মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২ জুলাই ২০১১, ১৮ আষাঢ় ১৪১৮
দুঃখী মানুষের মুখে ফুটে উঠুক অনাবিল হাসি
মাহবুব-উল-আলম খান
২০০১-এর নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের নীলনক্সায় সেদিন ক্ষমতাসীন হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। বিচারপতি লতিফুর রহমান ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান। তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আগেই কতিপয় 'ছক' ও 'হোমওয়ার্ক' করে রেখেছিলেন। সে ছক ছিল কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তথা আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা যায়। আর কিভাবে খালেদা-নিজামীর দলকে বিজয়ী করা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচন কমিশনও সেই একই চিন্তাচেতনায় কাজ করেছে। বিচারপতি লতিফুর রহমান তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে প্রশাসনকে ঢেলে সাজান। ১৯৯১-১৯৯৬-এর বিএনপি সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ছিল দেশকে পশ্চাৎমুখীকরণ ও অকল্যাণকরণ। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ বিএনপি একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল। তখন খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক ধারণাকে বলতেন পাগল ও শিশুর সরকার। কিন্তু একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তখনকার সময়ের প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক কনসেপ্ট যথার্থ ছিল। শত অপতৎপরতা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বাধ্য হন। ১৯৯৬-এর সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। ১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপি দেশ ও জাতিকে যে অপশাসন, দুঃশাসন ও অকল্যাণ উপহার দিয়েছিল সেই ধারা হতে ক্রমে ক্রমে জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা চালাল জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার। মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা বিধানের প্রচেষ্টা চালাল। সাধারণ মানুষ বিএনপির দুঃশাসনে দু'বেলা দু'মুঠো খাওয়া পেত না। মোটা চাল ছিল ১৮-২০ টাকা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মোটা চাল ১০ টাকায় নিয়ে আসে। গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নানাবিধ কর্মকা- হাতে নেয়। ১৯৯৬-২০০১-এর আওয়ামী লীগের সময়কাল ছিল বাংলাদেশের এক সোনালীকাল। সেদিন বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এক জোয়ার এসেছিল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল আওয়ামী লীগ। ২১ বছর পর জাতি ফিরে পেল মুক্তির আস্বাদন। ফিরে পেল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফল্গুধারা। বাঙালী জাতির হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের ধারা।
আমরা ২০০১-২০০৬-এর সরকার এক বিভীষিকাময় রাজত্বের সৃষ্টি করল। হাওয়া ভবন ও খোয়াব ভবন হতে উৎসারিত হলো সকল প্রকার দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার, হত্যা, সন্ত্রাস ও লুটপাট। এই দুই ভবনের আসল নায়ক হলেন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান। তাদের সঙ্গে তাদের লুটেরা বাহিনী ও নিকট আত্মীয়রা। খালেদা জিয়া হাওয়া ভবন তৈরি করে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র বানিয়ে তারেককে বসিয়ে দেন। তারেককে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন হতেই শুরু সকল অপকর্মের ও দুঃশাসনের। ২০০১-২০০৬ কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায়। ২০০১-এর সালসা নির্বাচনে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যে দুঃশাসন এ দেশের জনগণের ওপর চালিয়েছে তা ১৯৭১ সালে পাকিসত্মানীদের অত্যাচারকেও হার মানায়। বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, জঙ্গী তৎপরতা ও নানাবিধ অপকর্মে দেশবাসী অতিষ্ঠ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অমান্য করে খালেদা-নিজামীর রাষ্ট্রপতি জনাব ইয়াজউদ্দিন নিজেই প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। এই নীলনক্সা হলো ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এর নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। ইয়াজউদ্দিনের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে ড. আকবর আলী খান, সুলতানা কামালসহ কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগে বাধ্য হন। তাঁরা বুঝতে পারলেন ইয়াজউদ্দিন খালেদা-নিজামীর নীলনঙ্া বাসত্মবায়নে ব্যসত্ম।
জাতির এই চরম সন্ধিক্ষণে দেশে ঘটল ১/১১-এর ঘটনা। সেদিন জনগণ স্বসত্মির নিশ্বাস ফেলেছিল। ফখরম্নদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হলো নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পেছনে মঈন উদ্দিন, মাসুদ উদ্দিনের সেনা সমর্থন। গঠিত হলো ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশন বিএনপি তালিকাভুক্ত প্রায় দেড় কোটি ভোটার বাতিল করলেন। ভোটার আইডি কার্ড প্রদান করা হলো। এই সরকারের প্রথম দিকের কর্মকাণ্ডে জনগণ খুশি ছিল। ক্রমে এই সরকার নানাবিধ কর্মকাণ্ডে হাত দিয়ে নিজেদের বিতর্কে জড়িয়ে ফেলল। গ্রেফতার করা হলো দুই নেত্রীকে। অগণিত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ নিগৃহীত হলেন। অনেককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলো। তাদের নির্দিষ্ট কাজ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি বিলম্বিত হতে লাগল এবং এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক বিতর্কিত কর্মকা-ে নিজেদের