মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২ জুলাই ২০১১, ১৮ আষাঢ় ১৪১৮
দেশে নামকরণের কয়েকটি ঘটনা
মুহম্মদ শফিকুর রহমান
বৃহস্পতিবারের পত্র-পত্রিকায় দেখলাম বিএনপির ছাত্র অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল আগামী ২ ও ৩ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ডেকেছে। তাদের দাবি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ছাত্রী হলের নাম খালেদা জিয়া ছাত্রী হল রাখতে হবে। অর্থাৎ সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি বেগম সুফিয়া কামালের নাম ফেলে দিয়ে তাতে খালেদা জিয়ার নাম বসাতে হবে। পরের ধনে পোদ্দারির সেই পুরনো কূটকৌশল।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলিম দলের নয়াপল্টনস্থ দলীয় কার্যালয়ে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে এই কর্মসূচী ঘোষণা করলেন। কার কৃতিতে কে নাম কিনতে চায়, এ যেন বিএনপির স্বাধীনতার ঘোষক হবার খায়েশের মতো। মনে পড়ছে একটি ঘটনা।
আমি গ্রামের ছেলে। অজপাড়াগাঁ বলতে যা বুঝায়! এ জন্য আমার কোন আফসোস নেই বরং আমার মধ্যে একধরনের তৃপ্তি বা গর্ব আছে যে হাজার বছরের আবহমান বাংলার এক গাঁয়ে আমার জন্ম যেখানে বছরে ৭ মাস চলাচলের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। সুদিনে ৩ মাইল হেঁটে ট্রেন ধরে তবেই মহকুমা শহরে (আজ যা জেলা শহর) যেতে হতো। সেই গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি।
অজপাড়াগাঁ হলে কি হবে আমাদের গ্রাম, আশপাশের গ্রাম তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ। অর্থ সম্পদে ততটা না হলেও লেখাপড়ায় আভিজাত্যে অনেক গ্রামের চেয়ে এগিয়ে। আমি যখন প্রাথমিক পাঠ শেষ করে সেকেন্ডারিতে যাই তখন আমার পর্যায়ের ৪০ জনের মতো ছাত্র আমাদের গ্রাম থেকে দেড়-দুই মাইল হেঁটে স্কুলে-মাদ্রাসায় যাচ্ছে। বর্ষায় হতো সবচেয়ে বিপদ। নৌকা ছাড়া স্কুল-মাদ্রাসায় যাবার অন্য কোন পথ ছিল না কারণ ভারি বর্ষায় সকল রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যেত। আমরা তখন হাফ প্যান্ট পরে লুঙ্গি-শার্ট-বই এক পোটলায় বেঁধে দীর্ঘ পথ পানি ভেঙ্গে পড়তে যেতাম। প্রতিদিন বিকেলে স্কুলের মাঠে খেলাধুলা করার একটা নিয়ম ছিল। সুদিনে ধান কাটার পর পরিত্যক্ত মাঠে আর সারাবছর স্কুল-মাদ্রাসা মাঠে খেলা হতো। প্রধানত ফুটবল খেলা। এছাড়াও হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্দা, ভলিবল, ডাংগুলি (যাকে আদি ক্রিকেট বলা যায়) ইত্যাদি খেলাও হতো। খেলা জমত বেশি শীতে কেননা তখন ফসল উঠে মাঠের পর মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকত বেশ কিছুদিন। শীতের এক সন্ধ্যায় আমাদের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ভলিবল খেলে বন্ধুরা মিলে আড্ডা মারছিলাম। বেশিরভাগই খেলাধুলার গল্প। আমাদের গ্রামেরই প্রাথমিক শিৰক জয়নাল আবদীন মাস্টার এসে বললেন, এভাবে সময় নষ্ট না করে বাড়ি গিয়ে লেখাপড়া করলে হয় না। তখন সন্ধ্যে উতরে রাত শীতের কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। তাঁর কথায় ভ্যানিটিতে লাগল, আমরা কিছুটা 'অপমানিত'ও বোধ করলাম। কেননা, আমরা যারা আড্ডা মারছিলাম তাদের বেশিরভাগই ক্লাসে খুব ভাল ছাত্র না হলেও ফেল মারা কেউ ছিলাম না, রোলও প্রথমদিকে। বললাম, কেন আমরা তো