মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৮ ভাদ্র ১৪২১
একটু আগেই কি ঘটে গেল দুর্ঘটনা!
মুহাম্মদ ইব্রাহীম সুজন ॥ রাস্তার পাশের সড়কদ্বীপে একটি সাদা মাইক্রোবাসের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়েছিটিয়ে। পাশেই পড়ে আছে, মাইক্রোবাসটির কয়েকটি চাকা। ইঞ্জিন, তেলের ট্যাংক, সিটগুলো দুমড়ে-মুচড়ে এলোপাথাড়ি পড়ে আছে। দেখলে মনে হয়, একটু আগেই ঘটে গেছে কোন বড় সড়ক দুর্ঘটনা। স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনীরের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৈরি করা হয়েছে ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ স্মৃতিস্থাপনা। সেখানে প্রয়াতদের দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটির ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এভাবেই। শিল্পী ঢালী আল মামুনের পরিকল্পনায়, ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগিতায় এবং শিল্পী সালাউদ্দিন আহমেদের নক্সায় এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করেছে তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় এই দুই মেধাবীসহ মোট পাঁচজন প্রাণ হারান। তারেক মাসুদ এবং মিশুক মুনীরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিস্থাপনা উৎসর্গ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত অসংখ্য মানুষসহ বাংলাদেশের প্রাণঘাতী পরিবহন খাতের শহীদদের উদ্দেশ্যে। সোমবার দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) অদূরে শামসুন নাহার হলের সামনে অবস্থিত সড়কদ্বীপের ওপর নির্মিত এই ‘স্মৃতিস্থাপনার’ উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সভাপতিত্বে এবং রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মিশুক মুনীরের ভাই ড. আসিফ মুনীর, শিল্পী ঢালি আল মামুন, তারেক মাসুদের সহধর্মিণী এবং তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ক্যাথরিন মাসুদ, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, নারীনেত্রী খুশি কবীর, হামিদা হোসেন, ব্র্যাকের সিনিয়র ডিরেক্টর আসিফ সালেহ, ঢাবি শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ এমএম আকাশ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক প্রমুখ।
উদ্বোধন করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট, গাড়ি, যানবাহন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনাও আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাস্তায় মানুষের মৃত্যুর এই মিছিল বন্ধ হতে হবে। এই ‘স্মৃতিস্থাপনা’ দেখে যেন প্রতিটি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ভয়াবহতা সম্পর্কে বুঝতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে।
তিনি বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমাদের দেশে যে অভিযান শুরু হয়েছে, এই অভিযানে আমাদের সফল হতেই হবে। এজন্য নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সচেতন হতে অন্যকে জানাতে হবে।
তারেক মাসুদের সহধর্মিণী এবং তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, এই ভাবনার পেছনে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বিধ্বস্ত এই গাড়িটি দেখার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে সচেতনতার প্রসার ঘটবে। বাংলাদেশের উচ্চহারের সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে নীতি, আইন ও অবকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে এই স্থাপনা বৃহত্তর কোন আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, এই স্মৃতিস্থাপনার নির্মাণ চূড়ান্ত করার গৌরবের মধ্যে মিশে আছে এর মধ্য দিয়ে হারানোর বেদনা। আমাদের ট্র্যাজেডি যেভাবে একটি রূপান্তর-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পকলায় উত্তীর্ণ হয়েছে, আমাদের প্রত্যাশা, নগরীর কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত এই শিল্পকর্মটিও জনসচেতনতার গভীরে এক রূপান্তরকামী শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যাবে।
ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিরেক্টর আসিফ সালেহ বলেন, যে স্মৃতিসৌধ এখানে তৈরি করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য কেবল তিন বছর আগের সেই ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করা নয়, এর আসল উদ্দেশ্য সবাইকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়া যে, সড়ক দুর্ঘটনায় যে মৃত্যু, তা নিছকই অপ্রয়োজনীয়।
তিনি আরও বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সর্বমোট রাস্তা রয়েছে ২১ হাজার ৬৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটে ৫৭ কিলোমিটার রাস্তায়। অর্থাৎ এই ৫৭ কি.মি. রাস্তার সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের সেই মৃত্যুর ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাদের বন্ধু, পরিবার ও স্বজনদের তাড়া করে বেড়ায়। সেই খ-িত-বিখ-িত মাইক্রোবাসটি দিয়ে তৈরি এই স্মৃতিস্থাপনা সবাইকে অবশ্যই ভাবতে বাধ্য করাবে।