মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১, ৬ ফাল্গুন ১৪১৭
জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
হুসনা বানু খানম
আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি পথিকৃৎ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হুসনা বানু খানমের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী। ত্রিশ ও চলিস্নশ দশকে বাঙালী মুসলমান ও বাঙালী মুসলিম নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম অংশীদার হুসনা বানু খানম ১৯২২ সালের এই দিনে পাবনার সংস্কৃতিবান, ঐতিহ্যবাহী লোহানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসেন খান লোহানী ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক। মা ফাতেমা লোহানী ছিলেন শিক্ষিকা। বড় ভাই ফতেহ লোহানী এবং ফজলে লোহানী ছিলেন সংস্কৃতির উজ্জ্বল নৰত্র।
বেগম রোকেয়া নারী মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্নকে হুসনা বানু খানমও মনেপ্রাণে লালন করেছেন। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেই দু্যতি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। লেখাপড়ার প্রতি যেমনি আগ্রহ ছিল তেমনি ছিলেন মেধাবীও। ক্লাসে সব সময়ই ফার্স্ট গার্ল ছিলেন তিনি। মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ ছিল বলে বিয়ে ও সংসার জীবন লেখাপড়ার মাঝখানে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। হুসনা বানু খানম ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এমএ পাস করে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা চলে যান। সেখান থেকে আর্ট এ্যান্ড ক্রাফটস-এর ওপর এমএস করে ঢাকায় এসে অধ্যাপনা শুরম্ন করেন ঢাকা হোম ইকোনমিঙ্ কলেজে।
অত্যনত্ম আধুনিকমনস্ক হুসনা বানু খানম অধ্যাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি গান গাইতেন, ছবি আঁকতেন, লিখতেন, ইকেবানা করতেন এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন কিছুটা সময়। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের ছাড়াও বাবার বন্ধুরা তাঁকে সঙ্গীত চর্চায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। কবি গোলাম মোস্তফার কাছ থেকে তিনি একটি হারমোনিয়াম উপহার পেয়েছিলেন। নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করতেন। কবি নজরুল যখন বাকরম্নদ্ধ তখন কবির বাসায় গিয়ে তাকে গান গেয়ে শোনাতেন হুসনা বানু খানম। সঙ্গীতেও তিনি এতটাই মেধাবী ছিলেন যে, অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তিনি অডিশন ছাড়াই গান গাইবার সুযোগ পেয়েছিলেন। কলকাতায় থাকাকালীন রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে কলকাতা বেতারের অন্যতম অগ্রণী মুসলমান শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে যখন স্থায়ীভাবে বসবাস শুরম্ন করলেন তখনও তিনি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। বেতারে সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। 'আকাশ আর মাটি' এবং 'আসিয়া' ছবিতে পেস্নব্যাকও করেছিলেন তিনি।
হুসনা বানু খানম ছিলেন প্রথম মুসলমান চলচ্চিত্র নারী সাংবাদিক। ১৯৬৭ সালে গঠিত পাকিসত্মান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র সম্পর্কিত তার বিভিন্ন লেখা নানা কাগজে প্রকাশ হতো। বেগম পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। বেগম পত্রিকার চলচ্চিত্র বিভাগটি তার দায়িত্বে ছিল। কেবল চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখাই নয়। সাহিত্য রচনার ৰেত্রেও তিনি বেশ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
হুসনা বানু খানম যখন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্রী তখন তিনি বেগম রোকেয়ার সানি্নধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। জীবনে চলার পথের চালিকাশক্তি তিনি বেগম রোকেয়ার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। বেগম রোকেয়ার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন নারীদের আলোর পথ দেখিয়েছেন। তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী নারী। নারীর প্রতি অবহেলা, নারী নিগ্রহ_ এ বিষয়গুলো তাকে খুবই ব্যথিত করেছে। হুসনা বানু খানমের কাজের দৰতা, দূরদৃষ্টি তাঁর চিন্তা-চেতনা নতুন প্রজন্মকে আলোকবর্তিকার মতোই আধুনিক মানসিকতার পথ তৈরি করে এগিয়ে নিয়ে যাবে। হুসনা বানু খানমকে জীবিত অবস্থায় আমরা যোগ্য মর্যাদা দিতে পারিনি। আমাদের সঙ্কীর্ণতা, দৈন্যের কারণে তিনি ছিলেন অনেকটা উপেৰিত। ২০০৬ সালের ৩০ এপ্রিল আলোর পথের যাত্রী হুসনা বানু খানম পৃথিবী থেকে চলে গেছেন।
শামীম ফেরদৌস