মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২ জুলাই ২০১১, ১৮ আষাঢ় ১৪১৮
মায়ের আকুতি ॥ সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত সোনার সংসার ধ্বংস হয়ে যাবে?
শামীমা সুলতানা
আবার এসেছে আষাঢ়। সেই ১ জুলাইও আবার বছর ঘুরে এসেছে। প্রিয় এ বর্ষা ঋতুতেই আমাদের একমাত্র সন্তান প্রাণপ্রিয় রোমানস এই পৃথিবীতে এসেছিল আমাদের কোল আলো করে। রাজশাহীর (নানা বাড়ি) ডা. জোবেদার ক্লিনিকে। আমাদের রোমানস যখন সাড়ে ৮ পাউন্ড ওজন নিয়ে জন্মাল তখন ক্লিনিকে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল, 'আজ আমাদের ক্লিনিকে একটি সেরা শিশুর জন্ম হয়েছে'। কারণ, অন্যান্য রম্নমের শিশুগুলো ৫ পাউন্ডের বেশি নয়। সত্যি সত্যিই রোমানস ছিল সকলের সেরা। আলস্নাহতায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে এ সন্তান আমাদের দিয়েছিলেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, বাবা, মা সবার কাছে সে ছিল প্রিয়, সেরা ছেলে। কিন্তু মাত্র ২৩ বছর বয়সে যে এ সম্ভাবনাময় সুযোগ্য সনত্মানটি সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে তা যেন বিস্ময়কর। ২০০৯ সালে রোমানসের শেষ জন্মদিন পালন করা হয়েছে। ১ জুলাই ঐ দিন কেক কেটে তার মুখে যখন কেক তুলে দিই তখন স্বপ্নেও ভাবিনি এ জন্মদিনের কেক খাওয়াটাই শেষ। আমার সন্তানের জীবনে আর কোন দিনই ১ জুলাই তার জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা নিয়ে আসবে না। দুই বছর গত হলো আমাদের বাসায় সেই আগের মত আর ৩০ জুনের রাত ১২টায় টেলিফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে মুখরিত হয় না আত্মীয় ও বন্ধুদের শুভেচ্ছা বার্তায়। কারণ, আমার রোমানস সোনা যে নেই। সে হারিয়ে গেছে। রোমানসের প্রিয় খাবারগুলো এখন আর তৈরি করি না। সোনার ছেলের জন্মদিনটা আমাদের কাছে প্রচ- যন্ত্রণাদায়ক। পৃথিবীর কোন সনত্মানহারা বাবা-মা এ করম্নণ ঘটনা লিখতেও চায় না। আমারও মন চায় না এসব দুঃখের কথা লিখতে। তবুও কেন জানি লিখি, মনে হয় আমাদের একমাত্র সন্তান সবকিছু অনুভব করছে, দেখছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও দুঃখজনক ঘটনা হলো ২০০৯ সালে রোমানস মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসপি) থেকে ফার্স্ট ক্লাস ও ডিন এ্যাওয়ার্ডসহ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে। ঐ বছরই অর্থাৎ চারমাস পর ১ জুলাই ডানা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরিতে যোগদান করে। রোমানসের জন্মদিনে নিয়োগপত্র পাওয়ায় বাবুসোনা ভীষণ খুশি হয়েছিল। তাই জন্মদিনটাও খুব হাসি-খুশিতে পালন করি। শিউলী ফুলের মিষ্টি হাসি ছড়ানো থাকত সব সময় তার মুখে। সে হাসিমাখা মুখখানি আমাদের চোখে সব সময় ভাসে। তার মাত্র ৯ দিন পর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১০ জুলাই রাজশাহীতে এক আত্মীয়ের দাফন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে টাঙ্গাইলের বাসাইল নামক স্থানে তাদের মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং ভেতরের যাত্রী অন্য তিনজন আহত হলেও আমাদের সনত্মান দেশের সম্পদ এক তরম্নণ প্রকৌশলী রোমানস চিরতরে হারিয়ে যায়। বাবুসোনা, প্রতিবছরের মতো এবারও তোমার কপালে হাজারও চুম্বন ও দোয়া রইল। 