মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
যে ভাবে কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো
মশিউর রহমান খান ॥ বৃহস্পতিবার রাতে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে কিছুটা বিমর্ষ হয়ে যান যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা। ওই রাতে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা শেষবারের মতো দেখা করতে কারাগারে যান। কারাগারের কনডেম সেলে একটি মোড়াতে বসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই শেষবারের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলেন বলে সূত্র জানায়। তাঁরা বেরিয়ে আসার পর পরই কাদের মোল্লাকে কারা কর্তৃপক্ষ জানান, আজ বৃহস্পতিবার রাতেই আপনার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে। আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। ফাঁসির কথা শোনার পর তিনি বিচলিত হননি কিংবা তাঁকে চিন্তিত মনে হয়নি। রাত সাড়ে ৮টায় গোলাপজল মিশ্রিত গরম পানি ও সাবান দিয়ে কাদের মোল্লাকে গোসল করানো হয়। পরে কারা কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লার কাছে রাতের খাবার সরবরাহ করেন। খাবারের মেন্যুতে ছিল ভাত, গরুর গোশত, মুরগির গোশত এবং তিন প্রকারের সবজি। রাতের খাবার খেয়ে নামাজ আদায় করে কোরান তিলাওয়াত করেন। ৯টা ৩৩ মিনিটে কনডেম সেলে কারা মসজিদের ইমাম তাঁকে তওবা পড়ান ও তাঁকে নিয়ে মোনাজাত করেন। এ সময় কাদের মোল্লা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। সেলের বাইরে সিনিয়র জেল সুপার, জেলার ও অন্যান্য কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী কাদের মোল্লার কাছে তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে এ ব্যাপারে হ্যাঁ বা না কোন উত্তর দেননি। এর আগে কারারক্ষীদের কাছে তিনি স্বাভাবিকভাবে তাঁর লাশটি গ্রামের বাড়িতে মায়ের কবরের পাশে কবর দেয়ার অনুরোধ করেন।
পরে কাদের মোল্লাকে দুই জল্লাদ কনডেম সেল থেকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে যমটুপি পরিয়ে দেন। এ সময় কাদের মোল্লা মাথায় থাকা আগের টুপি খুলতে রাজি না হলেও নিয়মানুযায়ী তা খুলে যমটুপি পরানো হয়। কনডেম সেল থেকে কয়েক শ’ মিটার দূরত্বের রাস্তা ফাঁসির মঞ্চ। যমটুপি পরা অবস্থায় কাদের মোল্লাকে দুই সহযোগী জল্লাদ দুদিক দিয়ে ধরে এবং পেছন থেকে প্রধান জল্লাদ শাজাহান তাঁকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে আসেন।
মঞ্চে তোলার আগে কাদের মোল্লা কয়েকবার সুপার সাহেব কোথায় বলে জেল সুপারকে ডেকে খুঁজতে থাকেন। পরে জেল সুপার এই তো আমি আছি বললে কাদের মোল্লা শান্ত হন। যখন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয় তখনও তিনি কোন প্রকার জোর করেননি। তিনি নিজেই ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। এর আগে মঞ্চের পাশে কর্পুর, গোলাপজলসহ কাফনের কাপড়, কফিন প্রস্তুত রাখা হয়।
৯টা ৫৭ মিনিটে তাঁকে ধরে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। এ সময় তাঁর পা বাঁধার জন্য দুই পা এক করতে চাইলেও তা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন জেল সুপার কাদের মোল্লাকে পা দুটো এক করতে বললে তিনি তা এক করেন। তখন কাদের মোল্লা হঠাৎ করে বলে ওঠেন সুপার সাহেব আমার একটা বক্তব্য আছে বলে। ততক্ষণে ফাঁসি কার্যকরের সময় হয়ে যায় বিধায় তা শোনা সম্ভব হয় না। ঠিক ১০টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকরের পর ১৭ মিনিট ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা লাশের ময়নাতদন্ত করে ফাঁসি কার্যকরের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হন। এর পর রাত ১১টা ১৪ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষে ডেপুটি জেলার আশরাফ ও র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির সহায়তায় কাদের মোল্লার লাশবাহী গাড়িটি তাঁর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে পৌঁছে দেয়া হয়।