মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবার ভিন্নমাত্রায়
উত্তম চক্রবর্তী ॥ আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/ একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ/’... কিংবা ‘একঝাঁক ঝাঁ ঝাঁ বুলেট তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করুক/ এমন সহজ শাস্তি আমি কামনা করি না তাদের জন্য ...।’
দেশের প্রধান কবি মরহুম শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্য সন্তানদের হন্তারক দেশদ্রোহী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের শাস্তি কামনা করেছেন। দেশের প্রধান কবির দেশদ্রোহীদের সেই শাস্তির দাবি স্বাধীনতার ৪২ বছর পর হলেও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যায়নি। বুদ্ধিজীবী হন্তারক কুখ্যাত কসাইখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার মাধ্যমে দায়মোচনের শুভসূচনা করেছে বর্তমান সরকার। কারাগারের ফাঁসির সেলে মৃত্যুর দিন গুনছে অন্য রাজাকার শিরোমনিরা। এসব দেশদ্রোহীদের মৃত্যুদ- কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
তাই আজ বুদ্ধিজীবী দিবসে একাত্তরের শহীদ ও সংশ্লিষ্ট পরিবারে আজ স্বস্তি ও প্রশান্তির হাসি। ৪২ বছর ধরে পিতৃ-মাতৃহন্তারকদের আস্ফালন দেখে যে একবুক ব্যথা-বেদনা ও কষ্ট নিয়ে তাঁদের পথ চলতে হয়েছে, কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবার এক অন্য ধরনের পরিবেশে শ্রদ্ধা জানাবেন শহীদ প্রিয়জনদের। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে নির্বাচনী ওয়াদা আওয়ামী লীগ করেছিল, শত ষড়যন্ত্রের কুহেলিকা ভেদ করে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে সেই ওয়াদাও বাস্তবায়ন শুরু করেছে তাঁরা। আর এই রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিছুটা হলেও পাপ ধুয়ে নিল বাংলাদেশ। দীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়ানো পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির পথে হাঁটাও শুরু হলো।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে সামনে রেখে শহীদ ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যরা আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে শুধু তাঁদের পরিবারের শহীদ সদস্যরাই নন, ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ শহীদের আত্মা শান্তি পেল। দেশ ও জাতি দায়মুক্তির পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। এমন শাস্তি দেখার জন্য ৪২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর এতদিনের কষ্ট-যন্ত্রণার কিছুটা হলেও উপশম হয়েছে। এখন আমাদের একটাই দাবি, মৃত্যুদ- প্রাপ্ত সব বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হোক।
আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা এক দিন। বাঙালীর মেধা-মনন-মনিষা শক্তি হারানোর দিন আজ। ইতিহাসের পাতায় কালো আক্ষরে উৎকীর্ণ বেদনা বিধূর কালবেলা। স্বাধীনতার ৪২ বছর ধরে গোটা জাতি দাবি করেছে- ঘৃণ্য নরপশু বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেয়া হোক। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে শত ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে এক গণহত্যাকারী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছে। তাই এবার এক ভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে জাতি পালন করছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।
শুধু একাত্তরে কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। ক’জন রাজাকার শিরোমনি শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালত। তবে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মরিয়া স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার দল বলে দাবিদার বিএনপিও। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই জঙ্গী গোষ্ঠীর দেশব্যাপী তা-ব ও সহিংস রূপ প্রত্যক্ষ করছে দেশবাসী। বসে নেই স্বাধীনতাকামী মানুষ, একাত্তরের মতোই কারা জেগে উঠতে শুরু করেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছে। খোদ সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, যতই যড়যন্ত্র হোক, সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হবে।
একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী।
এঁদের মধ্যে রয়েছেন- ড. জিসি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য. ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দিন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আনম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নতুন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হাবিুবর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ অনেকে।
যথাযোগ্য মর্যাদা শোকের আবহে আজ শনিবার পালিত হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এ উপলক্ষে রায়ের বাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তান এলাকায় নেয়া হয়েছে নিñির্দ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়েছে নানা কর্মসূচী। এর মধ্যে রয়েছে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনাসভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
কর্মসূচী ॥ যথাযোগ্য মর্যাদায় ও শোকের আবহে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচী। জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- আজ সকাল ৭টায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাগণ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন জানাবেন। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধেও শ্রদ্ধার্র্ঘ্য অর্পণ করবেন।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- ভোরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশের দলীয় সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৮টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, সকাল ৭টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, সাড়ে ৭টায় ধানম-ির বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি, ৮টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনাসভা। সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণফোরাম, জাতীয় পার্টি (জেপি), সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ অজস্র সংগঠন বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচী।
চট্টগ্রামে ব্যাপক আয়োজন ॥ চট্টগ্রাম অফিস জানায়, আলোচনাসভা, আলোক প্রজ্জ্বলন, শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় আজ শনিবার চট্টগ্রামে পালিত হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এ উপলক্ষে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে গৃহীত হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচী। ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো নিজ নিজ ব্যানারে কর্মসূচী পালন করবে। এরমধ্যে রয়েছে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনাসভা।