মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী ২০১১, ২৩ পৌষ ১৪১৭
শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুই নেত্রী_ দুই নীতি
গোলাম কুদ্দুছ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরুণ অংশ সজীব ওয়াজেদ জয়কে সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং দলে বড় কোন দায়িত্ব নেয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেলেও শেখ হাসিনা থেকেছেন একেবারে নিস্পৃহ। তিনি বলেছেন_ জয়ের ইচ্ছাই প্রধান, সে চাইলে রাজনীতিতে আসবে; না চাইলে আসবে না। কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কোন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর নয়। বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ হাসিনার ছোটবোন শেখ রেহানার রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের কথা বার বার শোনা গেলেও এখনও পর্যন্ত তিনি দল বা সরকারের কোন দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়দের মধ্যে যারা দলের বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই ছাত্রজীবন থেকে সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নিজ যোগ্যতাবলেই তারা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলনে তারা নির্যাতিত হয়েছেন, বহুবার কারাবরণ করেছেন, কিন্তু অপোসের চোরাবালিতে হারিয়ে যাননি।
অপরদিকে বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে বিএনপির চেয়ারপার্সন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের দল এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুনত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেছেন। রাজনীতিতে সামান্যতম ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও তারাই হয়ে ওঠেন দল এবং সরকারে মহাশক্তিধর। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বড় বোন মরহুম খুরশিদ জাহান হককে (চকলেট আপা) জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী এবং দেশের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। বেগম জিয়ার ভাই মেজর (অব) সাইদ ইস্কান্দারকে এমপি এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি নিযুক্ত করেন। তাঁর ভাগিনা ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন দিনাজপুর জেলা বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং আরেক ভাগিনা ডিউক তাঁর একান্তম সচিব নিযুক্ত হন। জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব নির্বাচিত হলেও তিনিই যে দলের পরবর্তী নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন, তাও এখন স্পষ্ট। হাওয়া ভবন প্রতিষ্ঠা করে বিগত দিনে দল এবং সরকার পরিচালনায় তারেক রহমান মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমান কোকো সরাসরি দলের কোন দায়িত্ব গ্রহণ না করলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বেগম খালেদা জিয়ার মা মরহুমা তৈয়েবুন্নেসা মজুমদার দিনাজপুর জেলা রেড ক্রিসেন্টের সভাপতি মনোনীত হয়েছিলেন।
উপরের আলোচনা থেকে দল এবং সরকারে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আধিপত্য সৃষ্টির প্রাণানত্ম চেষ্টার পাশাপাশি বিপরীত চিত্রও ফুটে উঠেছে। এখানেই দুই নেত্রীর নৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রভাবনার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট।
৪. উনিশ শ' পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর সকল সম্পত্তির মালিকানা অর্পিত হয় জীবিত দু'কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ওপর। কিন্তু তাঁরা এ সম্পত্তি ভোগদখল না করে জাতির জনকের স্মৃতি রৰা এবং জনকল্যাণে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে গঠন করেন বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরের প্রায় ৫০ কোটি টাকার বাড়িটি বিনামূল্যে ট্রাস্টকে উইল করে দেন। এছাড়াও টুঙ্গিপাড়ার বিরাট সম্পত্তি জাতির জনকের সমাধি কমপেস্নঙ্ নির্মাণের জন্য হসত্মানত্মর করেন। স্বামীর বাড়িটি ছাড়া শেখ হাসিনার নামে দেশে বা বিদেশে কোন বাড়ি নেই। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে মন্ত্রিপরিষদ জাতির জনকের কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনাকে বসবাসের জন্য গণভবন বরাদ্দ দিলেও তিনি তা গ্রহণ না করে রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেন। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও ধনসম্পদের প্রতি শেখ হাসিনার নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে লৰণীয়। বিলাসবহুল-জাঁকজমকপূর্ণ জীবনধারার পরিবর্তে শাশ্বত বাঙালী রমণীর সহজাত সৌন্দর্যবোধ তাঁর জীবনাচরণে বিশেষভাবে প্রতিফলিত। বাঙালী মুসলিম সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও শেখ হাসিনা সংস্কারমুক্ত একজন আধুনিক প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, ভোগ-বিলাস ও বিলাসবহুল আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন দু'নেত্রীকে বিপরীত মেরম্নতে দাঁড় করিয়েছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান মর্মানত্মিকভাবে নিহত হবার পর এ কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে, মৃতু্যকালে তিনি তেমন কোন সম্পত্তি রেখে যাননি। সে সময়ে দায়িত্ব পাওয়া রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৬নং মইনুল হোসেন রোডের সেনাপ্রধানের ১৬৮ কাঠার সরকারী বাড়িটি মাত্র এক টাকা মূল্যে খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ প্রদান করে। এ ছাড়াও খালেদা জিয়ার নামে গুলশানে ৩০ কাঠার আরেকটি বাড়িও বরাদ্দ করে সরকার। বাড়ি দু'টি ছাড়াও নগদ দশ লাখ টাকা, দুই পুত্রের লেখাপড়া, দারোয়ান, ড্রাইভার, মালি, বাবুর্চি, পিয়নসহ প্রায় এক ডজন কর্মচারী রাষ্ট্রীয় খরচে বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় নিয়োগ দেয়া হয়। টেলিফোন বিল, বিদু্যত বিল, গ্যাস বিল এবং গাড়ির তেল সবই সরকার বহন করে। যে বিবেচনায় তৎকালীন সরকার খালেদা জিয়াকে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সরকারী সম্পত্তি বরাদ্দ করেছিল। তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা এখন আর সে পর্যায়ে নেই। গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপার্সন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জনশ্রম্নতি এবং গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী জিয়া পরিবার শত শত কোটি টাকার মালিক। দেশে-বিদেশে, নামে-বেনামে তাদের কারখানা, জাহাজ, শপিংমলসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ধনসম্পদ রয়েছে।
এমতাবস্থায় ২০ এপ্রিল ২০০৯ সামরিক ভূমি ও সেনানিবাস অধিদফতর ক্যান্টনমেন্টের এ/১ ক্যাটাগরির বাড়ি বরাদ্দের আইনগত বৈধতা ও শর্তভঙ্গের অভিযোগ এনে বরাদ্দপ্রাপক খালেদা জিয়াকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য নোটিস প্রদান করে। নোটিস প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়া ৩ মে ২০০৯ হাইকোর্টে রিট দাখিল করেন। মহামান্য হাইকোর্ট দীর্ঘ বাইশ দিন শুনানি শেষে ১৩ অক্টোবর ২০১০ প্রদত্ত এক রায়ে ৩০ দিনের মধ্যে খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য রায় প্রদান করে। এ রায়ের বিরম্নদ্ধে খালেদা জিয়ার পৰ থেকে পুনরায় আপীল করা হলে মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের আফিলেট ডিভিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আপীল বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এরপরের ঘটনা সবার কাছেই দৃশ্যমান। সুপ্রীমকোর্টে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা বেআইনী উশৃঙ্খল আচরণ করে আদালতের স্বাধীন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছে। খালেদা জিয়ার বাড়ি রৰার উদ্দেশ্যে গত কোরবানি ঈদের আগে ও পরে মোট দুই দিন দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে বিএনপি চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। রাজনৈতিক বিষয় বাদ দিয়ে, জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় না এনে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক মীমাংসিত ব্যক্তিগত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ১৪ কোটি মানুষকে কষ্ট দেয়া কখনই রাজনীতি হতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়া প্রায়ই বলতেন, 'ব্যক্তির চাইতে দল বড়, দলের চাইতে দেশ বড়।' কিন্তু বিএনপি বাসত্মবে প্রমাণ করল 'দেশের চাইতে দল বড়, দলের চাইতে ব্যক্তি বড়।' অবৈধভাবে বরাদ্দ পাওয়া একটি বাড়ি রৰার জন্য খালেদা জিয়া যেভাবে পুরো দলকে ব্যবহার করেছেন তা কখনই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে যে সমসত্ম মাল অন্যত্র স্থানানত্মর করা হয়েছে সে তালিকা দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। কোন বাঙালী পরিবারের বাড়িতে এত বিলাসবহুল সামগ্রী থাকতে পারে, এ তালিকা না দেখলে তা কখনও কল্পনাই করা যেত না। ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা সামগ্রিক জীবনাচার এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে দু'নেত্রীর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শেরই প্রতিফলন মাত্র।
৫. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মাঝে রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব। আওয়ামী লীগ সকল সময়েই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে। স্বাধীনতার পর বিচার প্রক্রিয়া শুরম্ন হলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক সপরিবারে নিহত হবার পর সে বছরের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে স্বাধীনতাবিরোধী এই অপশক্তিকে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়া শুরম্ন করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন এবং তার শাসনামলেই ১৯৭৮ সালে অসুস্থ মাকে দেখবার উছিলায় বিদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশী নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে এসে অবৈধভাবে বসবাস করতে থাকেন গোলাম আযম। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং ১৯৯১ সালে ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির নিযুক্ত হন। বিস্মিত হতবাক ক্ষুব্ধ দেশবাসী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। অবশেষে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, ছাত্র-যুব সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাসত্মবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নিমর্ূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি'। এ কমিটি ২৬ মার্চ ১৯৯২ গোলাম আযমসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত গঠনের ঘোষণা দেয়। এর প্রস্তুতি এবং জনমত গঠনের লৰ্যে ৩ মার্চ ১৯৯২ বায়তুল মোকাররমের দৰিণ গেটে জাহানারা ইমামের সভাপতিত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা এই সমাবেশে প্রদত্ত বক্তৃতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দেশের সর্বসত্মরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কবি সুফিয়া কামাল, ৫ দল নেতা হাসানুল হক ইনু, দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের নুরম্নল ইসলাম নাহিদ, সেকটর কমান্ডার কর্নেল (অব) কাজী নুরম্নজ্জামান, গণতান্ত্রিক বিপস্নবী জোটের শাহ্ আতিকউল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ (বীরপ্রতীক), সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও অত্র নিবন্ধের লেখক গোলাম কুদ্দুছ ও প্রজন্ম '৭১-এর শমি কায়সার।
অপরদিকে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ২৩ মার্চ ১৯৯২ জারি করা এক ফরমানে গণআদালতের উদ্যোক্তাদের বিরম্নদ্ধে কেন আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে না_ তার কারণ জানতে চেয়েছে। সরকারের হুমকিধমকি এবং রক্তচক্ষুকে উপেৰা করে ২৬ মার্চ গণআদালত অনুষ্ঠিত হয় এবং বিচারে গোলাম আযম গংয়ের অপরাধ মৃতু্যদণ্ডযোগ্য বলে রায় প্রদান করা হয়। সে দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লৰ লৰ লোকের সমাবেশ আয়োজনে শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে জাহানারা ইমামকে আশ্বসত্ম করেছিলেন। সে সময়ে ১৬ এপ্রিল ১৯৯২ জাতীয় সংসদে গোলাম আযম ইসু্য নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরম্নদ্ধাচরণ, যুদ্ধ ও গণহত্যাসহ মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ সাধন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পরও পূর্বপাকিসত্মান পুনরম্নদ্ধারের নামে বাংলাদেশের বিরোধিতা, নিবন্ধীকৃত বিদেশী নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রৰমতা দখলের উদ্দেশ্যে বে-আইনী তৎপরতায় লিপ্ত পাকিসত্মানী নাগরিক গোলাম আযমের বিরম্নদ্ধে ১৯৯২ এর ২৬ মার্চের গণআদালতে জনগণের যে মতামত প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে প্রতিফলন ও বাসত্মবায়নের লৰ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ আনত্মর্জাতিক ক্রাইম (ট্রাইবুন্যাল) এ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুসারে ট্রাইবুন্যাল গঠন করে গোলাম আযমের বিরম্নদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ বিচারের আইনগত পদৰেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এই লৰ্যে সংশিস্নষ্ট মন্ত্রণালয় গোলাম আযম ও তার সহযোগীদের বিরম্নদ্ধে অবিলম্বে প্রসিকিউশন ও বিচার ব্যবস্থা করবে।' ১৯৯২ সালে মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য রেখেছিলেন কোন ভয়ভীতিই তাঁকে সে অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গণরায় চেয়েছেন_ মানুষ রায় দিয়েছে এবং বহুপ্রতীৰিত বিচার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরম্ন হয়েছে।
অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কখনই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে ছিলেন না। ১৯৯২ সালে যখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী সে সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত গণআদালতের উদ্যোক্তা শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ ২৪ জন দেশবরেণ্য ব্যক্তির নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করেছিল তার সরকার। বেগম জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে তো ছিলেনই না বরং এই অপশক্তিকে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। আবদুল আলিম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দলীয় নেতা ও মন্ত্রী বানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদকে তার সরকারের পূর্ণমন্ত্রী বানিয়েছেন। বর্তমানেও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য অটুট রয়েছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার এবং বিচারের সম্মুখীন করাকে খালেদা জিয়া বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন আখ্যায়িত করে মানুষকে বিভ্রানত্ম করতে চাইছেন। এর আগেও তিনি এই বিচারের ফলে দেশে গণ্ডগোল সৃষ্টি হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। দুই নেত্রীর মত এবং নীতির এই বিশাল ফারাকের মধ্যেই জনগণকে তাদের করণীয় নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যাচাই করে নিতে হবে_ কারা সত্যের পৰে মানবিক আদর্শকে সমুন্নত রাখতে চায়, আর কারা যুদ্ধাপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধ্বংস করতে চায়। (চলবে)