মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
চিকন আলী থেকেই মৃত্যুদণ্ড, কাদের মোল্লার কার্যকর
বিকাশ দত্ত ॥ শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধীদেরই দণ্ড নয় এর আগে এ জাতীয় অপরাধ করার জন্য দালাল আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাজাকার চিকন আলীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়েছিল। সে অর্থে বলা যায় এ পর্যন্ত চিকন আলী থেকে ট্রাইব্যুনাল ১০ জনকে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যদিও চিকন আলীর বিচারটি ছিল দালাল আইনের বিচার। অন্যদিকে নুরেনবার্গ ট্রায়াল থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যেখানে এই ধরনের অপরাধীর বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছিল আর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের। এক কথায় বলা যায় বিশ্বে যেখানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেখানেই তাদের বিচার হয়েছে। বিচারে তাদের দণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সে দিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে সব অপরাধীর বিচার হচ্ছে তারা আপীল করাসহ শর্তাধীনে জামিন, দিনের পর দিন জেরা করার সুযোগ পেয়েছে। যা নুরেনবার্গ ট্রাইব্যুনালেও এ সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়নি। সে দিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতা বিরোধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর পর আসামির সংখ্যা বৃদ্ধি ও মামলা নিরপেক্ষভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ২০১২ সালের মার্চ মাসে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে ২৯টি মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৯টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর করাও হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে ৬টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে ৮টি মামলার বিচার কাজ চলছে। তদন্ত সংস্থা জামায়াতসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আপীল বিভাগে প্রথম পর্যায়ে শুনানি হচ্ছে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার। তার মামলার শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি করা হবে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার জন্য মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলাটি সিএভি রাখা হয়েছে যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। নবেম্বরের ১৩ তারিখে বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখা হয়। এর পর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেনের মামলটিও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তার মামলা এখন সাফাই সাক্ষীর জন্য রবিবার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সাফাই সাক্ষী ও যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করা হবে। এর পর রয়েছে বিএনপি নেতা খোকন রাজাকার ও জামায়াত নেতা একেএম ইউসুফ।
কাদের মোল্লার রায় কার্যকর প্রসঙ্গে সুপীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ শম রেজাউল করিম বলেছেন, কাদের মোল্লাই নয় ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালে এ জাতীয় অপরাধ করার জন্য দালাল আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চিকন আলীর সাজা হয়। কেউ যে আইনের উর্ধে নয় অনেক বিলম্বে হলেও আইনের আমলে আসতে হয় তার জলন্ত প্রমাণ এই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্তদের দ- দেয়া থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, অপরাধ করে দায় মুক্তির সংস্কৃতি কখনই যে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা যায় না। তাও কাদের মোল্লার দ- কার্যকরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো।
চিকন আলীকে মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। যদিও তা কার্যকর হয়নি। উল্লেখ্য, কুষ্টিয়ার দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত রাজাকার চিকন আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির আদেশ দেন। আসামি চিকন আলীকে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ দালাল আদেশের ১১(ক) ধারার সঙ্গে গঠিত ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারা মতে দ- দান করা হয়। দালাল আদেশের অধীনে এটা দেশের প্রথম দ-। মামলার বিবরণে প্রকাশ, মিরপুর গ্রামের অধিবাসী আসামি চিকন আলী বাংলাদেশ দখলদার আমলে রাজাকারে ভর্তি হয় এবং হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও মহিলাদের শ্লীলতাহানি কাজে অংশগ্রহণ করে। গণহত্যাসহ অন্য ধরনের অপরাধমূলক কাজে সে সক্রিয়ভাবে পাকবাহিনীর দালালি করে। আসামি ১৯৭১ সালে তার গ্রামের জনৈক কামাল উদ্দিন ম-লকে ডেকে নিয়ে বলে যে সে (চিকন আলী) ইয়াজুদ্দীনের বাড়ি থেকে দুলালী বেগমকে অপহরণ করতে চায়। উল্লেখ্য, যে আবদুল গফুরের কন্যা দুলালী বেগমকে দখলদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইয়াজুদ্দিনের গৃহে রাখা হয়েছিল। তার পর চিকন আলী ইয়াজুদ্দিনের গৃহে গিয়ে দুলালী বেগমকে তার কাছে দিতে বলে। কিন্তু ইয়াজুদ্দিন অস্বীকার করলে তাকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই জজ আসামিকে একই মামলায় দালাল আদেশ ১১(খ) ধারার সঙ্গে ফৌজদারি আইনের ১২১ ধারা মতে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে ইতোমধ্যে তাকে মৃতুদ- দেয়ার ফলে পৃথক কোন দ- দেয়া হয়নি।
এর আগে দালাল আইনে অনেকের দ- প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চেয়েছিলেন। প্রথম পর্যায় দালাল আইনে এদের বিচার হয়। তখন ১১ হাজার দালাল আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচারে ২২ জনের মৃতুদ-, ৬৮ জনের যাবজ্জীবন ও ৭০০ জনকে বিভিন্ন দ-ে দ-িত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দালালদের বিচার বন্ধ হয়ে যায়।
প্রসিকিউটর রানা দাশ গুপ্ত বলেছেন, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে জামিন, প্যারোলে মুক্তি, আপীল ছিল কিনা তা আমার জানা নেই। তবে আমাদের ট্রাইব্যুনালে আসামিরা দিনের পর দিন জেরা করার সুযোগ পয়েছে। তাদের আপীল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। যে থেকে প্রমাণিত হয় আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ। তিনি আরও বলেন চিকন আলীকে দালাল আইনে বিচার করা হয়েছিল। আর ট্রাইব্যুনালে যে অভিযুক্তদের বিচার করা হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল। এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ।
বাংলাদেশে একমাত্র অভিযুক্ত কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বিচারে আরও ৯ জনকে দ- প্রদান করেছেন। দ-প্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতা রয়েছেন। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদ-, বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ-, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কমারুজ্জামানকে মৃত্যুদ-, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মুত্যুদ-, আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানকে মুত্যুদ-, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃতুদ-, বিএনপির আরেক নেতা আব্দুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদ-ের রায় প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে বাচ্চু রাজাকার, আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খান পলাতক রয়েছে।
নুরেনবার্গ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তির পাশাপাশি ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের বিচার হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে ১) নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব ২) রাইখ সরকারর মন্ত্রীসভা ৩) এসএস ৪) গেস্টাপো ৫) এসডি ৬) এসএ এবং ৭) জার্মান হাই কমান্ড। বিচারে এ সব সংগঠনকে দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং রায়ে এদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নুুরেমবার্গে প্রথম দফায় ২৪ নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছিল। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক আইনজীবী ছিলেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুবালে ৯৯ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়। যাদের অধিকাংশেরই মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। কয়েক যুদ্ধাপরাধী বিচার চলাকালে আত্মহত্যা করেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান শুধু চীনে নয়, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা ও ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশে গণহত্যা, নারীনির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধ্বংসাযজ্ঞ সাধন করে। টোকিও ট্রাইব্যুনালে ক শ্রেণীর ২৮ জন জাপানী যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ শুরু হয়। বিচারকাজ চলাকালে দুজন অভিযুক্ত মৃত্যুবরণ করেন। একজন উন্মাদ হয়ে যান। বাকি ২৫ জনের বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হন। এদের মধ্যে ৭ জনকে শীর্ষ স্থানীয় জাপানী যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। মৃত্যুদ- প্রাপ্তরা হলেন, জেনারেল কেনজি দোইহারা, বারোন কোকি হিরোতা, জেনারেল সোশিরো ইতাগাকি, জেনারেল হেইতারো কিমুরা, জেনারেল আইওয়ানে মাতসুই, জেনারেল আকিরা মুতো, জেনারেল হিদেকি তোজো।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মতো এখানেও সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। ১৮ আগস্ট থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী সংস্থার প্রধান এমএ হান্নান খান বলেছেন, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ও তদন্ত করা হচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্ত করে যাচ্ছে। তিনি বলেন আমি আশা করছি ডিসেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে ‘অপরাধী সংগঠন’ (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ট্রাইব্যুনাল তার রায়গুলোর পর্য্যবেক্ষণে বলেছেন, আলবদর হলো জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র গ্রুপ। আলবদর গঠিত হয়েছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের দ্বারা। জামায়াতে ইসলামী মিলিটারিদের কার্য্যক্রমে সাহায্য করার জন্যে ২টি শাখা গঠন করে। সুতরাং ঐতিহাসিকভাবে বলা যেতে পারে, জামায়াতে ইসলামী কার্য্যকর ভূমিকা আলবদর, রাজাকার, আলশামস এবং শান্তিকমিটি গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বেসামরিক লোকজন এবং তাদের সম্পদ রক্ষা করার কোন ক্রমেই কোন ভূমিকা রাখেনি। জামায়াতে ইসলামী ২টি প্যারমিলিটারি ইউনিট গঠন করে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার রাজাকার রিক্রুট করা হয়। জামায়াতে ইসলামী আলবদরের দ্বারা সংগঠিত হত্যা, নির্যাতনের দায় এড়াতে পারে না। যদিও জামায়াত বলত যে, তাদের মানবিকতা এগুলো মহান ধর্ম ইসলামের জন্যে। এর পর তদন্ত সংস্থা জামায়াতের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করে।
সূত্র মতে, নুরেমবার্গ ট্রায়াল, টোকিও ট্রায়াল, ইয়ামাশিতা ট্রায়াল থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কারণ এখানে আসামিরা শর্ত সাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন, তাদের আপীল করার সুযোগ দেয়া হযেছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে তারা ট্রাইব্যুনালে কথা বলতে পারছেন। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী না থাকলে রাষ্ট্রের খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।