মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৯ আগষ্ট ২০১৩, ১৪ ভাদ্র ১৪২০
সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ॥ সহায়তায় বিশ্বব্যাংক
০ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক চিঠি দিচ্ছে
০ র্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের এ উদ্যোগ
হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা করতে চায় সংস্থাটি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চেয়ে আনুষ্ঠানিক পত্র দেয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আরাস্তু খান জনকণ্ঠকে জানান, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। শীঘ্রই বিশ্বব্যাংকের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার সান সিটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠন এগমন্ট গ্রুপের বার্ষিক সাধারণসভায় বাংলাদেশ সর্বসম্মতভাবে সদস্য পদ লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে ওই গ্রুপের অপর ১৩৮ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। যা মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সান সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেয়া বিশ্বব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রতিনিধি জিয়ান পেসমির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের একটি অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় ইতোমধ্যেই মানিলন্ডারিং, অর্থ পাচার প্রতিরোধ, জঙ্গী অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপ ও উদ্যোগের বিষয়ে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
আলোচনা শেষে জিয়ান পেসমি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে সহযোগীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র তাদের বরাবরে পাঠানোর পরামর্শ দেন। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিটের (বিএফআইইউ) ডেপুটি হেড মোঃ মাহফুজার রহমান স্বাক্ষরিত একটি পত্র ১৪ জুলাই বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিয়ান পেসমির কাছে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংবাদ সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে ইতোমধ্যেই সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। তাই বিশ্বব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে সহায়তা আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন বন্ধে সহযোগিতা চেয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। তা বিশ্বব্যাংক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে ফেরত পাঠিয়েছে। কেননা এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা চাইতে হলে ইআরডির সহযোগিতা চেয়ে পত্র পাঠাতে অনুরোধ জানানো হবে। ইআরডির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে। শীঘ্রই এটি আবারও পাঠানো হবে বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের ঘটনা বেড়েই চলেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হচ্ছে নজরদারির অভাবে। এ প্রেক্ষিতে অর্থ পাচার রোধে সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় অর্থ পাচার রোধে বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে। গো-এএমএল নামের বিশেষ সফটওয়্যারটি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করবে। যা অর্থ পাচারকারীদের ধরতে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাধীনতা-উত্তর দেশ থেকে দুই লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ‘দ্য প্রাইস অব অফশোর রিভিজিটেড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে বাইরে পাচার করা হয়েছে, পরের ১০ বছরে তার চেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৮১০ কোটি ডলার বা এক লাখ ৪৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আর পরের ১০ বছরে সরানো হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার বা ৫২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং আর্থিক খাতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ (এফআইইউ) বিভাগ বিলুপ্ত করে নতুন ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এতদিন বিভাগটির অধীনে থাকা এফআইইউর কার্যক্রমও বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে নবগঠিত বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এ সংক্রান্ত কর্মকা- পরিচালনা করবে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০১২-এর আওতায় এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০১২-এর ২৩ ধারার মাধ্যমে মানিলন্ডারিং অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর কিছু ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। সে দায়িত্ব পালনের জন্য অধ্যাদেশের ২৪(১) ধারার মাধ্যমে নতুন ইউনিটটি গঠন করা হয়। এতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও আর্থিক অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ এখন থেকে কাজ করবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে জঙ্গী অর্থায়নের বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নানা অপতৎপরতা, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাশকতা পরিকল্পনা, বগুড়ায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারÑ মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে এ ধরনের ঘটনায় আলোচনায় আসছে জঙ্গী অর্থায়নের বিষয়টি। এ নিয়ে সরকারসহ কূটনৈতিকরাও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে এর মধ্যে কিছু মৌলবাদী কার্যক্রম রয়েছে। তারা কেবল সাধারণ মানুষকেই আক্রমণ করছে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও হামলা করছে। সরকার এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তালেবান আদলে কোন কোন সংগঠন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে চাইছে। সেসব সংগঠনে জড়িতরাই সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজেনা বলেছেন অর্থ এবং সন্ত্রাস একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অর্থই সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক। অর্থ সন্ত্রাসবাদকে শক্তি-সমর্থ দেয়, অক্সিজেন দেয়। তাই সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করতে হলে এই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে সন্ত্রাসে ব্যবহৃত অর্থের উৎস। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে হলে অর্থ নামের অক্সিজেনের সরবরাহ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আর জনগণকে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ দিতে সন্ত্রাসবাদে অর্থের যোগান ও মুদ্রা পাচারের মতো অপরাধ বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, অর্থ পাচারকারীদের খাঁচায় ভরতে শক্তিশালী আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সহযোগী।
মজেনা বলেন, অর্থনৈতিক অপরাধ এবং অর্থ পাচার রোধে সংসদকে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হবে। অর্থ পাচারকারীদের ধরতে এবং এর মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে অর্থ পাচারকারী ও সন্ত্রাসবাদীরা যদি শক্তিশালী ও বেশি বুদ্ধিসম্পন্ন হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নতুন দক্ষতা ও নতুন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ হয়ে এ যুদ্ধ জয়ে মাঠে নামতে হবে।