'শুভ জন্মদিন- সোনাবাবু রোমানস'। সব সন্তানই বাবা-মার কাছে আদরের। কিন্তু আমাদের রোমানস ছিল খুব আদরপ্রিয় শিশুসুলভ। সকলের নয়নের মণি নানা-নানির অতি প্রিয়। খালামণিরা ছিল তার মায়ের মতো। সবাই বলত রোমানস সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে_সত্যিই তাই। আমার ২৩/২৪ বছরের চাকরিজীবী ছেলেকেও মাথায়, গায়ে, পিঠে হাত বুলিয়ে না দিলে ঘুমাত না। ভাত মাখিয়ে দিতে হতো। বেশিরভাগ সময় মুখে তুলে খাওয়াতে হতো। এমনকি দুর্ঘটনার আগের দিন ৯ জুলাই অফিসে যাওয়ার সময়ও আমি আমার সোনার ছেলেকে মুখে তুলে নাসত্মা খাইয়ে দিয়েছি। আজ ভাবলে আমি শিহরিত হই। ঐ দিনটাই ছিল আমাদের হাতে তার শেষ খাবার। শেষ চাকরি। একমাসও চাকরি করতে পারেনি। বিধাতার কি নির্মম পরিহাস? মাঝে মাঝে নিজের মনকে প্রশ্ন করি। বিধাতা কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সত্যিই কি তিনি আছেন? আল্লাহ তো মহান। আজ আমার ছেলের জন্মদিনে বার বার মনে হচ্ছে_ কেন আমাদের তিনজনের এ সুখের সংসারটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বর্ষাকালে জন্মছিল বলেই বোধহয়, রোমানস বর্ষায় ফোটা সুগন্ধি সাদাফুল। বৃষ্টি, বৃষ্টির গান ভালবাসত। আমারও প্রিয় এ বর্ষা ঋতু। যখন ঝমঝম বা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হতো আমরা মা ও ছেলে একসঙ্গে বারান্দায় গ্রিল ধরে বৃষ্টিঝরা দেখতাম। বাবুসোনা বলত, 'মা দেখেছ মাটির গন্ধ কত মিষ্টি। স্বামী-স্ত্রী ও একটি সন্তান_ তিনজনই ছিলাম আমরা বন্ধুর মতো। আমার বারান্দার টবে বর্ষাকালে জুঁই ফুল ফোটে। কতদিন ছেলের ঘরে ফুলদানিতে জুঁইফুল তুলে রেখে দিতাম। ও বলত, থ্যাংক ইউ, মা। আজও ফুল ফোটে। সনত্মান নেই, এ ব্যথা কেউ বুঝবে না। প্রতিটি ক্ষণে তাকে অনুভব করি। পূর্ণিমার চাঁদের মাঝে সন্তানের প্রাণখোলা হাসি মুখ দেখতে পাই। আমাদের চারপাশে তাকে স্পষ্ট অনুভব করি। আকাশে-বাতাসে ফুলের মাঝে, গানের মাঝে সব সময় রোমানসের অস্তিত্ব অনুভব করি। ২০০৯ সালের ১ জুলাই পর্যন্তম বর্ষা ঋতু আমাদের তিনজনের কাছে খুব প্রিয় ও বরকতময় ছিল। কারণ এ মাসেই আমরা রোমানসের মতো হাসিখুশি, দায়িত্ব-কর্তব্যপরায়ণ, অমায়িক-ভদ্র সুসন্তান বিধাতার কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলাম। কিন্তু যখন ২০০৯ সালের ১০ জুলাই এক আষাঢ়ে সন্ধ্যায় একমাত্র সন্তানকে বিধাতা নিয়ে গেলেন সেদিন থেকে আষাঢ় বা জুলাই মাসটা আমার কাছে মর্মানত্মিক ও অসহ্যকর। এ বর্ষা ঋতুতেই সন্তান পেয়েছি। আবার রোমনসের পরিণত বয়সে এনগেজমেন্টের মাত্র তিনমাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তাকে হারিয়েছি। তাই এখন মনে হয় ক্যালেন্ডারের বারোটি মাসের মধ্যে জুলাই মাসটা যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। শুধু আমাদের মনের মাঝেই জুলাই মাস ও দিনটি স্মৃতি হয়ে থাক। রোমানস আব্বু, প্রতিদিন তোমাকে স্বপ্নে দেখি। তুমি আমার সঙ্গে কাছে আমাকে জড়িয়ে আছ। ঘুম ভেঙে চমকে উঠি। তুমি নেই_ভাবতেই পারি না। তাই যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকি, একটা সুখময় গভীর স্বপ্নের মধ্যে থাকি। রোমানস সোনা, আজও তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। জানি তুমি আমাদের কাছে আসবে। আজ যে তোমার জন্মদিন। তোমার ছবির পাশে প্রতিবছরের মতো এবারও ফুলের তোড়াটা থাকবে-শুধু তোমাকেই পাব না। 'শুভ জন্মদিন রোমানস সোনা বাবু' আমরা আহ্লাদে চুম্বনসহ তোমার আত্মার শান্তি কামনা করছি। সরকার, দেশবাসী ও প্রতিটি মানুষের কাছে আমার মতো সনত্মানহারা মা-বাবার প্রশ্ন_ আর কতদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের মতো শত শত সোনার সংসার ধ্বংস হয়ে যাবে? আর রোমানসদের মতো সম্ভাবনাময় দেশের তরুণ সম্পদ অকালে ঝরে যাবে? কতদিন...?

লেখক : রোমানস-এর মা