মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ৫ অগ্রহায়ন ১৪২০
তারেক খালাসের ‘ভৌতিক রায়’ দিয়ে বিচারক ছুটিতে
এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ॥ দুদক আইনজীবী
জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের মামলায় ‘ভৌতিক রায়’ দিয়ে সোমবার থেকে চার দিনের ছুটি নিয়েছেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোঃ মোতাহার হোসেন। এর মাধ্যমে বিতর্কিত রায়ের রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছেন বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির মামলাসংশ্লিষ্টরা বলেছেন অপর ১২ সাক্ষীসহ এফবিআই এজেন্ট ডেবরার সাক্ষ্য ছিল তারেক রহমানের শাস্তির জন্য যথেষ্ট প্রমাণ। অথচ বিচারক তারেককে খালাস দিয়ে যে রায় দিয়েছেন তা বিস্ময়কর ঘটনা। বিচারক উদ্দেশ্যমূলক রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতিকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হবে বলে জানান মামলার আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন দুদক কমিশনার (তদন্ত) মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রবিবার ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোঃ মোতাহার হোসেন দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা অর্থ পাচার মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের ছেলে তারেক রহমানকে খালাস দিয়ে একই মামলায় তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ৭ বছর কারাদ- ও ৪০ কোটি টাকা অর্থদ- দেয় ঢাকার ৬ নম্বর বিশেষ জজ আদালত।
মামলার তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণ অনুযায়ী রায়ে অসন্তুষ্ট হয় বাদী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন। ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের জুনে ২০ কোটি টাকার অধিক অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরত আনা হয়। এর পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের পরিদর্শক মীর আলিমুজ্জামান তারেক রহমান ও তার বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ঘুষের মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকার অভিযোগ পেশ করেন। এর ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ অনুসন্ধানে সে সময়ের সহকারী পরিচালক বর্তমান উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। তিনি ২০০৯ সালের ২২ জুন অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেন। কমিশনের অনুমতি ক্রমে একই বছরের অক্টোবর মাসের ২৬ তারিখে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি অর্থ পাচার মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৮। মামলাটি তদন্তও করেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি ২০১০ সালের ৩১ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করেন আদালতে। বিচারাধীন অবস্থায় ১৩ সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। এর মধ্যে এফবিআইর তত্ত্বাবধায়নকারী বিশেষ এজেন্ট ডেবরার সাক্ষ্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ পান ফখরুদ্দীন আহমদ, জেনারেল মঈন উ আহমেদ এবং লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীর প্রচেষ্টাই ২০০৮ সালে মার্কিন সরকারের সঙ্গে অর্থ পাচারের তদন্তে যে চুক্তি করেছিলেন সে চুক্তির আলোকে।
২০১১ সালের ১৬ নবেম্বর ঢাকার আদালতে ডেবরা তথ্যপ্রমাণ দাখিল করেছিলেন। টঙ্গীতে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপিত হবে। অভিযোগ হলো, এই কাজ পাইয়ে দিতে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী বন্ধু মামুনকে টাকা দেয়ার। হার্বিন পাওয়ার ইকুইপমেন্ট লিমিটেড চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান। এর স্থানীয় এজেন্ট নির্মাণ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এর চেয়ারপার্সন খাদিজা ইসলাম। আদালতে দেয়া তাঁর বিবৃতির সঙ্গে এফবিআইর এজেন্টের তথ্যগত অমিল নেই। ডেবরা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, ২০০৩ সালের ১৮ আগস্ট খাদিজা মামুনকে টাকা দেন। এই হিসাবের অনুকূলে সিটি ব্যাংক এনএ দুটি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে। প্রথম ভিসা ক্রেডিট কার্ড (৪৫৬৮৮১৭০০০০৬৪১২৪) মামুনের। দ্বিতীয় ক্রেডিট কার্ড (৪৫৬৮৮১৭০১০০৬৪১২২) তারেকের। ডেবরা বলেন, ‘আমি ব্যাংক থেকে তারেকের পাসপোর্টের (ওয়াই০০৮৫৪৮৩) ফটোকপি উদ্ধার করি।’