পড়ি। বললেন, কেবল ক্লাসের পড়া নয়, ক্লাসের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বই আছে, সেসব না পড়লে সত্যিকার জ্ঞান অর্জন হয় না, দেশ-বিদেশকে জানা যায় না। ভদ্রলোক সম্ভবত ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন এবং গুরু ট্রেনিং জাতীয় একটা প্রশিৰণ নিয়ে প্রাথমিক শিৰক হয়েছিলেন। তখনকার দিনে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পাস করে গুরু ট্রেনিং করা যেত এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়া যেত। আজ তিনি নেই। এই ভদ্রলোক আমার জীবনের অনেকখানি জড়িয়ে আছেন আজও আমার মতো আরও অনেকের। যদিও এটা ঠিক যে গ্রামের মোটামুটি সমৃদ্ধ শিৰিত পরিবারে আমার জন্ম। কিন্তু জয়নাল মাস্টার সেই যে বললেন, 'পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পড়া আছে, তা না পড়লে জ্ঞান সমৃদ্ধ হয় না, দেশ-বিদেশকেও জানা যায় না' এই কথাটি আমার মতো অনেকেরই জীবন পাল্টে দিয়েছিল। তাঁর এই কথা শুনে বাড়ি ফিরে বিভিন্ন ঘর তলস্নাশি করে কিছু বই পেলাম যেমন_ 'আনোয়ারা', 'মনোয়ারা', 'সালেহা', 'কি পাইনি', 'তাওয়ারিখে মুহম্মদী' ইত্যাদি। পড়তে শুরম্ন করলাম। রাত জেগে জেগে। একটি পড়া শেষ করে পরেরটিতে যাচ্ছি আর পড়ার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর তো পড়ার মতো নতুন কিছু নেই। জয়নাল মাস্টারকে ব্যাপারটা বললে তিনি আমাদের ক্লাব গঠনের পরামর্শ দেন। আমরা তখন আমাদের গ্রামের নাম যোগ করে 'বালিখুবা ইয়ুথ ক্লাব' গঠন করি। এই ক্লাবের মাধ্যমে আমরা বই সংগ্রহ করতে থাকি। সাথে সাথে আমাদের খেলাধুলাও চলতে থাকে এবং এর পাশাপাশি সিনেমা দেখায়ও মজা পাই। আমরা সিনেমা দেখতে শহরে যাই এবং একটা-দুইটা বই কিনি। যত পরের ক্লাসে উঠছি আমাদের দৃষ্টিও প্রসারিত হতে থাকে। আমরা আনোয়ারা, মনোয়ারার বাইরে 'শ্রীকানত্ম' কিংবা 'দসু্য মোহন' পড়তে পড়তে এক সময় শরৎচন্দ্র ও তৎকালীন এশিয়া ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে প্রাপ্ত 'তাজকিরাতুল আউলিয়া', 'মা' এবং রাশিয়ান উন্নত মানের অনুবাদ সাহিত্য পড়ার সুযোগ পাই। কি দুর্দান্ত সব রাশিয়ান সাহিত্য। বিশেষ ছবিসহ শিশু সাহিত্য_যেমন উন্নতমানের কাগজ ও ছাপা। আজ ভাবাও যায় না। আমাদের দৃষ্টিশক্তিও প্রসারিত হতে থাকে। এক সময় আমার মাথায় ঢুকল আমরা কেন এতদূর হেঁটে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় যাই, আমাদের গ্রামেই তো হাইস্কুল গড়তে পারি। আমার মাথার এই চিনত্মাটা ক্লাবের সবাইকে জানালে তারা দারম্নণ আগ্রহ দেখাল। আমাদের গ্রামে বিগত শতাব্দীর চলিস্নশের দশকের শেষের দিকে একটি মাইনর স্কুল (ক্লাস সিক্স পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু পরিচালনার দুর্বলতায় তা অল্পদিনেই বন্ধ হয়ে যায়। আমরা ঠিক করলাম আমাদের ক্লাবের উদ্যোগে নতুন করে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করব।
