মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
ফসল আবাদে নতুন পথের দিশা ॥ কৃষি কল সেন্টার
০ বিনা পয়সায় তাৎক্ষণিক সমাধান
০ তবে অর্থসঙ্কটে ভবিষ্যত অনিশ্চিত
কাওসার রহমান ॥ ফসল আবাদে কৃষককে নতুন পথের দিশা দিয়েছে কৃষি কল সেন্টার। দিন দিন কল সেন্টারের প্রতি কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। নানান ধরনের ফসল আবাদে কৃষকের তথ্য জানার আগ্রহের শেষ নেই। প্রতিদিন দেড় থেকে ২শ’ কল আসছে কৃষি কল সেন্টারে। আলু ও সবজি আবাদের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানতে চায় কৃষকরা। এছাড়া ধান, পাট, গম, মাছ চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ে নিয়মিত কল আসে কৃষি কল সেন্টারে। আর বিনা পয়সায় এ তথ্য জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। বিনা পয়সায় তৎক্ষণাৎ সমস্যার সমাধান পেয়ে কৃষকরাও খুব খুশি। তবে অর্থ সঙ্কটে এই কল সেন্টারের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে এগিয়ে না এলে আগামী ডিসেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের কৃষক সমাজের মাঝে সাড়া জাগানো এ কৃষি কল সেন্টারটি।
কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সেবা দিতে সরকার চলতি বছর চালু করে এ কৃষি কল সেন্টার, যা দেশের কৃষি উন্নয়নে এক নতুন সংযোজন। সরকারীভাবে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম জায়গা করে নিয়েছে। এই কল সেন্টারের নম্বর হচ্ছে ১৬১২৩, যা থেকে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস ও প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার ফার্মগেটের খামারবাড়ির কৃষি তথ্য সার্ভিসে চালু করা হয়েছে এটি। চলতি বছরের মাঝামাঝি ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে কৃষি কল সেন্টারের নতুন আলোকিত পথের যাত্রা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন এ কল সেন্টারের। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ পায় বিনা পয়সায় কৃষি তথ্য সেবা প্রযুক্তি জেনে নেয়ার নির্দিষ্ট ডিজিট ১৬১২৩।
যে কেউ তার মোবাইল বা টেলিফোন নম্বর থেকে ১৬১২৩ নম্বরে ফোন দিলেই কল সেন্টার থেকে জানতে চাওয়া হবে কৃষি, মৎস্য বা প্রাণী কোন বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট তথ্যের জন্য নির্দিষ্ট নম্বরে প্লেস করতে হবে। এরপর কৃষকের কাছ থেকে সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা দেয়া হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
কৃষি কল সেন্টারের ৫ অপারেটরের মধ্যে ৩ জন স্নাতক কৃষি, পশুচিকিৎসক এবং মৎস্যবিদ; বাকি ২ জন মাঠপর্যায়ের কৃষিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও যুক্ত রয়েছেন ৬ এক্সাটার্নাল বিশেষজ্ঞ, যাদের সঙ্গে প্রয়োজনে কল সেন্টার গ্রাহককে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে কৃষি তথ্য সার্ভিসের উপ-পরিচালক (গণযোগাযোগ) কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কল সেন্টারটি স্থাপনে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটির দেয়া গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে। কল সেন্টারে দুটি স্ট্যান্ডবাই সার্ভার, ফোনকল পরিচালনার জন্য আইভিআর এবং কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এ্যান্ড ক্ল্যায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার রয়েছে। বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকলেও অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে বিদ্যুতের ব্যাকআপ রয়েছে। কলসার্ভারটি একসঙ্গে ত্রিশটি কল রিসিভ করে সেবা দিতে পারে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ভারতে কিষাণ কল সেন্টারে গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখের বেশি, যারা বিনা পয়সায় কল সেবার সুযোগ পাচ্ছেন। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং কেনিয়াতেও সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে চলছে কৃষি কল সেন্টারের কার্যক্রম।
কৃষি তথ্য সার্ভিস ও প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের ২০১১ সালের জুন মাসে কল সেন্টার বিষয়ে একটি প্রাথমিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মোতাবেক এই কল সেন্টারটি স্থাপন করা হয়। ২০১২ সালের জুনে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ইতোমধ্যে এ কল সেন্টার ৪৪ হাজারের বেশি ফোন কল রিসিভ করেছে। ১৫ হাজার কলারকে কৃষি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ কৃষির বিভিন্ন বিষয়ের অনুসন্ধানের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া হয়েছে এবং বাকি অনুসন্ধানগুলোর উত্তর বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে পরে কলারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মোট কলারদের মধ্য থেকে ১০ হাজারের ফলোআপে জানা গেছে, তাদের দেয়া তথ্য সন্তোষজনকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ‘কৃষি বিষয়ে তথ্য জানার জন্য কৃষকের আগ্রহ খুব। প্রতিদিন অব্যাহতভাবে কৃষকের কল আসতে থাকে। জবাব দিয়ে শেষ করা যায় না। কর্মরতদের কেউ ছুটিতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। তখন লোকজন ধরে এনে কল সেন্টার চালাতে হয়।’
তবে কৃষকের মাঝে সাড়া জাগানো এই কল সেন্টারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতদিন এটি চলেছে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের আর্থিক সাহয়তা। কিন্তু এ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি বলেছে তারা আর বিশেষজ্ঞদের সম্মানী দিতে পারবে না। ফলে ডিসেম্বর মাস থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে কৃষকের মাঝে জনপ্রিয়তা সৃষ্টিকারী এ কল সেন্টারটি।
স্থায়ীভাবে এ কল সেন্টারটি পরিচালনার জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিস তিন বছর মেয়াদী একটি কর্মসূচী প্রণয়ন করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ওই কর্মসূচী অনুমোদন করতে চাচ্ছে না। অন্য কোন এনজিও এ কল সেন্টার পরিচালনায় স্থায়ীভাবে অর্থয়ন করতে রাজি হচ্ছে না। যারা করতে চায় তারা স্বল্প সময়ের জন্য করতে চায়। কিন্তু কেউ স্থায়ীভাবে এগিয়ে আসছে না। এ কারণে দেশে প্রথম স্থাপিত কৃষি কল সেন্টারটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই কর্মসূচী অনুমোদন না করলে শেষ পর্যন্ত বন্ধই হয়ে যেতে পারে এই কল সেন্টার।
তবে শেষ ভরসা হচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয় নিজেই। কৃষি মন্ত্রণালয় যদি তার থোক বরাদ্দ থেকে এ কল সেন্টার পরিচালনায় এগিয়ে আসে তাহলেই একমাত্র টিকে যেতে পারে কৃষি কল সেন্টার। অন্যথায় এই ভাল উদ্যোগটি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
উল্লেখ্য, কৃষি তথ্য সার্ভিস কল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩ বছরের জন্য ৪ কোটি টাকার একটি কর্মসূচী প্রণয়ন করেছে। কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরের হেল্পলাইনে একযোগে দশটি ফোনের সঙ্গে অপারেটরের মাধ্যমে বিনা পয়সায় গ্রাহকসেবা দেয়া হবে। ১০ জন এক্সটার্নাল বিশেষজ্ঞসহ ১০ অপারেটর প্রতি দিন ৮ ঘণ্টা করে সেবা দেবেন।