ডেবরা আদালতে জবানবন্দী দেয়ার সময় উচ্চস্বরে সিঙ্গাপুরের কাগজপত্রে তারেকের বয়ানে তাঁর পিতার নাম ‘মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম’ এবং তাঁর মায়ের নাম ‘বেগম খালেদা জিয়া’ উল্লেখ করেন। ডেবরা বলেন, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তারেক ওই ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ৫০,৬১৩.৯৭ ডলার খরচ করেন। এর সিংহভাগ যে খাদিজারই পাঠানো টাকার অংশ, ডেবরা তাও নির্দিষ্ট করেন। ডেবরা আদালতে ৭৫ মিনিট কথা বলেছিলেন। সাক্ষ্য হিসেবে ৪৩ পৃষ্ঠা এবং অন্যান্য নথি হিসেবে আরও ২২৯ পৃষ্ঠা জমা দিয়েছেন।
এফবিআইর তত্ত্বাবধায়নকারী বিশেষ এজেন্ট ডেবরা। ১৬ বছর ধরে এফবিআইর এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। ফরেনসিক সায়েন্সে স্নাতকোত্তর। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার নিজের দেশে জবানবন্দী দেয়ার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিংয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে বিবেচনা করা হয়।’ ২০০৯ সালের মে মাসে মার্কিন ফেডারেল কোর্ট ষড়যন্ত্রমূলক কর জালিয়াতির দায়ে স্যামুয়েল আর্ল পোপকে ৫১ মাস দ- এবং এলেথিয়া অলিভিয়াকে ৩৭ মাস জেল দিয়েছিলেন। এই মামলার তদন্তকারীদের মধ্যে ডেবরা ছিলেন এবং সে জন্য তিনি প্রশংসিত হন। তার সাক্ষ্য অনুযায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ৭ বছরের কারাদ- হয়। একই সাক্ষ্য অনুযায়ী তারেকের সাজার পরিমাণও একই হওয়া স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন দুদক আইনজীবীরা।
আইনজীবীরা বলেন, রায়ে ২০০৭ সালে দাখিল করা তারেকের একটি সম্পদ বিবরণীর তথ্য টানা হয়। ওই তথ্যের বরাতে তাঁকে খালাস দেয়া হয়েছে বলে দুদকের আইনজীবীরা উল্লেখ করেছেন। আইনবীজীরা বলেন, যে তথ্যের বরাতে তাঁকে (তারেক রহমানকে) খালাস দেয়া হয় সেই বরাতের কারণেই তাঁর সাজা হওয়াটা ছিল আইনের সঠিক দিক। কারণ তাঁর সম্পদ বিবরণীর মাধ্যমে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি ওই টাকা খরচ করেছেন। কারণ হিসেবে আইনজীবীরা বলেন, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকের যে একাউন্ট থেকে তারেক অর্থ ব্যয় করেছেন সেই একাউন্ট ছিল অবৈধ। বিদেশে কোন ব্যাংক হিসাব খুলে টাকা রাখতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। গিয়াস উদ্দিন আল মামুন সে কাজটি করেননি। যার কারণে মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
দুদকের নিয়মানুযায়ী সম্পদ বিবরণীতে অনেকে কালো টাকার উপার্জনও বৈধ আয় হিসেবে দাবি করতে পারেন। এ সুযোগটির অপব্যবহার করা হয়েছে বলে দুদক আইনজীবীরা জানান। তাদের বক্তব্য হচ্ছে একই অপরাধে মামুন দ-িত হলে মামুনের ব্যাংক-বন্ধু কি করে বেকসুর খালাস পেতে পারেন? তারেক মামুনের পাচার করা টাকার অনুকূলে দেয়া ক্রেডিট কার্ডই তো ব্যবহার করেছেন। ওই টাকা তারেক গ্রিসের এথেন্স, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এবং দুবাইয়ে কেনাকাটা ও চিকিৎসায় খরচ করেছেন।
এ বিষয়ে দুদক আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল জনকণ্ঠকে বলেন, তারেক ও মামুনের মামলায় রবিবার আদালত যে রায় দিয়েছে তা তাদের কাছে ভৌতিক রায় মনে হয়েছে। রায়ে বাদী পক্ষ বিস্মিত ও হতবাক মন্তব্য করে তিনি অভিযোগ করেন, বিচারক ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রায় দিয়েছেন। কারণ ডেবরাসহ যে ১৩ সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে কোনভাবে তারেক খালাস পাওয়ার আইনী সুযোগ নেই। মামুন যার শক্তিতে মানিলন্ডারিং করেছেন তারেক হচ্ছে সেই শক্তির উৎস, সে অনুযায়ীও তাকে শাস্তি পেতে হয়। বিচারক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন মন্তব্য করে দুদক আইনজীবী বলেন, ফৌজদারী আইন অনুযায়ী তারা প্রধান বিচারপতিকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানাবেন। তাছাড়া মামলা রায়ের পরের দিন থেকে তিনি আদালতে না এসে আরেকটি রহস্যের সৃষ্টি করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতিবার চার দিনের ছুটি নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
একইভাবে রায়ে বিস্ময় প্রকাশ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশানর (তদন্ত) মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, তাদের কাছে রায় গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তিনি বলেন, দুদক তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইনজীবীরা আদালতের কাছে অভিযোগের পক্ষে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। যা প্রমাণ করে মামলার অপর আসামি গিয়ায় উদ্দিন আল মামুনের সাজার মাধ্যমে। তারেক খালাস পাওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনও হতবাক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাই সংস্থাটি রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবেন বলে প্রতিবেদককে জানান তিনি।