মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
না’গঞ্জে আ’লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী নিহত
গুলিবিদ্ধ ১৫ ॥ বাড়িঘর ভাংচুর আগুন সড়ক অবরোধ
স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ ॥ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আমজাদ হোসেন (৪৫) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৫ জন। তাদের গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই দফা প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ লোকজন কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের লোকজন বিএনপি সমর্থক দুই কর্মীর ৫টি বসতঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ঘটনার পর পরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আটক করেছে। রবিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অতিরিক্ত র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহত যুবলীগ কর্মী আমজাদ উপজেলার দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচরুখী এলাকার মৃত ইদ্রিস মোল্লার ছেলে। আহতরা সকলেই যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, বিলবোর্ড উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উপজেলার পাঁচরুখী এলাকায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ সমর্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। রবিবার সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর ছবি সংবলিত ফেস্টুন ভাংচুর করে বিএনপির লোকজন। এ নিয়ে সাতগ্রাম ইউনিয়নের পাঁচরুখী এলাকাতে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু সমর্থিত যুবলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুবদলের নজরুল ইসলাম আজাদ সমর্থক সজীব, দ্বীন ইসলাম, মনির ও তার সহযোগীদের মধ্যে বাগবিত-ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সকাল পৌঁনে ১১টার দিকে আমজাদ হোসেনকে যুবদল কর্মী সজীব, ইকবাল, ফারুকসহ তাদের সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। পরে আমজাদের পায়ে সজীব গুলি করে এবং তার লাইসেন্স করা পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন আমজাদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে উভয় গ্রুপের লোকজন ধারালো অস্ত্র, বল্লম, টেঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় ব্যাপক সংঘর্ষ। এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ দীন ইসলাম, ডাঃ মনিরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। আইউব, বাবু, সাইফুল, তাওহীদ, সোলায়মানসহ বাকিদের রূপগঞ্জের ভুলতা ও পার্শ্ববর্তী নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। সংঘর্ষের সময়ে উভয় পক্ষের ব্যাপক গোলাগুলিতে এলাকাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বন্ধ হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যান চলাচল। তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এক ঘণ্টা অবরোধ থাকার বেলা সাড়ে ১২টায় পুলিশ এসে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমজাদের মৃত্যু হয়। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ ও আমজাদের এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরে বেলা ১টায় ফের সড়ক অবরোধ করে নেতাকর্মীরা। প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর এবং ফটিক ও ইকবালের ৫টি বসতঘরে আগুর জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা।
আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ঘরের মালিক বিএনপি সমর্থক আব্দুর কাদিরের পুত্রবধূ খোদেজা বেগম সাংবাদিকদের জানান, সকালে আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল লোক পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুর চালায়। এক পর্যায়ে তারা পেট্রোল ঢেলে তাদের ৫টি বসতঘর আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। তারা পাকা ভবনের একটি ঘরে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
ঘটনাস্থলে থাকা আড়াইহাজার উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওই এলাকার মোঃ বাকির ভূইয়া সাংবাদিকদের জানান, ব্যবসায়িক কারণে আমজাদ হোসেন মোল্লা নারায়ণগঞ্জের জামতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে। মাঝে মধ্যে তার পৈত্রিক বাড়ি পাঁচরুখী এলাকা এসে এলাকার লোকজনের বিভিন্ন সমস্যায় সহযোগিতা করে। রবিবারও সকাল সাড়ে ৯টায় সে পাঁচরুখী বাজার থেকে মহাসড়কে উঠার সময় নজরুল ইসলাম আজাদের সমর্থক ইকবাল, রুহুল আমিন, চাক্কু মামুনসহ ১০-১২ জন তাকে দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পড়ে খুনের মামলার আসামি সজীব তার পায়ে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নেয়া হলে সেখানেই আমজাদ হোসেন মারা যায়। নিহত আমজাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জুয়েল আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন বিএনপির বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলার কারণেই এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।
এদিকে খবর পেয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। তাকে দেখে আমজাদের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু সাংবাদিকদের বলেন, গোটা উপজেলায় মানুষ যেখানে শান্তিতে বসবাস করছে, সেখানে খুনী চক্র সে শান্তি বিনষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। সর্বশেষ নিরীহ ও শান্ত মানুষ ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করল। তার সঙ্গে দ্বীন ইসলাম, মনিরসহ আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের অতর্কিত গুলি ও দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেছে। নিহত যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে তিনি জানান।
ঘটনার পর পরই নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন, ইউএনও মোহাম্মদ সামছুল হক, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ শরিফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানান, রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক আমজাদকে মৃত ঘোষণা করেন। তার গায়ে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে ১০ জনকে। দোষীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে।