চাওয়া তাই খুবই স্বাভাবিক। যেভাবেই হোক বাংলাদেশী পণ্য সে জায়গাটুকুর দখল নিতে শুরম্ন করেছে।
এই আশীর্বাদ বজায় রাখতে হলে শানত্মি, স্থিতিশীলতা ও মান বজায় রাখার বিকল্প নেই। যেসব দেশ তা করে, অথবা করতে পারছে তারা অন্য গ্রহের কেউ নয় এই ধরিত্রীর মাটির সনত্মান। দেশ ও সমাজ তাদের শক্তি যোগায়। সে সব দেশের রাজনীতি ও নেতৃত্ব নেয় সহযোগীর ভূমিকা। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে তা ঘটে না। সরকারী দল ৰমতায় থাকা নেতৃত্ব, শানত্মি ও স্থিতিশীলতা চায় বটে, বিরোধীরা তখন একেবারে মারমুখো। দেশ, অর্থনীতি, জনকল্যাণ বা ব্যবসায় লাভ ৰতি কোন কিছুই ধর্তব্যে আনেন না তারা। একমাত্র লৰ্য হয়ে দাঁড়ার অস্থির ও অস্থিতিশীল এক পরিবেশ তৈরি করে তোলা।
এখনকার বিরোধী দল ঠিক তাই করে চলেছে। আজ যারা ৰমতায় অন্য শিবিরে থাকলে তারাও হয়তো একই কাজ করতেন। এ জন্যেই বলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরম্নরী। কিন্তু পরিবর্তন সাধনে যে স্থিরতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজন, তার কি কোন লৰণ চোখে পড়ে? একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন, বিগত কয়েক দশকে অনত্মত দুই থেকে তিনটি প্রজন্মের জন্ম হয়েছে, এরা বয়সে নবীন, মেধায় উজ্জ্বল, ব্যাপ্তিতে দুনিয়াজোড়া, প্রযুক্তির কল্যাণে দুনিয়া এদের হাতের মুঠোয়। এরা দেখছে পৃথিবীর আর কোন দেশে কোন সমাজে এমন আত্মঘাতী রাজনীতি চলে না। সবাই নিজের ভালোটা আগে বোঝে।
কিছুদিন আগে এদেশে বড় হওয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক তরম্নণের একটি লেখা ছেপেছিল সিডনি মর্নিং হেরাল্ড। তরম্নণটি দেশের ভাবমূর্তি বিকাশে সফররত বিদেশী সাংবাদিকদের দলে বাংলাদেশ ভ্রমণ করে এসেছেন। কিঞ্চিৎ সংশয় সন্দেহ আর দোলাচলের পরও তার মনত্মব্য ছিল বাংলাদেশ হতে পারে দৰিণ এশিয়ার মডেল, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেৰ সমাজ আর গণতন্ত্রের উৎসভূমি, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরও সংস্কৃতি একে দিয়েছে আধুনিকতা, চারিত্রে গণতন্ত্র, নারীর শাসন আর মিডিয়ার জয়জয়কারে বাংলাদেশ লাভ করছে নতুন ব্যঞ্জনা, নতুন পরিচয়ের উন্মেষ লগ্নে রাজপথ লাল করে দেয়ার পুরনো খেলা, অর্ধনগ্ন বিরোধী নেতার রক্তাক্ত ছবি, পুলিশী তা-ব, হরতালের নামে নৈরাজ্য_তাই অগ্রহণযোগ্য ও বর্জনীয়। বলাবাহুল্য, পৃথিবী চোখ বন্ধ করে নেই। যারা বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ, ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিস্থিতি মনিটরিং করেন তাঁরা। খুব স্বাভাবিক। যে দেশে অর্থ লগি্ন করে ভাগ্য নিয়ে খেলবেন সে রাষ্ট্রের নাড়ি-নৰত্র জানতে চাওয়াই উচিত নয় কি? তাছাড়া বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার যে ঢেউ তাকে ভুলে থাকারও কারণ নেই। আমরা না পারলে সে জায়গা দখলে নেয়া বা অর্জন করে নেয়ার মতো দেশ আরও দশটি আছে, তারাও অপেৰমাণ। যে কোন ফাঁকে ঢুকে পড়তে ব্যগ্র। এমন পরিস্থিতির পরও যে রাজনীতি নিজের ঘরে আগুন দিয়ে গৃহদাহের উত্তাপে আগুন পোহায় তাকে কি মানুষ কাছে টানবে? না ভালোবাসতে পারে? শীতার্ত সিডনি তথা অস্ট্রেলিয়ার বাঙালীর কাছেও এই উত্তাপ একেবারে অসহ্য আর পরিত্যাজ্য। কেউ কি এসব শোনেন? না শুনতে চান?
dasguptaajoy@hotmail.com