যে কথা সেই কাজ। পরপর কয়েকটি মিটিং করলাম। এলাকার মুরবি্বদের আমন্ত্রণ জানালাম, তারাও আগ্রহের সাথে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। মনে পড়ে আমাদের প্রথম মিটিং হয় বালিখুবা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ১৯৬৫ সালে। তাতে সভাপতিত্ব করেন আমাদের গ্রামেরই ইসহাক তালুকদার (মরহুম) এবং দ্বিতীয়টি আমাদের বাড়ির খলিলুর রহমান। দু'জনই সরকারী চাকরি করতেন। প্রথমজন এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে এলএলবি পাস করে আইন পেশা গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়জন সম্ভবত কৃষি বিভাগে। আর প্রথম মিটিংয়ে যে গরিব মানুষটি ৪ টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন তিনি মুজিবুল হক খাঁ। ছেলেবেলায় অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারেননি। ভাগ্যান্বেষণে ঢাকায় এসে তৎকালীন ইকবাল হলের ক্যান্টিনে টেবিল বয়ের চাকরি করেছে। একটু বয়স হলে মনে হয় চাকরিটি তার পছন্দ হচ্ছিল না। মর্যাদার প্রশ্নে হয়ত। তাই ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে আসে এবং পরের জমিতে মজুরি খেটে বা ছোটখাটো ফুটপাথের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। আর নিজের নামের প্রথমে মুজিবুল হক থাকাতে খুব গর্ব করত। সবচেয়ে বড় কথা সে ছিল আমাদের মধ্যে সবার সিনিয়র, তার কাছ থেকে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের গল্প শুনতাম। সে ছিল আমাদের খেলাধুলা-সিনেমা দেখার সাথীও। মাত্র ৪টি টাকা। আমার কাছে আজও মনে হয় সেই জয়নাল মাস্টার, মুজিবুল হক, ইসহাক তালুকদার, খলিলুর রহমান এবং আমাদের হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্বে এলাকার যেসব মুরবি্ব আমাদের পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন সেই আবদুল জলিল মিয়াজি (বড় মিয়া), আবদুল কাদির মিয়াজি, হবু মিয়াজি, আফজাল মাস্টার, অধ্যৰ প্রফেসর এ ডবিস্নউ মুহম্মদ তোয়াহা, মওলানা আবদুল হক, শাবানীর বাপ, ছোট ভূঞা, তাজু ভূঞা_ এঁরা কেউ আজ আর বেঁচে নেই। এঁদের মতো মানুষ যদি আজও পাড়াগাঁয় বেঁচে থাকত। হেম দত্ত কলকাতায় আছেন। ডা. যজ্ঞেশ্বর দে কিংবা বসনত্ম ডাক্তার কলকাতায় চলে যান, বেঁচে আছেন কিনা জানি না।
সে যাক। আমাদের গ্রামের নামের সাথে মিলিয়ে 'বালিথুবা হাইস্কুল' নাম দিয়ে আমাদের স্কুল যাত্রা শুরম্ন করল। আমি হলাম অবৈতনিক প্রধান শিৰক। তখন আমি চাঁদপুর কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি। 'দুলাল' নামে চৌধুরী বাড়ির একটি হিন্দু ছেলেকে মাসিক ২০ টাকা বেতনে শিৰক নিয়োগ দেই। ১৯৬৬ সালে প্রথম বছর ক্লাস সিঙ্, এভাবে প্রতিবছর এক ক্লাস করে খুলি আর আরও একজন শিৰক নিয়োগ দেই। এভাবে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ, ২৬ মার্চ বেলা দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে স্কুল মাঠে অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মিটিংয়ে আমি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলি। আমরা সিদ্ধানত্ম নেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব এবং যতদিন মুক্তিযুদ্ধ চলবে স্কুল বন্ধ থাকবে, দেশ স্বাধীন করে অর্থাৎ হানাদার পাকি সেনাদের পরাভূত করে মুক্ত স্বাধীন দেশে আবার স্কুল শুরম্ন করব। তা-ই করেছি। যুদ্ধে চলে গেলাম। ৯ মাস পর মুক্ত পরিবেশে আবার স্কুল শুরম্ন করলাম। ক্লাস নাইন-টেনের মঞ্জুরির জন্য ১০০ হাত লম্বা ২০ হাত চওড়া ঘর বানাতে হবে, স্কুলের জন্য কমপৰে এক একর জমি ওয়াকফ করতে হবে। অনত্মত ৫০ হাজার টাকা লাগবে। ১৯৬৬ থেকে '৭১ এই দীর্ঘ সময় এলাকার মানুষ চাঁদা দিয়ে স্কুল চালিয়েছে। এত টাকা দেয়ার ৰমতা কারও নেই। এগিয়ে এলেন হামিদ মিয়া, ইউপি মেম্বার এবং ঢাকার