মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
০ সড়ক মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ 0 বেপরোয়া ড্রাইভার ॥ এ মৃত্যু রুখবে কে
০ বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫৫ নিরীহ যাত্রী-পথচারী প্রাণ হারাচ্ছে ॥ তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
০ বেশিরভাগ তথ্যপূরণ ছাড়াই মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স
০ অধিকাংশই ওস্তাদের কাছে শিখে গাড়ি চালাচ্ছে
০ যাত্রী পথচারী কারও জীবনের নিরাপত্তা নেই
রাজন ভট্টাচার্য ॥ জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় কিংবা ফুটপাথ দিয়ে চলার পথে গায়ের ওপর উঠছে বাস! গাড়ি থামানোর জন্য ট্রাফিক সিগন্যালের পরও বেপরোয়া চালক। পুলিশের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি- এমন নজিরও আছে। পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ও নেই জীবনের নিরাপত্তা। মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদ। যে কোন সময় ঘটছে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই ঝরে যাচ্ছে তাজাপ্রাণ। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন একটিই, নামধারী এই চালকদের অন্তরালে ঘাতকদের রুখবে কে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারিগরিসহ যথাযথভাবে সকল পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেয়ার সামর্থ্য নেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে। বেশিরভাগ শর্ত পূরণ ছাড়াই এ পর্যন্ত ১৪ লাখের বেশি লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ৬৪ জেলায় চোখের দেখায় লাইসেন্স সনদ পাচ্ছেন চালকরা। অনেকক্ষেত্রে প্রশিক্ষক ও ডাক্তারের সার্টিফিকেট নকল করে মিলছে বৈধ চালকের সনদ। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ওস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে এমন চালকের সংখ্যাই বেশি। অনুমোদিত শতাধিক ড্রাইভিং স্কুলের কোন তদারকি নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের বিরুদ্ধে নেই কঠোর আইন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ৬১ ভাগ চালক কোন রকম পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স পাচ্ছেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ৯১ ভাগ চলক।
গত সোমবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ভাড়ায় চালিত একটি বাসের চাপায় টিটু নামে বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্র নিহত হয়েছেন। একই দিন রাজধানীর মৌচাকে বাস চাপায় নিহত হন একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল কাঞ্চন। শনিবার রাতে কারওয়ানবাজারে বাস চাপায় মারা গেছেন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জগ্লুল আহমেদ চৌধূরী।
পরবর্তীতে ঘাতক চালকদের হাতে কার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে কেউ জানে না। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় কম মায়ের বুক খালি হয়েছে এর কোন হিসেব নেই। কতজন স্বজন হারিয়েছেন, কত বাবা নিভৃতে চোখের পানি ফেলছেন কে জানে। হাতের মেহেদি না মুছতেই অসংখ্য স্ত্রী স্বামীহারা হয়েছেন শুধু বেপরোয়া চালকদের কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে তিন ধরনের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সকল শর্ত পূরণ করতে হবে। সঠিক পদ্ধতি মেনে লাইসেন্স দেয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বাড়াতে হবে শাস্তি। শিক্ষিতদের আনতে হবে চালকের পেশায়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তাঁরা। চালকদের মধ্যে একটি বড় অংশই নেশাগ্রস্ত। মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে গাড়ি চালানো ও নেশা করার কারণে রাজপথে চালকরা অনেক সময় বেপরোয়া।
১৯৯০-২০১১ সাল পর্যন্ত শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পেশাদার চালককে লাইসেন্স দেয়া হয় যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই। সারাদেশে লাইসেন্স আছে ১৪ লাখ ৩১ হাজার। এর মধ্যে পেশাদার লাইসেন্স প্রায় ৭ লাখ। এই পেশাদার ৭ লাখের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ভারি যানবাহন, অর্থাৎ বাস, ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানের চালক। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে। এরপরই নেপালসহ আফ্রিকার দেশগুলোয়। মামলায় সাজার দিক থেকে শতকরা ৮৩ ভাগ আসামিই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না বেশিরভাগ মামলা। বিচার শুরুর আগেই আপোসরফা হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার মামলার ফৌজদারি আইনে সর্বোচ্চ দ- তিন বছর। অপরাধ জামিনযোগ্য! এমনকি আপোসযোগ্যও। দুর্ঘটনার পর একটি গাড়ি আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। মোটরযান অধ্যাদেশ আইনে সর্বোচ্চ কারাদ- চার মাসসহ জরিমানা ৫শ’ টাকা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা আট লাখ ৩৫ হাজার ৮১২। চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত মোট পরিবহনের সংখ্যা ২১ লাখ পাঁচ হাজার ১৪০। দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি! সরকারী তালিকাভুক্ত যানের সংখ্যা ২১ লাখের কিছু