মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১০, ৭ ফাল্গুন ১৪১৬
স্বদেশ বোস ॥ এক বিস্মৃত ভাষা সংগ্রামী
সৈয়দ জিয়াউল হক
গত ৩ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখ আমাদের কাছ থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন স্বদেশ বোস। তাঁর পুরো নাম স্বদেশ রঞ্জন বোস। প্রায় ৮২ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া পরিণত বয়সে মৃত্যুই বলা যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন তিনি। বর্তমান প্রজন্মের সনত্মানেরা জানে না যে স্বদেশ বোসের মৃতু্যর সঙ্গে সঙ্গে কত বিশাল একটি প্রদীপ নির্বাপিত হলো। অবশ্য এই না জানার জন্য স্বদেশ নিজেও অনেকাংশে দায়ী। কারণ জীবনে তিনি ছিলেন একেবারে আত্মপ্রচারবিমুখ।
ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রম্নয়ারি মাস। এই মাসে সারা দেশে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, পত্রপত্রিকা এবং মিডিয়া নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিভিন্ন মিডিয়াতে অনেক সময় এমন এমন লোককে ভাষাসৈনিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যাদের নাম ১৯৫২ সালের পর বহু বছর পর্যনত্ম শোনা যায়নি। কিন্তু কোথাও স্বদেশ বোসের নাম নেয়া হয়েছে বলে অনত্মত আমি শুনিনি। অথচ ভাষা আন্দোলনে স্বদেশ বোসের অবদান ছিল এক কথায় অবিস্মরণীয়।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরই তৎকালীন পশ্চিম পাকিসত্মানী শাসকগোষ্ঠী শুরম্ন করে পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর জাতিগত নিপীড়ন। প্রথমেই তারা আঘাত হানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। পাকিসত্মান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা দেন, উর্দুই হবে পাকিসত্মানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর পূর্বেই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘট ডাকা হয়। ধর্মঘটের সমর্থনে শোভাযাত্রা ও পিকেটিং করার অপরাধে স্বদেশ বোসকে ১০ মার্চ গ্রেফতার করা হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর তাঁকে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখা হয়। এখানে উলেস্নখ করা যেতে পারে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তৎকালীন সরকার পূর্ব বাংলার অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। কিন্তু স্বদেশ বোসের কারাজীবন ছিল সবচেয়ে দীর্ঘতম। এর থেকে প্রমাণ হয় তিনি শাসকগোষ্ঠীর কতটা ত্রাস ছিলেন। জেলে তাঁর ওপর বর্বর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এই নির্যাতনের চিহ্ন তিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রত্য ফল ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরম্নদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। তখন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ১৯৫২ সালের খুনী মুসলিম লীগ নেতা নূরম্নল আমিন। নির্বাচনের পূর্বে ১৯৫৪ সালে নূরম্নল আমিন একবার বরিশাল যান একটি তথাকথিত ছাত্র সম্মেলন উদ্বোধন করতে। বরিশাল স্টিমার ঘাটে কালো পতাকাসহ তাঁর বিরম্নদ্ধে বিােভ প্রদর্শন করা হয়। নূরম্নল আমিনের নির্দেশে স্টিমার ঘাটেই স্বদেশ বোসসহ কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু জনতার রোষে তাঁদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরের দিন ছাত্র জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে তৎকালীন মুসলিম লীগের গু-া কুখ্যাত আবদুল মালেক নিহত হয়। সরকার আবদুল মালেক হত্যাকা-ের অভিযোগে এবং নূরম্নল আমিনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে স্বদেশ বোসসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে। সে সময় স্বদেশ বোসের সঙ্গে আরও যাঁরা গ্রেফতার হন তাঁদের মধ্যে ছিলেন কমরেড নিখিল সেন, কমরেড সুকুমার দত্ত, কমরেড মোশাররফ হোসেন নান্নু, কমরেড মুকুল সেন, কমরেড ধীরেন ভট্টাচার্য, এ বি এম জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর, মোহাম্মদ শাজাহান (ভোলা), আবদুল ওহাব, আবদুর রহমান, কেশব ব্যানার্জী, সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, শদীদ মজিবর রহমান (কাঞ্চন), এ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী, সুনীল গুপ্ত (পরে এরশাদ সরকারে প্রতিমন্ত্রী), হেলাল উদ্দীন মুনশী প্রমুখ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পর স্বদেশ বোস জেল থেকে ছাড়া পান। পশ্চিম পাকিসত্মানী শাসকগোষ্ঠী মাত্র ৩ মাস পর ৯২(ক) ধারা জারি করে পূর্ব বাংলায় গবর্নর-এর শাসন জারি করে। আবারও গ্রেফতার হন স্বদেশ বোস। ১৯৫৫ সালে আবু হোসেন সরকার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রদেশের অনেক রাজবন্দী মুক্ত হলেও স্বদেশ বোস ছাড়া পাননি। তাঁর বিরম্নদ্ধে আনা হয় পুলিশ ধর্মঘটে ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ। আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৭ অর্থাৎ পাকিসত্মান কায়েম হওয়ার দশ বছরের মধ্যে স্বদেশ বোস সাড়ে সাত বছরেরও বেশি কারানত্মরালে ছিলেন।
আদর্শের দিক থেকে স্বদেশ বোস ছিলেন মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী, কিন্তু মার্ক্সবাদী মৌলবাদী ছিলেন না। বাসত্মবতার আলোকে তিনি জীবনধারাকে চালিত করেছেন, তবে সব সময়ে তাঁর চিনত্মা চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি চাখার এ কে ফজলুল হক কলেজ থেকে বি এ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে এম এ কাসে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তাঁর ওপর সরকারের সর্বণিক গোয়েন্দা নজরদারি ছিল এবং তাঁকে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে লালবাগ থানায় হাজিরা দিতে হতো। এম এ পাস করার পর তিনি ''পাকিসত্মান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স'' (চওউঊ) -এ চাকরি নিয়ে করাচী চলে যান। ১৯৬২ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশন বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হন। কিন্তু গোয়েন্দা রিপোর্টের কারণে তাঁর আমেরিকার ভিসা বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে তিনি কেমব্রিজ থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করনে। এই ৬ দফা কর্মসূচী প্রণয়ন ও বিশেস্নষণে যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা প্রদান করেন তাঁদের মধ্যে প্রফেসর নূরম্নল ইসলাম, প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং স্বদেশ বোস অন্যতম। স্বদেশ বোসের জীবনের আর একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ। তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। এই সেলে আরও যাঁরা কর্মরত ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, প্রফেসর খান সারওয়ার মুরশিদ, প্রফেসর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর মুশাররফ হোসেন, ড. কাজী খলিকুজ্জামান, মোহাম্মদ ইউনুস, সনৎ কুমার সাহা প্রমুখ। এ সময় তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের অত্যনত্ম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দিন সরকারের বিরম্নদ্ধে চলছিল নানামুখী যড়যন্ত্র। খুনী মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মাহবুব আলম চাষী ছাড়াও আওয়ামী লীগের একটি অংশও বিভিন্ন সময়ে তাজউদ্দিন সরকারের বিরম্নদ্ধে সক্রিয় ছিল। সকল অবস্থায়ই স্বদেশ বোস তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে ছায়ার মতো অবস্থান করে সহযোগিতা দান করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দলেরই কিছু লোক তাঁকে বোঝাতে থাকেন যে মোশতাক নয়, তাজউদ্দিনই তাঁর প্রধান শত্রম্ন। এরই প্রোপটে স্বাধীনতার মাত্র ২২ মাস পর ২৬ অক্টোবর ১৯৭৪ তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নেন। বাঙালী জাতির জন্য এ এক নিদারম্নণ বেদনাদায়ক ঘটনা। তাজউদ্দীনের বিদায়ে স্বদেশ বোস এতোই মর্মাহত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন যে তিনি বিশ্বব্যাংকে চাকরি নিয়ে আমেরিকায় চলে যান এবং সেখানে দীর্ঘ ২১ বছর চাকরি করেন। স্বদেশ বোসের রাজনৈতিক চিনত্মা ও চেতনায় যে পরিবর্তন এসেছিল তা বিশেষভাবে লণীয়। একসময়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীতি স্বদেশ বোস তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ কাটিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের চাকরিতে। অনেকের কাছেই বিষয়টি দারম্নণ বেখাপ্পা মনে হবে। কিন্তু নিজ অবস্থানে থেকে আজীবন সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও অপশাসনের বিরোধিতায় সক্রিয় ছিলেন।
স্বদেশ বোসের কথা বলতে গেলে তাঁর স্ত্রী নূরজাহান বোসের কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। নূরজাহান ছিলেন স্বদেশ বোসের রাজনৈতিক বন্ধু পঞ্চাশের দশকের তুখোড় যুবনেতা ইমাদুলস্নাহর বিধবা স্ত্রী। এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে কিছু বলা এই প্রবন্ধের ুদ্র পরিসরে সম্ভব নয়। ওয়াশিংটনে স্বদেশ বোস ও নূরজাহান বোসের বাসা ছিল দুই বাংলার প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, জ্ঞানী-গুণী ও শিল্পী সাহিত্যিকদের মিলন কেন্দ্র।
স্বদেশ বোস সত্য ভাষণে কখনও ভ্রূকুটি করেননি। যা বিশ্বাস করেছেন অকপটে তা প্রকাশ করেছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ে তিনি অত্যনত্ম মর্মাহত হন। ২০০২ সালে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে স্বদেশ বোসের লিখিত বক্তৃতা পড়ে শোনানো হয়। কারণ সে সময়ে তিনি ছিলেন বাকরম্নদ্ধ। আওয়ামী লীগের কয়েকজন সংসদ সদস্যের অপকর্মের কথা তিনি তাঁর বক্তব্যে সরাসরি উলেস্নখ করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিসত্মানপন্থী ও দণিপন্থীদের বিপরীতে কোন কার্যকর ঐক্য গড়ে তোলার ব্যর্থতারও অভিযোগ আনেন। সেদিনের বক্তব্যের শেষে তিনি বলেছিলেন, ''জাতির পিতার হত্যার বিচার না হলে সে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা বাংলাদেশের মাটিতে ঘুরে বেড়াবে আর বাংলাদেশী বলে আমরা গর্ব অনুভব করব এটা হতেই পারে না।'' গত ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনীর মৃতু্যদ- কার্যকর হয়েছে। কিন্তু স্বদেশ বোস তা দেখে যেতে পারলেন না।
ই-মেইল : ংুবফুরধনফ@মসধরষ.পড়স