মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
ইবি ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র ২৫ বাসে আগুন ॥ ভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা
পুলিশের গুলি, ৩০ শিক্ষার্থী আহত ॥ বাস চাপায় ছাত্র নিহতের জের
নিজস্ব সংবাদদাতা, কুষ্টিয়া ও ইবি সংবাদদাতা ॥ বাসচাপায় কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিহতের জের ধরে রবিবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ইবি ক্যাম্পাস। নিহত ছাত্রের নাম তৌহিদুর রহমান টিটু। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। রবিবার দুপুর ১২টার দিকে চতুর্থ শিফটের বাসগুলো ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় প্রধান ফটকের সামনে বাসচাপায় মারা যায় টিটু। তার মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়া মাত্র জ্বলে ওঠে সহপাঠীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ গাড়িতে আগুন ও ৫ গাড়ি ভাংচুর করে তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের ইবি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ইবি প্রক্টরের নির্লিপ্ততার কারণে পুলিশ গুলি চালিয়েছে বলে দাবি সাধারণের। এ জন্য প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেছে বিক্ষুব্ধরা।
এদিকে অনাকক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে সিন্ডিকেটের জরুরী সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ছাত্রদের রবিবার সন্ধ্যা ৬টা এবং ছাত্রীদের সোমবার সকাল দশটার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিকেলে পরিসংখ্যান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, ক্লাস শেষ করে রবিবার ইবির বায়ে টেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমার টিটু চতুর্থ শিফটের ১২টার বাস ধরতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে যান। এমন সময় পেছন দিকে থেকে আসা ঝিনাইদহগামী রাজ মটরস নামে একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির ধাক্কায় সে মাটিতে পড়ে গেলে সাগর পরিবহন নামে আর একটি গাড়ি তার গলার ওপর দিয়ে চলে যায়। আর এতে ঘটনাস্থলেই টিটুর মৃত্যু হয়। টিটুর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহিষপুর নামক স্থানে। এ ঘটনায় ভাংচুরে আর আগুনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন, অনুষদ ভবন, বিজ্ঞান ভবন, টিএসসিসিতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের ওপর ১৫০ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে ২০ এদিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিমের নির্দেশে ৩ ঘণ্টা পড়ে থাকা লাশের কোন ব্যবস্থা না করে উল্টো আমাদের ওপর গুলি করা হয়েছে। ঘটনার সময় থেকে শেষ পর্যন্ত প্রক্টরকে মাঠে দেখা যায়নি। এদিকে প্রক্টরের এমন নির্দেশের কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফায় ব্যাপক ধাওয়া পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের লাখ করে পুলিশ গুলি চালালে তারা দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। এক পর্যায়ে কুষ্টিয়া থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আসে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকায় তাড়িয়ে দিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এর কিছুক্ষণ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তাব্যক্তিরা জরুরী এক সিন্ডিকেট সভায় বসেন। ঘণ্টাব্যাপী মিটিংয়ের পরে পরবর্তী অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এদিকে সংশ্লিষ্ট বাসচালককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির নির্দেশদাতা প্রক্টরের অপসারণের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তারা এই বিচার না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশের পরও হল ছাড়তে নারাজ।
এ বিষয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, আমাদের আজকের দাবি কোন রাজনৈতিক দাবি নয়। আমরা আমাদের এক সহপাঠীকে হারিয়েছি। এর বেদনা আমরাই বুঝি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমাদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে গুলি করতে। আমরা ঘাতক বাসচালক ও প্রক্টরের বিচার চাই।
এ বিষয়ে ইবি থানার ওসি মহিবুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার টিম নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। তবে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা অনেক গাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল। এ বিষয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম স্বপন বলেন, টিটু একজন মেধাবী ছাত্র ছিল। আমি তাদের রেজাল্টের কাজ করছিলাম। এমন সময় শুনতে পেলাম তার এই অশুভ সংবাদ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বাড়িতে পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিম বলেন, আমি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং পাটকাঠি দেখিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়। পরবর্তীতে আমি সেখান থেকে চলে আসি এবং পুলিশের শরণাপন্ন হই। যতদূর পেরেছি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, মৃত্যুর ঘটনাটি সত্যিই বেদনাদায়ক। আর সহপাঠীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো সম্পদ নষ্ট করা সমীচীন নয়। তবে এর চেয়ে আরও বড় কোন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে আমরা এক জরুরী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কিছুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছি।
ঝিনাইদহ থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহনে আগুন ও ভাংচুরের প্রতিবাদে রবিবার বিকেল থেকে ঝিনাইদহের সকল রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় ঝিনাইদহ জেলা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। ঝিনাইদহ জেলা বাস-মিনিবাস ও ট্রাক মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হবু জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যানবাহন অক্ষত রেখে আমাদের যানবাহনে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত সকল রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, পৌরসভা মেয়র হাজী সাইদুল করিম মিন্টু জানান, প্রশাসনের সঙ্গে মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দের আলোচনার পর নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।