মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
দেশে-বিদেশে একের পর এক বিরাট সাফল্য সত্ত্বেও ॥ অস্বস্তিতে শাসক দল দলীয় কোন্দল আর বেফাঁস মন্তব্যে
জটিলতা পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সরকারের সাফল্য বা অর্জনের কমতি নেই; একের পর এক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, দেশীয় অর্থনীতি মজবুত, উপচেপড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। রাজপথেও নেই সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সংঘাত-সাংঘর্ষিক রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রধান প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব সঙ্কটের ফেলার কৃতিত্বও সরকারের ঝুলিতে।
এত সাফল্য অর্জনে স্বস্তিতেই থাকার কথা শাসকদল আওয়ামী লীগের। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো। খুব একটা সুখে-স্বস্তিতে নেই শাসক দলটি। জটিলতা যেন পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের। শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল-সংঘাত আর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা জ্যেষ্ঠ নেতাদের লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্যের কারণে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার এক বছর পূর্তি না হতেই স্বস্তির বদলে অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ। দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল না দিতে পারার ব্যর্থতায় সরকারের বিপুল অর্জনই যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে খোদ দলের ভেতর থেকেই।
আর মাত্র ৪০ দিন পরই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এক বছর পূর্তি হবে। এর মাধ্যমে কার্যত ৬ বছর ধরেই ক্ষমতায় রয়েছে দলটি। আর এ ছয় বছরে ক্ষমতাসীন সরকার একের পর এক অর্জন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন আদায় করতে পারলেও কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত দল গোছানোর কাজে ততটাই ব্যর্থ হয়েছে শাসক দলটি। যার কারণে এই ছয়টি বছরেই বিরোধী দলের পরিবর্তে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণে বহুবার জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এমপি বলেন, বিভিন্ন দল থেকে সুযোগসন্ধানীরা দলে অনুপ্রবেশ করেছে। বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই দলে অনুপ্রবেশকারী আদর্শহীন সন্ত্রাসী। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কিংবা অন্য কোন কারণে কেউ সংঘাতে জড়িত হলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। একইসঙ্গে এসব অপকর্মে জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত হলে তিনি যত বড় নেতাই হন না কেন কোন ছাড় দেয়া হবে না।
শত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বন্ধুর পথ পেরিয়ে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বারে মতো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বিএনপি বা তাদের জোট বর্জন করলেও নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও তা মাত্র কিছুদিনের মধ্যে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মাত্র কিছুদিনের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়েও সক্ষম হন। সিপিএ ও আইপিইউ’র মতো আন্তর্জাতিক দুটি শীর্ষ সংস্থায় বাংলাদেশের দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে সরকারের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি প্রমাণ করতেও সক্ষম হন তিনি।
এত কিছুর পরও নিজ দলের মধ্যে সৃষ্ট কোন্দল-দ্বন্দ্ব আর সিনিয়র নেতাদের লাগামহীন মন্তব্যে শুধু অস্বস্তিই নয়, প্রায়শই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে। দেশে সরকারবিরোধী বিএনপি-জামায়াত জোটের জোরালো কোন আন্দোলন নেই, নেই রাজপথে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ। তা সত্ত্বেও সরকারী দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মকা- আর মন্ত্রী-এমপিদের একের পর এক লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্যে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে সরকারকে। একটি সঙ্কট কাটতে না কাটতেই মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য আর নিজ দলের মধ্যে বিবদমান গ্রুপের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ জন্ম দিচ্ছে সরকারের জন্য নতুন সঙ্কটের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে দলের ভেতর থেকেই। এসব কারণে সরকারের ফাঁড়া আর জটিলতা যেন কাটছেই না।
শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলই নয়, দলের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বেফাঁস মন্তব্যেও সরকারকে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়। নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেই জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে শুধু জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনই নন, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বেশ উল্লসিত ছিল বিএনপি। কিন্তু নিউইয়র্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করার পর বিএনপির নেতাদের মুখ বন্ধ করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নরেন্দ্র মোদি বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান- ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন, আর শেখ হাসিনা দেশকে বাঁচিয়েছেন।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এত অর্জন নিয়ে দেশে না ফিরতেই প্রচ- ধাক্কা আসে নিজ দল থেকেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে নিজ দলেরই মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ধর্ম নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে পুরো সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা, সভাপতিম-লীর পদ থেকে সরানোর পর আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় পরিস্থিতি কিছু শান্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীরই রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে প্রদত্ত একটি বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। তবে এইচটি ইমাম সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁর বক্তব্যকে খ-িত ও বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও এ ইস্যু নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করতে দেখা গেছে বিএনপি-জামায়াতকে।
অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলে কাউন্সিলের মাধ্যমে দ্রুত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নির্দেশের পর মাঠে নামেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দল ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করতে গত ২০ অক্টোবর জেলা নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এর আগে গত গত ২০ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সারা দেশে জেলা সম্মেলন করার জন্য সাত বিভাগের ১০টি টিম করা হয়। ইতোমধ্যে এসব টিম বিভিন্ন জেলার সম্মেলন করেছে এবং বিভিন্ন জেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেছে।
কিন্তু তৃণমূলে কাউন্সিল করতে গিয়ে প্রায়শই হোঁচট খেতে হচ্ছে তাঁদের। পদ না থাকলে ক্ষমতা থাকবে না। এ কারণেই এক যুগেরও বেশি সময় নেতৃত্বে থাকা ব্যর্থ নেতারাই প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হচ্ছেন প্রায় সবখানেই। আর এ তৃণমূল কাউন্সিলকে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় দলটিতে। আর আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার জের ধরে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত রূপ নেয়। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণও গেছে বেশ ক’জনের।
নতুন কমিটিতে স্থান পেতে মরিয়া দলের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে মহানগর নেতাকর্মীরাও। যোগ হয়েছে নানা গ্রুপিং, লবিং ও বিভক্তি। কমিটি গঠনসহ নানা ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই বাধছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অনেকস্থানে অস্ত্রের মহড়াও দেখা গেছে। বেপরোয়া নেতাকর্মী কেউ কারও নির্দেশ মানছেন না। এমনকি নিজ দলের নেতাকর্মীর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় কয়েকটিস্থানে সম্মেলন স্থগিতের ঘটনা ঘটলেও থামানো যাচ্ছে না কোন্দল-দ্বন্দ্ব। কাক্সিক্ষত পদ পেতে আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যবহার করছেন সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠনকে। ব্যক্তিস্বার্থে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে ব্যবহার করার কারণে তারাও জড়িয়ে পড়ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্বে। সর্বশেষ দেশের কয়েকটিস্থানে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের প্রাণঘাতী সংঘর্ষে দু’জন কর্মীর প্রাণহানির ঘটনায় চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় দলের হাইকমান্ডকে।
সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ দলটির বাঘা বাঘা কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে ঢাকা ফিরে না আসতেই সেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘোষিত কমিটিকে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করা হয় পাল্টা কমিটি। এ নিয়ে দু’পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। স্পষ্টত বিভক্ত জেলা কমিটি। শুধু কুষ্টিয়াতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই এখন এই অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক জায়গায় মন্ত্রী-এমপি প্রভাব খাটিয়ে নিজেরা বড় বড় পদে বসতেও কুষ্ঠাবোধ করছেন না।
গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও দলের অভ্যন্তরীণ এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই অভিযোগ করেন, অনেক জায়গায় এমপিরা প্রভাব খাটিয়ে নিজেরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে জোর করে বসছেন। অনেক মন্ত্রীও এতে সায় দিচ্ছেন। এতে ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত হচ্ছে, তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তৃণমূল নেতাদের মতামতকে উপেক্ষা করে কোন মন্ত্রী-এমপি পদ বাগানোর চেষ্টা করলে তা বরদাস্ত করা হবে না। তার বিরুদ্ধে চরম সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে সভাপতিম-লীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যা চলছে তা অব্যাহত থাকলে আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রয়োজন পড়বে না। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের পতন ঘটাবে। অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্ব নিরসন করতে না পারলে সরকারের জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তহাতে দলের নেতা-মন্ত্রীদের মুখের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামীতেও আওয়ামী লীগ ও সরকারকে বড় মাসুল দিতে হতে পারে।