মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২১ আগষ্ট ২০১৩, ৬ ভাদ্র ১৪২০
নাইকোর বিরুদ্ধে মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে রায়
এখন বাংলাদেশের আদালতে মামলা চালাতে আর কোন বাধা রইল না
জনকণ্ঠ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নাইকোর দুটি আবেদন নাকচ করে দিল ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি প্রতিষ্ঠান ইকসিড (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট)। মঙ্গলবার বাংলাদেশের পক্ষে এ রায় দিয়েছে আদালত। ফলে দেশের আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধের করা সরকারের মামলা চলতে কোন বাধা থাকছে না। এ ছাড়া নাইকোর কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের পথও প্রশস্ত হয়েছে। রাজধানীর পেট্রোসেন্টারে এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনে মামলার রায় নিয়ে কথা বলেন পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর মামলা টেকেনি। এখন দেশের আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে করা ক্ষতিপূরণ মামলার রায়ের অপেক্ষায় আছি আমরা। এ রায় আমাদের পক্ষে এলেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে নাইকোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। সুদসহ ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে বলেও জানান তিনি।
নাইকো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ২০১০এর জুলাইয়ে ইকসিডে অভিযোগ করে। এর আগে একই বছরের মে মাস থেকে ফেনীর গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখে। নাইকো ইকসিডে মোট দুইটি অভিযোগ করে। একটি হলো গ্যাসের বকেয়া বিল আদায় সংক্রান্ত (আরবি/১০/১৮)। অন্যটি টেংরাটিলা বিস্ফোরণে ক্ষতিপূরণ দাবির মামলার বৈধতা নিয়ে (আরবি/১০/১১)। মামলা নিষ্পন্নের লক্ষ্যে আরবিট্রেশনে ট্রাইব্যুনাল গঠন সম্পন্ন হয় ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে। ইকসিডে ট্রাইব্যুনালের সভাপতির দায়িত্ব পান মাইকেল শনেলডার। বাংলাদেশের প্রস্তাবে নিউজিল্যান্ডের অধ্যাপক সি. ম্যাকল্যান কিউসিকে এবং নাইকোর প্রস্তাবে ফ্রান্সের জ্যাঁ পলসনকে সালিশকারী (আরবিট্রেটর) নিয়োগ করা হয়।
নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে ২০১১ সালের ১৩-১৪ অক্টোবর লন্ডনে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার রায় ঘোষণায় গ্যাসের বকেয়া বিল আদায়ের বিষয়ে ইকসিড জানায়, যেহেতু নাইকো ও বাপেক্সের যৌথ উদ্যোগে গঠিত কোম্পানি গ্যাসক্ষেত্রের দায়িত্বে রয়েছে সেহেতু এককভাবে নাইকো কোন অভিযোগ করতে পারে না। এটি যৌথ কোম্পানির মাধ্যমে নিস্পত্তি হবে। বাংলাদেশের জরিমানা দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে নাইকোর অভিযোগ সম্পর্কে বলা হয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যৌথ চুক্তি থাকায় উদ্ভূত বিষয়ে বাংলাদেশ ও পেট্রোবাংলাকে অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই।
পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্সের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন বাংলাদেশের দুই আইনজীবী এ্যাডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ ও তাঁর জুনিয়র ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ ফারুক। তাঁদের সহযোগিতা করেন দুই বিদেশী আইনজীবী লেইস গঞ্জালেজ গারসিয়া ও মিসেস এলিসন ম্যাকডোনাল্ড। আর নাইকোর পক্ষে থাকেন কেনেথ ওয়ারেন।
এদিকে রায় ঘোষণার আগেই ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া কোম্পানিটি বাংলাদেশে তাদের সম্পদ বিক্রির আলোচনা শুরু করে। কারিগরি সমস্যায় উৎপাদন কমে যাওয়া ও আইনী পরামর্শে প্রচুর টাকা ব্যয়ের ফলেই নাইকোর এ ক্ষতি হয়েছে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়। কয়েকটি কোম্পানি নাইকোর সম্পদ কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু মামলা নিস্পত্তির আগে নাইকোর দেশ ত্যাগ ও সম্পদ হস্তান্তরের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার।
২০১০ সালের মে মাসে নাইকো পরিচালিত ফেনী গ্যাসক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়ে জরিমানা আদায় না হওয়ায় নাইকোর গ্যাস বিল বাবদ পাওনা সাড়ে তিন কোটি ডলার আটকে দেয় পেট্রোবাংলা। এ ছাড়া ২০১১ সালের ২৪ জুন কানাডার জ্বালানি রাজধানী হিসেবে খ্যাত ক্যালগারির একটি আদালতে বাংলাদেশে ঘুষ দেয়ার অপরাধে নাইকোকে জরিমানা করে স্থানীয় আদালত। নাইকোকে ওই সময় ৯৫ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধ করতে হয়েছে।
সূত্র জানায়, কানাডীয় কোম্পানি নাইকো ছাতকের টেংরাটিলায় গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের সময় ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটায়। দুটি বিস্ফোরণে গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষতি বাবদ নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করে সরকার। কিন্তু নাইকো বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে কোন সাড়া দেয়নি। ২০০৮ সালে যুগ্ম জেলা দ্বিতীয় জজ আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা। মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে এ মামলার রায় হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ আইনজীবীদের সংস্থা বেলা ঢাকায় উচ্চ আদালতে নাইকোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যৌথ চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং নাইকো কর্তৃক দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিপূরণ দাবিতে নাইকোর বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বাংলাদেশ সরকারের ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের মূল্য পরিশোধ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেয়। এরপর নাইকো ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা দাবি করে হাইকোর্টে যায়। কিন্তু নিম্ন আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের মূল্য পরিশোধ বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেয় হাইকোর্ট।
২০০৫ এর জানুয়ারিতে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের পর নাইকো বেকায়দায় পড়ে। এ ঘটনায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফকে একই বছরের মে মাসে প্রায় দুই লাখ ডলার দামের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুইজার উপঢৌকন দেয় নাইকো। ২০১১ সালের জুনে কানাডার আদালতের কাছে বিষযটি স্বীকারও করেছে তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ বাবদ মন্ত্রীকে ৫ হাজার ডলার দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয় স্বীকারোক্তিতে।