বেশি। ১৯ লাখ অবৈধ। এর মধ্যে ফিটনেস ছাড়াই চলছে তিন লক্ষাধিক যানবাহন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৩ লাখ। সরকারী হিসাব অনুযায়ী সাত লাখ অবৈধ চালক রেজিস্ট্রেশনভুক্ত যান চালাচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেশে অবৈধ চালকের সংখ্যা ৩৩ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ অবৈধ চালক আর পরিবহনের দখলে দেশের ৩৬১ রুট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫ নিরীহ যাত্রী প্রাণ হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটি বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। যার একটিও সরকারীভাবে অনুমোদিত নয়। ৩ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে দিয়ে কোন অবস্থাতেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সক্ষম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৬টি যানবাহন প্রতিবছর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ছে। এই পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬৯ জন। এ দেশের ২ শতাংশ জিডিপি ক্ষতি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে।
গোড়ায় গলদ ॥ চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সচিব মুহাম্মদ শওকত আলী জনকণ্ঠ’কে বলেন, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি চালকদের লাইসেন্স দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে চালকদের লিখিত, মৌখিকসহ ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য পাঁচ কিলোমিটার মাঠ, রাস্তা, যান সঙ্কটসহ মেকানিক্যাল কোন ব্যবস্থা নেই। নিজস্ব যান না থাকায় চালকের দক্ষতা নিরূপণের ব্যবস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তিনি বলেন, প্রতিটি কমিটিতে একজন ডাক্তার থাকেন চালকের চক্ষুসহ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য। চালক রং, ট্রাফিক সাইন, রাতে চালাতে পারে কিনা এসব বিষয় দেখভাল করেন। বাস্তবে এমন মনিটরিং খুব একটা হয় না। এছাড়াও একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর চালকের সিগন্যাল টেস্ট পরীক্ষা নেন। তা যথাযথ হয় না। তিনি বলেন, চালকরা সকল নিয়ম-কানুন বা শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স পেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সকল শর্ত পূরণ করে চালকদের লাইসেন্স দিতে ব্যর্থ হচ্ছি।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন চালককে ওয়ার্নিং সাইন, ইনফরমেশন সাইন, রুট সাইন, রুট মার্কিং, সাপ্লিমেন্টারি প্লেটস, ট্রাফিক সাইন, বাধ্যতামূলক সাইন চেনা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে চালকদের অনেকেই আছেন এর কোন কিছুই জানেন না। চোখের দেখা ও আন্দাজের ওপর গাড়ি চালান।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জনকণ্ঠ’কে বলেন, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান ও ওস্তাদের কাছ থেকে ড্রাইভিং শিখে বেশিরভাগ চালক লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছেন। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রাইভিং শেখার পর বিআরটিএ থেকে চালকদের লাইসেন্স পাওয়ার নজির খুবই কম। তিনি বলেন, ওস্তাদের কাছ থেকে ড্রাইভিং শেখার পর সেই চালক কোনভাবেই গাড়ি চালানোর প্রকৃত নিয়ম-কানুন আয়ত্ত করতে পারবেন না। এটাই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে তাদের আচরণও শেখানো হয় না। নিসচার পক্ষ থেকে দেশের ৬৪ জেলায় আধুনিক চালক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করতে অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকা চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি।
তিনি বলেন, অশিক্ষিত ওস্তাদ বেশিরভাগ সাগরেদকে ড্রাইভিং শেখাচ্ছেন। এরপর তারা দিব্যি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামছেন। পৃথিবীর কোথাও এমন চিত্র নেই। ওস্তাদের পাশে বসে অবৈজ্ঞানিকভাবে শেখার কারণে চালকদের বাঁকা হয়ে বসতে হয়। পরবর্তীতে একজন চালক জীবনভর বাঁকা হয়ে বসে গাড়ি চালান। এটাও দুর্ঘটনার কারণ। তিনি বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন চালকরা জমা পদ্ধতিতে গাড়ি চালান। অর্থাৎ দিনে একটি নির্দিষ্ট টাকা মালিকদের দিতে হবে এমন চুক্তিতে চলছে যানবাহন। জ্যামে বসে থাকার পর রাস্তা স্বাভাবিক হলে বেপরোয়া গাড়ি টানেন চালকরা। ফলে দুর্ঘটনা বেশি হয়। বেশি বেতনে শিক্ষিত লোকদের চালকের পেশায় আনতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে শিক্ষিত ও বেকার তরুণদের চালকের পেশায় আনতে সড়ক অনেকটাই নিরাপদ হবে বলে মনে করেন তিনি।

লাইসেন্স পাওয়ার নিয়ম
শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স ॥ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হলো শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স। বয়সের প্রমাণপত্র, স্কুল সার্টিফিকেট/পাসপোর্ট/জন্ম নিবন্ধন সনদ/জাতীয় পরিচয়পত্র সত্যায়িত অনুলিপি (আবেদনের তারিখে প্রার্থীর বয়স পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর এবং অপেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে)। এছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র/ পাসপোর্ট/সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদের সার্টিফিকেটের সত্যায়িত অনুলিপি।
ঠিকানার যাচাইপত্র হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র/পাসপোর্ট/ পানি/ গ্যাস/ বিদ্যুত/টেলিফোন বিলের সত্যায়িত অনুলিপি। রেজিস্টার্ড ডাক্তার কর্তৃক আবেদনকারীর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ নির্ধারিত ফরমে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। তিন কপি স্ট্যাম্প সাইজের রঙিন ছবি, নির্ধারিত ফি : এক. ক্যাটাগরি-৩৪৫/- টাকা ও দুই. ক্যাটাগরি-৫১৮/-টাকা জমা দেয়া, আবেদনপত্র, ফি জমা রসিদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাইসেন্সিং অথরিটি বরাবর দাখিলের পর প্রার্থীকে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট অফিস হতে তিন মাাসের জন্য শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এই লাইসেন্সে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার মান, তারিখ ও সময় উল্লেখ থাকে।
ব্র্যাকের চালক প্রশিক্ষক মোঃ নুরুন্নবী শিমু জনকণ্ঠ’কে বলেন, চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নিয়ম-কানুন যা আছে তা পর্যাপ্ত। কিন্তু এর বাস্তবায়ন না হচ্ছে না। একজন দক্ষ চালক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারী সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, ১৮ বছর বয়স হলেও যে কেউ শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। নিয়মানুযায়ী ডাক্তারী পরীক্ষার পর তার লাইসেন্স পাওয়ার কথা। বাস্তবে যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া ডাক্তারী সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। তিনি বলেন, শিক্ষানবিস চালকরা দুইমাস পর পেশাদার চালকের জন্য আবেদন করতে পারেন। এরপর লার্নার দেয়ার দুইমাস পর চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন একজন চালক। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির তেমন একটা বালাই নেই। সঠিক নিয়মে লাইসেন্স দেয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স ॥ প্রার্থীকে শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্সে উল্লিখিত তারিখ ও সময়ে নির্ধারিত পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর কৃতকার্য হলে মৌখিক পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। কৃতকার্য প্রার্থীকে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স (যেখানে পরীক্ষা পাসের রেকর্ড রয়েছে)। পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানার পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন। উপরোক্ত কাগজপত্র ও প্রযোজ্য ফিসহ সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং অথরিটি বরাবর আবেদন দাখিলের পর আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক্স (ডিজিটাল ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আঙ্গুলের ছাপ) গ্রহণ করে প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ প্রদান করা হয়।
পুলিশ সার্জেন্ট ও চালক প্রশিক্ষক নূরুল মোমেন জনকণ্ঠ’কে বলেন, কোন চালককে শেখানোর সময় প্রশিক্ষকের নাম ঠিকানাসহ ফরম পূরণ করতে হয়। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষকের স্বাক্ষরসহ কাগজপত্র দাখিল করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যারা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন তাদের ফরমে প্রকৃত প্রশিক্ষকদের নাম ঠিকানা ও স্বাক্ষর থাকে না। তাদের পক্ষে কারা সই করেন কেউ জানে না। এই প্রেক্ষাপটে একজন চালক কোনভাবেই বৈধ লাইসেন্স পেতে পারে না। তিনি বলেন, বৈধ প্রশিক্ষকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে গেলে বিআরটিএ লাইসেন্স দিতে গড়িমসি করে এমন অভিযোগও আছে চালকদের। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সঠিকভাবে লাইসেন্স দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্ঘটনায় দোষীদের সাজা ৭ বছর ॥ সামরিক শাসক এরশাদের আমলে দ-বিধি সংশোধন করে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। চলতি বছরের ২০ অক্টোবরের রায়ে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় দোষ প্রমাণিত হলে আগের মতোই সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদ-ের বিধান বহাল হবে। রায়ে বলা হয়, এই সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৮৫ সালে তখনকার এরশাদ সরকার দ-বিধির ৩০৪ (বি) ধারা সংশোধন করে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর কারাদ- থেকে কমিয়ে তিন বছর করে। শুনানিতে মনজিল মোরশেদ বলেন, সাজার মেয়াদ কমানোর কারণে সড়কে নাগরিকদের জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংশোধনী সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনায় চালকের দায় প্রমাণিত হলে ১০ বছরের বেশি কারাদ-ের বিধান রয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, এর ফলে সেখানে দুর্ঘটনা কম হয়। আমেরিকায় বিভিন্ন প্রদেশে দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ ৯৯ বছর পর্যন্ত দ-ের বিধান আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সাজার পরিমাণ কম হওয়ায় সড়ক নিরাপদ নয়। সাজার মেয়াদ বাড়ানো দরকার।