মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
জুমার পর ফকিরাপুল এলাকায় শিবিরের আকস্মিক তাণ্ডব
০ মহিলা শিশুসহ ১২ গুলিবিদ্ধ, আহত ২০ ॥ আটক ৫
০ নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর আগুন
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘মিরপুরের কসাই’ যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ব্যাপক তা-ব চালায় জামায়াত-শিবির। শুক্রবার জুমার নামাজের পর শিবির ক্যাডাররা মুসল্লির ছদ্মবেশে রামপুরা, মালিবাগ, ফকিরাপুল, মতিঝিল এজিবি কলোনি, আইডিয়াল স্কুল, পল্টনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। রাজপথে চালায় ব্যাপক তা-ব। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রেস জ্যাকেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে রাস্তায় নামে শিবির ক্যাডাররা। তাদের সবার হাতে ছিল লাঠি, বোতলে পেট্রোল বোমা ও ককটেল। বিভিন্ন গলির মুখ থেকে বের হয়ে শিবিরের জঙ্গী ক্যাডাররা ‘আল্লাহ আকবর’ বলে রাস্তায় দাঁড়ানো প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ প্রায় ২০টি যানবাহনে নির্বিচারে ভাংচুর চালায়, আগুন ধরিয়ে দেয়। আকস্মিক এ ঘটনায় লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এ সময় তারা ফুটপাথের দোকান ও কয়েকটি রিক্সায়ও আগুন দেয়। তারা দফায় দফায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে এ তা-ব চালায়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শিবিরকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাল্টা ককটেল, পেট্রোল বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আধাঘণ্টার এ সংঘর্ষে মহিলা ও শিশুসহ ১২ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ২০ জন আহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, মতিঝিল ও ফকিরাপুলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাঁচ শিবিরকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পর পরই মতিঝিল এজিবি কলোনি ও আরামবাগ এলাকায় জামায়াত-শিবির জঙ্গী মিছিল বের করে। এ সময় তারা প্রধান সড়কের পাশে এজিবি কলোনি ও আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজসংলগ্ন দুই গলির প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ প্রায় ১৫ যানবাহন পুড়িয়ে দেয়। এ সময় সেখানে কয়েকটি রিক্সায় আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গলির মুখ থেকে বেরিয়ে শিবিরকর্মীরা ‘আল্লাহ আকবর’ বলে হাতে লাঠি, ককটেল ও পেট্রোল বোমা হামলা চালায়। এ সময় শিবিরকর্মীরা আইডিয়াল স্কুলের সামনে শিক্ষার্থী অভিভাবকদের রাখা কয়েকটি প্রাইভেটকারে ভাংচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। অবরোধের কারণে ৬ দিন রাজধানীর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হয়নি। এ কারণে এ দিন মতিঝিল আইডিয়ালে স্থগিত পরীক্ষা চলছিল। কয়েক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক জানান, স্কুল থেকে বের হয়ে তারা শিবিরের তা-বের মুখে পড়েন। শিক্ষার্থী ফেরদৌস আরা রুমা জানায়, জামায়াতকর্মীদের আগুন থেকে তার গাড়িও রক্ষা পায়নি। গাড়িচালক আলমগীর হোসেন জানান, পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজার পর গাড়ি নিয়ে স্কুলের সামনে এগোনোর সময় জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল আসতে দেখে তিনি গাড়ি নিয়ে একপাশে নিরাপদ স্থানে সরে যান। এ সময় মিছিলকারীরা তাঁর গাড়িও ভাংচুর শুরু করলে তিনি কোনরকমে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এর পর মিছিলকারীরা তাদের প্রাইভেটকারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের দমকলকর্মীরা এসে এখানে আগুন ধরে যাওয়া কয়েকটি যানবাহনের আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পাশাপাশি পুলিশের জলকামানের পানি ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। চালক আলমগীর সাংবাদিকদের আরও জানান, জুমার নামাজের পর পর একদল লোক লাঠিসোটা ও হাতে পেট্রোলভর্তি বোতল নিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ সেøাগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে যানবাহন ভাংচুর ও আগুন দিতে থাকে। এ সময় তারা ৮-১০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। তাদের হাতে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র দেখেছেন অনেকে। আবার পিকআপভ্যানে লাঠিসোটা আনে তারা। স্থানীয় দোকানদাররা জানান, তারা এজিবি কলোনির মোড়ে দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের সামনেই একটি ভ্যান ও পাঁচটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। মিছিলকারীদের হাতে লাঠিসোটা ও পেট্রোলভর্তি বোতল ছিল। একপর্যায়ে তারা গলিতে হলিডে মার্কেটে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পাশের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়েও আগুন দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মতিঝিল এজিবি কলোনির মুখ থেকে বের হয়ে শিবিরকর্মীরা হলিডে মার্কেটে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। হলিডে মার্কেটের কয়েক দোকানদার জানান, নামাজের পর পরই ওই দুই গলি দিয়ে জামায়াত-শিবিরের দুটি মিছিল আসে এবং ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার দিয়েই ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এ সময় একের পর এক ককটেল ও পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াতকর্মীরা সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রাইভেটকার, রিক্সা ও ভ্যানে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়। এমনকি ফুটপাথের কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। দোকানদাররা জানান, মার্কেটের কাছেই পুলিশের একটি টহল দল থাকলেও কয়েক শ’ জামায়াত-শিবিরকর্মীকে এগিয়ে আসতে দেখে তারা পিছু হটে যায়। এর পর আশপাশের এলাকায় প্রায় ২০ মিনিট ধরে তা-ব চালায় মিছিলকারীরা। এ ব্যাপারে মতিঝিল জোনের এডিসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ এসে শটগানের গুলি ছুড়ে জামায়াতকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় সেখানে শহীদুল ইসলাম (৩২), রোমান (২৮) ও শিবলী সাদেক (২৮) নামে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে তাদের শিবির সন্দেহে পুলিশ আটক করে। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আশরাফুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। অবরোধের কারণে টানা ৬ দিন কার্যত অবরুদ্ধ থাকার পর এ দিন অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজে তাদের নিজস্ব যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। জুমার পর দুপুর ২টায় ফকিরাপুল গলি মুখ থেকে জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল প্রধান সড়কে এসে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৫-৬টি গাড়িতে ভাংচুর চালায়। তারা ৪টি প্রাইভেটকারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের ছোররা গুলিতে ১০ বছরের শিশু শান্তা ইসলাম, মামা-ভাগ্নে হোটেলের মালিক আলী হোসেন (৪০), তাঁর ভাগ্নে কিবরিয়া (২৮), রিক্সাচালক নাজমুল (২৫), গার্মেন্টকর্মী শাহানাজ (৩০), ব্যবসায়ী আতিয়ার (২৫), রুমান (২৮), মোঃ ফরিদ (২৬) ফিরোজ আহমেদ (২৮) ও ফরহাদ (৩০) আহত হন।
এদিকে দুপুর পৌনে ২টার দিকে রামপুরা আবুল হোটেলের সামনে প্রেস লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে ও হেলমেট পরে শিবিরকর্মীরা হঠাৎ লাঠিসোটা ও ককটেল বোমা নিয়ে প্রধান সড়কে এসে তা-ব শুরু করে। এ সময় তারা ১৫-২০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাস্তা অবরোধ করে ৬-৭টি গাড়িতে ভাংচুর চালায়। পরে দুটি গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শিবিরকর্মীরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে অলিগলিতে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে ককটেল বিস্ফোরণে ফরহাদ (৩০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মকর্তা আহত হন। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় শাপলা গার্মেন্টকর্মী আমেনা বেগম (৪০) ও রিনা বেগম (৩৫)) গুলিবিদ্ধ হন। রিনার চোখে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল থেকে চক্ষু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। রামপুরা থানার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা জানান, পৌনে ২টার দিকে একদল শিবিরকর্মী প্রেস লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে ও হেলমেট পরে আবুল হোটেলের সামনে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে তারা রাস্তা অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর শুরু করে। এ সময় তারা দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ধাওয়া দিলে শিবিরকর্মীরা গলিতে ঢুকে পড়ে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করতে করতে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সময় খিলগাঁও ও মানিকনগরে সোহাগ পরিবহনের একটি গাড়িতে ভাংচুর চালায় শিবিরকর্মীরা।