মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
কার মদদে আপনি নির্বাচনে আসেননি?
সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে খালেদার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী
সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, কার মদদে আপনি নির্বাচনে আসেননি? থাইল্যান্ডে নির্বাচন না হওয়ায় মার্শাল ল এসেছে। আপনি কি চেয়েছিলেন নির্বাচন বানচাল করে বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে? আপনার নির্বাচনে না আসার ভুলের মাসুল কেন জনগণকে দিতে হবে? শত চেষ্টা করেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করতে পারেননি। নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত মানুষকে হত্যার পর এখন আবার কোন্ মুখে মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষার কথা বলছেন? শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেই গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে, দেশের এত বিজয় এসেছে। নির্বাচনে না এসে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এখন না ঘরকা, না ঘাটকা। সংসদেও নেই, আছেন বাইরে- তাই এত অন্তর জ্বালায় ভুগছেন তিনি। তবে যে যতই চেষ্টা করুক দেশ এগিয়ে, এগিয়ে যাবেই।
রবিবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে রাখতে গিয়ে কুমিল্লায় জনসভায় খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনে না এসে বিএনপি নেত্রী বানচালের নামে সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। শত শত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছেন। তিনিসহ অনেকেই ভেবেছিলেন নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হলেও সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) হবে। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলাম বলেই দেশের মানুষ আজ স্বস্তিতে রয়েছে, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি’- খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ না করলে কে করেছে? একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করে যে দেশকে পরাজিত করেছি, সেই পরাজিত শক্তি পাকিস্তানও এমন কথা বলেন না, যে কথা বলে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তো বিএনপির জন্মই হয়নি। হয়ত একদিন খালেদা জিয়া বলবেন গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদরা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আলবদর-আলশামস-যুদ্ধাপরাধীরাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে! বিএনপি নেত্রীর এমন বক্তব্যের বিচার দেশের জনগণই করবে। তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, কার স্বার্থে আপনি এমন অসত্য কথা বলেন দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন?
এ প্রসঙ্গে পাকি জেনারেল আসলাম বেগের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেনারেলের বেগের চিঠিতেই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ ছিল। ওই চিঠিতে জেনারেল বেগ জিয়াউর রহমানকে তার ভূমিকার জন্য শাবাশ দেয়া হয়েছিল এবং ওই সময় জিয়া পরিবার যে তাঁদের কাছে সুরক্ষিত রয়েছে তাও উল্লেখ ছিল। আর ক্ষমতায় থাকতে জেনারেল জানজুয়ার মৃত্যুতে শোকবার্তা খালেদা জিয়া পাঠিয়েছিলেন কোন ব্যথা থেকে তা আমি জানি না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিকামী বাঙালী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল। আর যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
‘দেশে একদলীয় শাসন চলছে’- বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রীর বর্তমান অবস্থা আমরা বুঝি। নির্বাচন না করে উনি যে ভুল করেছেন, তা থেকেই তিনি এসব মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশে যদি এক ব্যক্তিরই শাসন চলে তবে সরকারের ক্যাবিনেট কী করছে? সার্বভৌম সংসদই বা কী করছে? একদলীয় শাসন চললে উনি (খালেদা জিয়া) কীভাবে জনসভা করে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন? তিনি বলেন, জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বিএনপির জন্ম দিয়েছিল। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর হাতে জন্ম নেয়া দলও অবৈধই হয়। অবৈধ দলের নেত্রীর মুখে এসব কথা মানায় না।
স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাপনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ। মাত্র ১০ কার্যদিবস চলার পর স্পীকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ শুনিয়ে চতুর্থ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসভায় বিএনপি নেত্রী বলেছেন ওনার আন্দোলন নাকি মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার জন্য। যিনি নির্বাচন ঠেকানো ও জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে শত শত মানুষকে হত্যা করেছেন, উনি কেমন করে এখন জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার কথা বলেন? আর যিনি এতিমের টাকা পর্যন্ত মেরে খান তিনি কীভাবে দেশের মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলেন? তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি নেত্রী এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। এখন এ নিয়ে দায়েরকৃত মামলায় আদালতে হাজিরা দিতেও ভয় পান। উনি যদি অপরাধীই না হবেন তবে মামলা মোকাবেলা করতে এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আসলে বিএনপির নেত্রীর অবস্থা হচ্ছেÑ চোরের মন পুলিশ পুলিশ।
‘দেশের কোনই উন্নয়ন হচ্ছে না’- বিএনপি নেত্রীর এমন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি বলেছেন দেশের উন্নয়ন হচ্ছে না, অর্থনীতি নাকি খুবই খারাপ! জবাবে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি খারাপ, নাকি ওনার (খালেদা জিয়া) অর্থনীতি খারাপ? ক্ষমতায় থাকতে উনি অনেক টাকা বানিয়েছেন। জিয়াউর রহমান নাকি ভাঙ্গা স্যুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গিয়েছিলেন। তবে এত সম্পদের মালিক হলেন কীভাবে? তবে কী ভাঙ্গা স্যুটকেস জাদুর বাক্স হয়ে গিয়েছিল? তিনি বলেন, আসলে ঘটনা তো না নয়। ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি করেছেন, লুটপাট করেছেন। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে দেশের উন্নয়ন নয়, নিজেদের উন্নতি করেছেন। কী করে ১৪-১৫টি ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক হলেন, কীভাবে টিভি-ব্যাংকের মালিক হয়েছেন উনি এবং ওনার ছেলেরা?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন ক্ষমতায় থাকতে নাকি উনি উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন! কিন্তু তাঁর উন্নয়নের জোয়ার যে ভাটার টানে চলে গেছে, সেটা আর ফিরে দেখেননি। র‌্যাব বিলুপ্তি প্রসঙ্গে বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, এখন র‌্যাব বিলুপ্তি চান, কিন্তু এই র‌্যাব সৃষ্টি করে আপনি কত মানুষকে হত্যা করিয়েছেন? ২০০৪ সালের ১৪ অক্টোবর আপনিই বলেছিলেন- ‘পুলিশ ও র‌্যাব কী সুন্দর কাজ করছে।’ তবে কেন এখন র‌্যাবের বিরুদ্ধে কথা বলছেন? উনি ক্ষমতায় থাকলেই র‌্যাব ভাল, আর না থাকলেই খারাপ- এটা কেমন কথা?
দেশের বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়- খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসেই ১ হাজার ১৮১ মিলিয়ন ডলারের বিদেশে বিনিয়োগ এসেছে। বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, অনেকেই দেশের উন্নয়ন চোখে দেখেন না, কানেও শোনেন না। দেখেও দেখেন না। ক্ষমতায় থাকতে উনি ও নিজের পরিবারের উন্নয়ন করেছেন, আর দেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা ক্ষমতায় এসে মাত্র ৫ বছরেই সেই অবস্থা থেকে দেশকে তুলে এনেছি।
বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ ॥ সংসদের সমাপনী বক্তব্যে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে কর্মসংস্থান ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান হলে যুব সমাজ বিপথে যাবে না। কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদেশী বিনিয়োগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। এসব জটিলতা দূর করতে হবে। রাজধানী ঢাকাকে রক্ষা করতে হবে, ঢাকা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ না করলে ঢাকার বাইরে কেউ যেতে চাইবে না। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি শুধু বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা নয়, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কথা বলি।
পদ্মা সেতু উন্নয়নের মাইলফলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পদ্মা সেতু নির্মিত হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। অনেক আগেই সেতুটি নির্মিত হতো, কিন্তু কিছু মানুষের কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে। ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদক পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। আজ সবকিছুতেই ভেজাল মিশ্রিত করা হচ্ছে। যারা খাদ্য ভেজাল দিচ্ছে তারাও জানে না এসব খাদ্য খেয়ে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু আইন দিয়ে নয়, মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণকে মোটিভেশন করতে হবে।