জড়িয়ে ফেললেন। নির্দিষ্ট কাজের বাইরে বহুবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেললেন। এই বহুবিধ অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন। যথা সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বলতে হবে নির্বাচন অত্যনত্ম সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অবশ্যই ড. হুদার নির্বাচন কমিশন কৃতিত্বের দাবিদার। এই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভরাডুবি ঘটে। ২০০১-২০০৬-এর দুঃশাসনের জবাব জনগণ ভোটের মধ্যে দিল। আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট মহাবিজয় লাভ করল। তিন শ' আসনের মধ্যে মহাজোট ২৬২ আসনে বিজয়ী হলো। জনগণের রায়ে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট ক্ষমতা গ্রহণ করল। জনগণের হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে সারাদেশ উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত। সরকারের সামনে এখন বিরাট কাজ, পাহাড় প্রমাণ সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিএনপি-জামায়াত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৭ বছরকালের সমস্যাবলী সুরাহা করতে হবে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার একে একে দ্রম্নত বাসত্মবায়ন করতে হবে। মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। বিদু্যত, গ্যাস ও পানির সমস্যা দ্রম্নত মেটাতে হবে। গৃহীত পদক্ষেপ যাতে সুষ্ঠুভাবে ও দ্রম্নতগতিতে এগিয়ে চলে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। বিরোধী দল নানা ষড়যন্ত্র ও স্যাবোটেজে লিপ্ত। বিডিআর হত্যা দিয়ে এ অশুভ কর্মকা-ের সূচনা হয়েছে। সরকারকে চারদিকে চোখ কান খোলা রেখে এগোতে হবে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পেঁৗছানোর জন্য। মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যেতে হবে বর্তমান সরকারকে। কেননা আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জাতির জনক হত্যা বিচারের রায় বাসত্মবায়িত হয়েছে। পলাতকদের দ্রম্নত গ্রেফতার করে রায় বাস্তবায়িত করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। পাঁচ বছর মেয়াদের অর্ধেক শেষ হয়ে যাচ্ছে; বাকি সময়ে জরুরী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলো দ্রুত সুরাহা করা একানত্ম অপরিহার্য।
আসলে ২০০১-২০০৬-এর বিভীষিকাময় দিনে আমরা আর ফিরে যেতে চাই না। বিএনপি জামায়াতের হায়েনার ছোবলে সেদিন সারা বাংলাদেশ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, মানুষরা নির্যাতিত হয়েছে। লাঞ্ছিত হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে। সেদিনের প্রধানমন্ত্রী, তার সন্তানদ্বয়, ভাই, আত্মীয়স্বজন, দলীয় লুটেরা বাহিনী এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, পাচার করেছে। বিদেশে শত সু্যটকেস ভর্তি সম্পদ পাচার করেছে। তার সনত্মানরা এখন সপরিবারে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। এ দেশের জনগণ তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ ফেরত চায়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশকে অকার্যকর করার জন্য জঘন্য কাজ করেছে প্রশাসনকে দলীয়করণ ও মেধাশূন্যকরণ প্রক্রিয়া হাতে নিয়ে। ২০০১-এ ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অকালে বিনা কারণে চাকরিচু্যত করা হয়েছে এবং নিজেদের পছন্দ মতো কর্মকর্তাদের উপ-সচিব হতে দুই-আড়াই বছরের মধ্যে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনের চেন অব কমান্ড নষ্ট করা হয়েছে, মেধাশূন্য করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা আদালতের রায়ে সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু এদেরকে উপযুক্ত পদে আজও পদায়ন করা হয়নি। এদের অনতিবিলম্বে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন একান্ত অপরিহার্য। মন্ত্রী পরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর সচিব, সংস্থাপন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে এদের পদায়ন অতিব জরম্নরী। সরকার আওয়ামী লীগের আর ক্ষমতার উচ্চপদে বিএনপি ভাবদর্শীরা ঘাপটি মেরে থাকবে_ এ হতে পারে না। তাহলে নিজের সর্বনাশ নিজেই করা হবে। বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যে মনে হয় তাদের লোকজন প্রশাসনের বিভিন্ন স্থানে ঘাপটি মেরে আছেন, তিনি সব খোঁজখবর রাখেন এবং কূটবুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন স্থবির, সচল নয়_এটাই কি এর কারণ? অতএব, প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো একানত্ম অপরিহার্য। নতুবা দিন বদলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। মহাজোট সরকার প্রতি পদে পদে স্যাবোটেজ হবেন। আর মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাসত্মবায়ন করতে হবে। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাসত্মবায়নের জন্য চাই নিবেদিতপ্রাণ কমিটেড আমলা। আমরা কি সেভাবে প্রশাসন সাজাতে পেরেছি? সরকারে আওয়ামী লীগ আর রাষ্ট্র পরিচালনায় উচ্চ পদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ভাবধারার আমলারা_এ হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের সকল প্রয়াস ও কর্মকাণ্ড। Let us serve the nation honestly and sincerely with patriotism and materialize the dream of the father of the nation. এ দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন ভরে উঠুক সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে, মানুষের কল্যাণে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সেস্নাগানে।

লেখক : সাবেক সচিব