মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
সূর্য উদয়ের দেশ জাপানে শেখ হাসিনার পাঁচ দিনের সফর
মামুন-অর-রশিদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে কুয়াকাটায় দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর নির্মাণের ঘোষণা দেন। তিনি ব্যবসায়ীদের গ্রামীণ জনপদে দরিদ্র বিমোচন এবং সাধারণ মানুষের হাতে কাজ তুলে দিতে প্রান্তিক জনপদে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তনের নানারকম ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে দেশকে নিরাপদ রাখতে তাঁর সরকার দেশের নিজস্ব অর্থায়নে ১শ' ৩৫ টি এ্যাকশন প্লন গ্রহণের কথা জানান।
সাংবাদিকদের সঙ্গে

সংক্ষিপ্ত বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানে তাঁর সফরসঙ্গী বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেছেন_ দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদের জায়গা হবে না। দুর্নীতি রোধ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে। সরকার তাদের সহযোগিতা করবে। অতীতে সামরিক শাসক ৰমতায় এসে দল গ্ঠন করে কিছু লোককে রাষ্ট্রীয় সুবিধা অনৈতিকভাবে দিতে গিয়েই দুর্নীতির আগ্রাসন সৃষ্টি করেছে। বিগত জোট আমলে দুর্নীতি মহামারী আকার ধারণ করেছিল। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমে জনগণের জন্য সকল তথ্য সরবরাহ করে সরকারী কর্মকা-ে স্বচ্ছতা আনতে চাই। এতে দুর্নীতি কমছে। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সংৰিপ্ত বৈঠকে তাঁর সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা ২০২১ সাল নাগাদ 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'
গড়ে তোলার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উপর বিশেষ জোর দিচ্ছি। তিনি বলেন, বিদু্যত সমস্যা সমাধানের ব্যাপারেও আমরা বেশ কিছু জরম্নরী পদৰেপ নিয়েছি। আশা করি, এসব কার্যক্রম বাসত্মবায়ন হলে বিদু্যত সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। হিরোশিমার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আর নয় কোন হিরোশিমা কিংবা ২১ আগস্ট। বাংলাদেশকে আমরা শানত্মির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। জাপান সরকারের আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান আমাকে 'বোন' সম্বোধন করে বাংলাদেশে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদানের ব্যাপারে নিজে থেকেই তার (জাপানী প্রধানমন্ত্রী) অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
জনকণ্ঠের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে দুর্নীতি সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদের উত্থান ও ত্বরিত বিকাশ ছাড়া অন্য সবৰেত্রে তারা (বিএনপি-জামায়াত জোট সরবকার) দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। আমাদের প্রচেষ্টায় দেশ দুর্নীতি সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদের বদনামমুক্ত হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতার কথা তুলে ধরে বলেন, সরকার দেশ চালাবে আর ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে_ সেটিই স্বাভাবিক। সরকারের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আমরা ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছি। এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে টেন্ডার ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। ফলে টেন্ডার দখলের কোন সুযোগ দেশে নেই। তিনি বলেন, দেশে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে তথ্য কেন্দ্র এবং ৫ হাজার পোস্ট অফিসে ই-পোস্ট সেন্টার চালু করা হয়েছে। যার মাধ্যমে যে কেউ দেশে-বিদেশে এক মুহূর্তে বাংলাদেশের সম্পর্কে বিসত্মারিত তথ্যচিত্র পেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ল্যাপটপ এ্যাসেম্বল করার কাজ করছি, যাতে দেশের ছেলেমেয়েদের হাতে মাত্র ১৫/২০ হাজার টাকায় ল্যাপটপ তুলে দিতে পারি। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরির কাজে হাত দিয়েছি। তার সরকারের গত দু'বছরে উন্নয়ন বাজেটের ৯২ ভাগ কাজ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি সর্বকালের রেকর্ড।

হিরোশিমার পথে শেখ হাসিনা
হিরোশিমার পিস মেমোরিয়ালে ধ্বংস্তপের মধ্যে বেঁচে থাকা দুই নারীর করুণ কাহিনী হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি করে। ৬৫ বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে ১৪ বছর বয়সের প্রত্যৰদর্শী আজকের ৭৯ বছর বয়সী ইউসিকো কাজিমতে এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২০০৪-এর ২১ আগস্ট_এই দিন আগস্টে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা কেউই নিজেদের সম্বরণ করতে পারেননি। নরহত্যার বিভৎস উলস্নাসে মেতে ওঠার সেই করম্নণ কাহিনী আগস্টের এই ট্র্যাজেডি যেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং হিরোশিমার নাগরিক ইউসিকো কাজিমাতোর বর্ণনায়, শব্দে-বাক্যে বিশ্বমানবতার শানত্মি-সম্প্রীতি রৰার আকুতিই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে বার বার।
শেখ হাসিনা পিস মেমোরিয়াল ঘুরে দেখার সময় যেন হৃদয়াবেগ দিয়ে বলেছেন, আর নয় বর্বরতা, আর নয় হানাহানি, হত্যাযজ্ঞ। ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি বলেছেন, 'একুশে আগস্টে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে এমনভাবেই অনেক মানুষের ছিন্ন-ভিন্ন দেহ পড়েছিল। সেই বিভীষিকা যেন হিরোশিমার মতোই আরেক নারকীয় বিভৎস দৃশ্য যেখান থেকে অলৌকিকভাবে আমার বেঁচে থাকা।' বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের পাহাড়ে ভিয়েতনামের রক্তগঙ্গা প্রবাহ বন্ধ করতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শানত্মি চুক্তি করেন।
দু'নারীর একজন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগানত্মক ট্র্যাজেডিতে জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকা- থেকে বেঁচে যাওয়া এবং ২১ আগস্টের উপযর্ুপরি গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আজীবন সংগ্রামী নেতৃত্ব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আরেকজন আণবিক বোমার অমানবিক আঘাতে ঝলসে যাওয়া হিরোশিমা নগরীর অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যাওয়া গুটিকয়েক ভাগ্যবান মানুষের একজন ইউসিকো কাজিমাতো। ইউসিকো কাজিমাতোর কথা শুনে শেখ হাসিনা বার বার ফিরে গেছেন ৭৫-এর ১৫ আগস্ট ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের স্মৃতির রোমন্থনে। স্মৃতির ঝাঁপিতে জমে থাকা জমকালো মেঘের ভেলা তাঁকে যেন মৃতু্য মোহনায় ভাসিয়েছে বার বার। তবুও লাখো-কোটি জনতার শক্তি তাকে মুহূর্তেই সম্বিত ফিরিয়ে দিয়েছে_ বাংলার দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
হিরোশিমায় পিস মেমোরিয়াল পরিদর্শনকালে বোমার আঘাতে মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ, পরিধেয় বস্ত্র, দালান কোঠার পাথরগুলো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়া, মানুষের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথার খুলি, লোহার মেশিনারিজ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া, পারমাণবিক বোমার জীবাণুতে মানুষের দেহে-জিহ্বায় ক্যান্সার এবং অনবরত মুখ দিয়ে রক্ত বেরোনোর দৃশ্য, ঘাস-ফড়িং আর প্রজাপতির বংশ হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারাক্রানত্ম হয়েছেন। স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রতিমুহূর্তে ষড়যন্ত্রকারীদের ঘৃণ্য পরিকল্পনায় তাঁর জীবনহরণ শঙ্কায় নিজের ভিতরে অনুৰণ বেদনা আর রক্তৰরণের যন্ত্রণা থেকেই তিনি বাংলাদেশকে শানত্মির দেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে আগামীর পৃথিবীকে শানত্মির স্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে নিজের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ সময় হিরোশিমার পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের প্রত্যৰদর্শী ইউসিকো কাজিমাতো বাংলাদেশের আগস্ট ট্র্যাজেডির কথা শুনেও আবেগাপস্নুত হয়েছেন। হয়েছেন অশ্রম্নসিক্ত। পিস মেমোরিয়াল পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ জাপান ফ্রেন্ডশিপ সোসাই্িট এক আনন্দঘন পরিবেশে শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়। এই সংবর্ধনার আয়োজক অধ্যাপক নারা জাতির জনককে ১৯৭৩ সালে জাপান ভ্রমণকালে সানফ্লাওয়ার নামক তরীতে ঘুরিয়ে ছিলেন। এবার সানফ্লাওয়ার নামক অডিটরিয়ামে শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা ও মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান। এটি হিরোশিমায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সফর।

জাপান সরকারের কাছে বাংলাদেশের মৌলিক প্রত্যাশা
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, পদ্মা সেতু, পাতাল রেল, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিদু্যত উৎপাদন, মহাসড়ক, পাতাল রেল ও রেলপথের সমপ্রসারণ এবং শহর-বন্দরে গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ আরও অধিক হারে জাপানী অর্থনৈতিক অনুদান প্রত্যাশা করছে। প্রসঙ্গক্রমে শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্যবিমোচন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো আর্থ-সামাজিক খাতে জাপানী সহযোগিতা ইতোমধ্যেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরম্ন করেছে। ঢাকা শহরে 'দ্রুত গণপরিবহন' চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ পরিচালনার জন্য জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, যদি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফল ইতিবাচক হয়, তাহলে ২০১৩ সালের মধ্যেই আমরা প্রকল্পটি শেষ করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থার্টিফার্স্ট ইয়েন লোন প্যাকেজ (৩১ংঃ ণবহ খড়ধহ চধপশধমব) ছাড়ের জন্য জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি থার্টি টু ইয়েন লোন প্যাকেজ (৩২হফ ণবহ খড়ধহ চধপশধমব) দ্রম্নত ছাড়ের অনুরোধ করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে দ্রম্নত গণপরিবহন এবং জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ শিল্প করিডর স্থাপন আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ দিনের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন জাপানী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। জাপান সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, জাপান আমাদের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। দারিদ্র্যবিমোচন, মানবসম্পদ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদু্যত এবং জ্বালানি, নদী খনন, দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা, খাদ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জন এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপনে বর্তমানে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা সমপ্র্রসারিত হয়েছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে জাপান এবং বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্রম্নত সমপ্রসারিত হয়েছে।

দু' দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক-সেমিনার
২৯ নবেম্বর রবিবার বেলা বারোটার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হোটেল কাইকানে বাংলাদেশ-জাপান কমিটি ফর কমার্শিয়াল এ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (জেবিসিসিইসি) ফোরামে দু' দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সভায় ভাষণ দেন। এখানে বাংলাদেশের এফবিসিসিআই'র সভাপতি একে আজাদের নেতৃত্বে সাবেক এমপি আখতারুনজ্জামান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ফিরোজ আলম, জাপানের ব্যবসায়ী নেতা টোসিহিতোসহ বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেলিগেট সদস্যদের অনেকে এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তিনি জাপানী ব্যবসায়ীদের আহবান জানান। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মাত্রা পেরিয়ে যখন বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়েছে-ট্রাক থ্রি ডিপেস্নামেসির এই সময়ে তিনি দু' দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আরও সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ পরিস্থিতি
জাপানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ১৭৮টি প্রকল্পে সরাসরি জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১.২২৫ বিলিয়ন ডলার। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ এবং জাপানের মধ্যে কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ঊপড়হড়সরপ চধৎঃহবৎংযরঢ় অমৎববসবহঃ) উপর একটি বিশেষজ্ঞ স্টাডি গ্রম্নপ গঠন করা প্রয়োজন। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পূর্তির বছর অর্থাৎ ২০১২ সালের পূর্বেই আমরা তা সম্পাদন করতে পারি। তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রসারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য বিশাল পণ্যের তালিকা থেকে সিরামিকস, সমুদ্রগামী জাহাজ এবং আইসিটি সফটওয়্যার (ওঈঞ ঝড়ভঃধিৎব)-এর মতো পণ্য আমদানির ব্যাপারে জাপানী উদ্যোক্তাগণ বিবেচনা করতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাত
বাংলাদেশের যেসব খাতে জাপান বিনিয়োগ করতে পারে তার তথ্যচিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দ্রুত বর্ধনশীল খাত যেমন বিদ্যুত উৎপাদন, তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন, কম্পোজিট টেঙ্টাইল, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য আমি জাপানী উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ (চৎরাধঃব চঁনষরপ চধৎঃহবৎংযরঢ়-চচচ) এবং বিল্ড ওফন-অপারেট-ট্রান্সফার (ইঁরষফ-ঙহি-ঙঢ়বৎধঃব-ঞৎধহংভবৎ (ইঙঙঞ)-এর আওতায় আমাদের বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের জন্য আমি জাপানী উদ্যোক্তাদের উদাত্ত আহ্বান জানান। জাপানী সহায়তায় আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে দ্রম্নত গণপরিবহন এবং জাপানী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ শিল্প করিডর স্থাপন করতে আগ্রহী। জাপান প্রবাসী বাঙালী ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য স্থান বরাদ্ধ 'জাপান ইনভেস্টমেন্ট পার্ক' গঠনের দাবি জানান।

শেখ হাসিনার ক্লাইমেট ডিপ্লোমেসি
বাংলাদেশের ক্লাইমেট ডিপেস্নামেসীর তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঈড়ড়ষ ঊধৎঃয চধৎঃহবৎংযরঢ় কর্মসূচীর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাসে জাপান সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে প্রশংসা করছে। বাংলাদেশে লবণাক্ততা দূরীকরণ, নদীভাঙ্গন ও বন নিধন রোধ এবং বিপন্ন প্রাণী ও গাছপালা রক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরও বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও ঝুঁকি প্রশমন প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হসত্মানত্মরে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা আশা করি জাপান এ প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে জাপান সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রম্নতি দেয়। খুব শীঘ্রই কোরিয়ায় জি-টুয়েন্টি সম্মেলনে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পৰে জাপান কথা বলার প্রতিশ্রম্নতি দেয় ১৯ দফা ঘোষণায়।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যাত্রা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গভীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমাদের দুই দেশের জনগণ প্রায় একই রকম মূল্যবোধ এবং আদর্শে বিশ্বাসী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ এবং আপামর জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পরই এই স্বীকৃতি দানকে আমরা অত্যনত্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। শেখ হাসিনা বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে জাপান সফর করেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হয়। ১৯৭৫ সালের ফেব্রম্নয়ারি মাসে জাপানের তৎকালীন যুবরাজ এবং যুবরানীর বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে বন্ধুত্বের নতুন মাত্রা যোগ হয়। জাপানের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে ১৯৭৬ সালে জাপান আমাদের সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রথম শুরম্ন করে। পরবতর্ীতে ১৯৯০ সালে চূড়ানত্ম সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটিও জাপান করে দেয়। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে দায়িত্ব পালনকালে জাপান রূপসা সেতু নির্মাণ করে দেয়। এজন্য আমি জাপানের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এবার আপনারা পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছেন। এজন্য তিনি জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি অত্যনত্ম আনন্দিত যে ইঙচ (ইড়ঃঃড়স ড়ভ ঃযব চুৎধসরফ) প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঔওঈঅ তার সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে। এ প্রকল্পের আওতায় দারিদ্র্যবিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অন্যান্য উদ্ভাবনীমূলক প্রকল্পে সুশীল সমাজকে যুক্ত করা হচ্ছে। এখানে উলেস্নখ্য যে, ঋণ উন্নয়ন তহবিল সংক্রানত্ম চুক্তিটি সর্বশেষ ২০০৮ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সময় এসেছে যত দ্রম্নত সম্ভব নতুন আরেকটি চুক্তি সম্পাদনের।
জাপানের টোকিও কিংবা ধ্বংসত্মূপের ভিতর থেকে উঠে দাঁড়ানো হিরোশিমা সাজানো গোছানো শহর। টোকিও শহরের ভিতরে ক্যানেল, সেখানে বোট চলা, উড়নত্ম সড়ক সবই শহরটিকে নান্দনিক দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলেছে। টোকিও গিয়ে মনে হয়েছে, সত্যিই জীবনে এক স্বপ্নকে ছুঁয়ে গেলাম। এমন যদি হতো আমাদের ঢাকা !
(সমাপ্ত)