সদরঘাটের ব্যবসায়ী। মুক্তিযুুদ্ধের সময় নিরাপত্তার খাতিরে আমাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ছিলেন। তিনি এককালীন ৪৫ হাজার টাকা দিলেন। মঞ্জুরিতে সহায়তা করলেন অধ্যৰ তোয়াহা মিয়া, মওলানা আবদুল হক, আফজাল মাস্টার ও কুমিলস্না আওয়ামী লীগের নেতা ও ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক খোরশেদ আলম ও পাশের গ্রামের স্কুল ইন্সপেক্টর খলিলুর রহমান। তাঁদের প্রথম ৪ জন বেঁচে নেই, ৫ম জন আছেন কিনা জানি না।
স্কুল হয়ে গেল। একবারে আর্টস, কমার্স, সায়েন্স মঞ্জুরি পেলাম। তার আগে আমরা সবাই বসলাম। কেননা হামিদ মিয়া ৪৫ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে মনে মনে চাচ্ছিলেন তার নামে স্কুল দেই। আমি এবং আমার বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার জয়নাল আবেদীন বস্তুত তার নামে স্কুল দেয়ার কথা বলে টাকাটা গ্রহণ করি। পরে সভায় এ কথা জানিয়ে তার নামে, অর্থাৎ 'বালিথুবা আঃ হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করি। এবং আমিও আমার এমএ শেষ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি। আজ মনে পড়ে আমাদের 'বালিথুবা ইয়ুথ ক্লাবের' সদস্য আমার বন্ধু মাস্টার জয়নাল চেয়ারম্যান, কালু রাড়ি, ফজলু, হুমায়ুন, কাদির উকিল, সাত্তার পাটোয়ারি, সাত্তার সিদ্দিকী, আমির হোসেন, আবুল ভূঞা প্রমুখের কথা। তারা কেউ বেঁচে নেই। লতিফ, মুহম্মদ উলস্নাহ, রেপু, আনু, আবিদ জীবিকান্বেষণে কে কোথায় ছিটকে পড়েছি, সবার সাথে দেখাও হয় না। সনত্মোষ, রণজিৎ, জগদীশ, বাদল, শম্ভু সেই ভারতে চলে গেছে, কে কিভাবে আছে জানি না। প্রিয়লাল কলকাতা হাইকোর্টের এ্যাডভোকেট, মাঝেমধ্যে কলকাতায় যাই, সেও ঢাকায় আসে, আমাদের মধ্যে এখনও যোগাযোগ আছে। কলকাতায় গেলে বয়সের ভারে নু্যব্জ হেমদত্ত ও ছেলেবেলার বন্ধু দুলালের সাথেও দেখা হয়। তখন নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে।
আমাদের 'বালিথুবা আবদুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠার পেছনে উলেস্নখিত মানুষগুলোর অবদান স্বীকার করতেই হবে। গ্রামের সাধারণ জনগণও যার অর্থ সাহায্য দেয়ার সামর্থ্য নেই সে গতর খেটে, যার সামর্থ্য আছে সে একটা গাছ দিয়ে অবদান রেখেছে। এমনকি গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি স্কুল ঘর করা, মাঠ ভরাট করার জন্য রাতে মাথায় করে মাটি বহন ও কাটায় অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ ঈড়সসঁহরঃু ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ বলতে যা বোঝায় আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠায় তা-ই কাজ করেছে। সেই ষাটের দশকের মধ্যভাগে তখন মেয়েদের কেউ হাইস্কুলে পড়াতে চাইত না। প্রাথমিকের গ-ি পেরোবার আগেই বিয়ে দিয়ে দিত। আমি আমার ছোট বোনকে প্রথম ক্লাস সিঙ্ েভর্তি করাই এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ (সড়ঃরাধঃব) করি এই বলে যে, "মেয়েটিকে হাইস্কুল দিলে সে এসএসসি পাস করবে, অনত্মত একটা বিএ পাস জামাই পাবেন, মেয়েটি সুখে থাকবে।" আমার এই বক্তব্যে পুরম্নষের চেয়ে অনত্মপুরবাসিনী মায়েরা বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। আজ স্কুলের সহস্রাধিক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের বেশিই মেয়ে। স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না তাই আমি (১৯৯৬-২০০১) আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন শিৰামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক সাহেবকে বলে দুই বছরে সাড়ে ১৭ লাখ, সাড়ে ১৭ লাখ_মোট ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করাই এবং ২০০০-২০০১ সালেই নিচতলা (মৎড়ঁহফ ভষড়ড়ৎ)-এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং দোতলার কাজের টেন্ডার হয়। প্রথম তলার কাজ শুরম্নর সময় স্কুল কর্তৃপৰ আমাকে দিয়ে প্রথম ইটটি গাঁথা অর্থাৎ বিসমিলস্নাহর কাজটি করান এবং আমার নামটি ওয়ালে সেঁটে দেন স্টোনের মাধ্যমে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতা হসত্মানত্মর করে এবং ২০০১-এর নির্বাচনে ভুয়া ভোটার ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াত ৰমতায় বসে। আমার এলাকায়ও বিএনপি পাস করে, আমি হেরে যাই। স্কুলের টেন্ডার হওয়া দোতলার কাজ শুরম্ন হবে, এমপি সাহেব আসবেন, রাসত্মার দু'পাশে ছেলেমেয়েদের দাঁড়াতে হবে, ফুল ছিটাতে হবে, শহর থেকে ঝুড়ি-ঝুড়ি জিলাপি আনা হয়েছে, দোতলায় তার নাম খচিত ভিত্তিপ্রসত্মর স্থাপনের জন্য স্টোন পেস্নট আনা হয়েছে, কিন্তু নির্ধারিত দিনে তিনি আসতে পারেননি। আগের দিন থানা সদরে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ নিয়ে তাঁর দলীয় লোকদের দ্বারা কালো পতাকা প্রদর্শন দেখে বাড়ি ফিরে গভীর রাতে স্ট্রোক করেন এবং ওই রাতেই তাঁকে ঢাকায় আনা হয়, পরে সিঙ্গাপুর চিকিৎসা করানো হয়, কিন্তু তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। বিগত ২০০৮ নির্বাচনে তাকে আর নমিনেশনও দেয়া হয়নি। তারপরও তার নাম খচিত স্টোন পেস্নটটি ঠিকই দোতলায় লাগানো হয় এই বলে যে "দোতলার ভিত্তিপ্রসত্মর স্থাপন করেন জনাব .... এমপি।" ভাগ্যিস, হয়ত একই এলাকায় বাড়ি বলেই নাকি জানি না, নিচতলায় আমার নামখচিত পেস্নটটি তুলে ফেলে দেয়নি। যেমন তারা ফেলে দিয়েছিলেন সে সময় কাজ শুরম্ন হওয়া ৬টি রাসত্মার নামফলক।
প্রিয় পাঠক পাড়াগাঁয়ের একটি স্কুলের আত্মকাহিনী বলতে গিয়ে এবং বিল্ডিংয়ের ভিত্তিপ্রসত্মর স্থাপনের কাহিনী লিখতে গিয়ে হয়ত অনেকেরই ধৈর্যহানি ঘটতে পারে সেজন্য আমি দুঃখিত। তবুও সংৰেপে আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। '৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমি অনেক শিৰা প্রতিষ্ঠানের পাকা ভবন নির্মাণ বা এমপিওভুক্ত করাই। তার মধ্যে একটি হলো আমাদের এলাকার এক শিৰানুরাগী চান্দ্রা ইমাম আলী হাইস্কুলের দীর্ঘ সময়ের সম্মানিত প্রধান শিৰক আবদুল হাকিম মাস্টারের নামে তাঁর গ্রাম মদনেরগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত 'আবদুল হাকিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।' বিগত আওয়ামী সরকারের সময় আমি সাড়ে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করিয়ে পাকা ভবন নির্মাণ করে দেই। ক'দিন আগে স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি স্কুলের একটি গেট নির্মাণ করা হয়েছে এবং তাতে লেখা আছে "সৌজন্যে মোতাহার হোসেন পাটোয়ারী।" ভদ্রলোক বিএনপি করেন শুনেছি। অবাক হয়ে উপস্থিত এলাকাবাসীকে প্রশ্ন করলাম, আমি বিল্ডিং করে দিলাম, নাম দিলাম না, অথচ সামান্য টাকায় গেট করে নাম বসিয়ে দেয়া কি ঠিক হলো?
প্রিয় পাঠক এই দুই উদাহরণ আমি এজন্য দিলাম যে, ছাত্রদল বেগম খালেদা জিয়ার নামে নির্মাণাধীন 'কবি বেগম সুফিয়া কামাল' হলের নাম রাখার দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছে, সেই প্রেৰিতে। কেননা, নির্মাণাধীন কবি বেগম সুফিয়া কামাল হল প্রতিষ্ঠার পেছনেও একটা ইতিহাস আছে, কোন মহান ব্যক্তির উদ্যোগ (রহরঃরধঃরাব) যেমন আছে তেমনি তার সাথের কিছু মানুষের অক্লানত্ম পরিশ্রম আছে। এই মহান ব্যক্তিটি হলেন মহিয়সী শেখ হাসিনা (তৎকালীন ও তখনকার প্রধানমন্ত্রী) এবং তৎকালীন ভিসি ও বর্তমান ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. একে আজাদ চৌধুরী ও তখনকার শিৰক সমিতির নেতা বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রমুখ। প্রফেসর আজাদ চৌধুরীই প্রথম ভিসি যার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেশন জ্যামমুক্ত হয়, কয়েকটি নতুন ভবন (ছাত্র ও শিৰক) নির্মিত হয়, গবেষণার পরিসর বৃদ্ধি পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিনে ২টি নতুন নির্মিত হল উদ্বোধন করেন। হল ২টি হলো বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল ও একুশে হল। এই হল দু'টি উদ্বোধনের পর তিনি বদরম্নন্নেসা কলেজে যান, যে কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কলেজ কর্তৃপৰ পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ কাঠা জায়গা কলেজকে দেয়ার দাবি করলে তিনি ভিসি আজাদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভিসি আজাদ চৌধুরী এই সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে আরও ছাত্র হল নির্মাণ প্রয়োজন বলে শেখ হাসিনাকে জানান। ওইদিনই রাতে তৎকালীন ইটিভি রোকেয়া হলের অভ্যনত্মরীণ অবস্থা দেখাতে গিয়ে একটি কামরায় ৩০ জনেরও মতো ছাত্রীর বসবাসের চিত্র তুলে ধরে। এ ঘটনা শেখ হাসিনার মনকে বিশেষভাবে নাড়া দেয় এবং পরদিনই তিনি তাঁর বন্ধু রোকেয়া হলের প্রভোস্ট প্রফেসর শামীমা চৌধুরীকে টেলিফোন করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন এবং ভিসি আজাদ চৌধুরীকে বলেন আরও হল করতে। তখন আজাদ চৌধুরী বর্তমান নির্মাণাধীন সুফিয়া কামাল হলের জায়গাটি চান। এটি ছিল রেলওয়ের সম্পত্তি। শেখ হাসিনা তাদের সাথে কথা বলে জায়গাটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে দেন এবং তিনি একটি টুইন-টাওয়ার ছাত্রী হল (১০০০ শয্যা) নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং তখনই এই হলের নামকরণ 'কবি বেগম সুফিয়া কামালের নামে' হবে বলে প্রসত্মাব দেন। সে অনুযায়ী হল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০১-এ বিএনপি-জামায়াত ভুয়া ভোট ব্যবহার করে ৰমতায় এলেও সে সময় যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা রেলের জমি ফেরত নেননি। কাজও একেবারে বন্ধ হয়নি। ধীরলয়ে চলতে থাকে। হঠাৎ করে ২০০৫-এ তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰ (বিএনপি-জামায়াতপন্থী) সিনেট ডেকে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণের প্রসত্মাব করে। কয়েকদিন আগে আবার সিনেট অধিবেশনে তা সংশোধন করে সুফিয়া কামালের নাম পুনর্সথাপন করা হয়। সুফিয়া কামাল ১৯৯০ সালে ইনত্মেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)।
কাজেই ছাত্রদল আজ যে দাবিতে আন্দোলন করছে তা কেবল অযৌক্তিক, অসৌজন্যমূলকই নয়, বরং বলা যায় বেয়াদবিও। ছাত্রদলের প্রতি আহ্বান, বেগম রোকেয়ার পর সুফিয়া কামাল, বারে বারে জন্মায় না, তাঁর প্রতি সম্মান দেখালে আমরাই সম্মানিত হবো। তাছাড়া অন্যের করা স্থাপনায় নাম না বসিয়ে একটা হল বানিয়ে নামটি বসিয়ে দিলে হতো। অবশ্য সে সুযোগও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের মধ্যে একটিও কোন জীবিত ব্যক্তির নামে হয়নি। এটা ট্র্যাডিশন। সেই সুযোগও হাতছাড়া হয়ে গেল বিধিসম্মতভাবেই। সম্প্রতি সিনেটও সিদ্ধানত্ম নিয়েছে কোন জীবিত ব্যক্তির নামে কোন হল হবে না।
ঢাকা, ১ জুলাই ২০১১
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক