মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ২১ আগষ্ট ২০১৩, ৬ ভাদ্র ১৪২০
দক্ষিণে হিযবুত ১ ॥ চারদলীয় জোট আমলে আত্মপ্রকাশ
খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল থেকে ॥ বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের প্রথমার্ধে কয়েকটি সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনার মধ্য দিয়ে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে প্রথমবারের মতো আত্মপ্রকাশ করে উগ্রপন্থী মৌলবাদী জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাওহীদ। ওই সময় গৌরনদীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি হতাহতের ঘটনাও ঘটে। সারাদেশেই এ সংগঠনের অনুসারী এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদার ও বিএনপি সরকারের সাবেক ডেপুটি স্পীকার হুমায়ুন খান পন্নীর সহোদর বায়েজিদ খান পন্নীর প্রতিষ্ঠিত উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাওহীদ। সম্প্রতি দলের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদ খান পন্নীর মৃত্যু পর নতুন ইমামের দায়িত্ব নিয়েছেন নোয়াখালীর হোসেন মোহাম্মদ সেলিম। তার অধীনে এখন দেশব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে এ জঙ্গী সংগঠনের কার্যক্রম। জামায়াতে ইসলামের সঙ্গেও এ জঙ্গী সংগঠনের গভীর সখ্য রয়েছে বলেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। নির্ভরযোগ্য কয়েকটি গোয়েন্দা সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামায়াতের রোকন (নেতা) হাফেজ মাওলানা মোঃ আলমগীর হোসেনের বড় ভাই ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় (রোকন) মাওলানা আঃ জলিলের চাচাত ভাই গৌরনদী উপজেলার সাকোকাঠী গ্রামের সোহরাব হোসেন খান হিযবুত তাওহীদের বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ঝালকাঠি জেলার আমিরের দায়িত্ব নিয়ে নিজ বাড়িকে আঞ্চলিক কার্যালয় বানিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর জঙ্গী হিযবুত তাওহীদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছিলেন। তিনি (সোহরাব খান) ৪ জেলায় ১০ সহস্রাধিক নারী-পুরুষকে বানিয়েছেন হিযবুতের অনুসারী। সূত্র মতে, ২০০১ সালে সাকোকাঠী গ্রামে সর্বহারা কামরুল গ্রুপের সঙ্গে হিযবুত তওহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর গৌরনদী থানা পুলিশ হিযবুতের আমির সোহরাব হোসেন খানকে গ্রেফতার করে। অদৃশ্য কারণে সোহরাব খান অল্পদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আবার কার্যক্রম শুরু করে। ২০০২ সালের ১৫ জুন গৌরনদী উপজেলার সরিকল, শাহজিরা, ধামসর এলাকায় হিযবুতের ৬ ক্যাডারকে ধর্মীয় আপত্তিকর লিফলেট ও উগ্র কথাবার্তা বলায় স্থানীয় জনগণ গণধোলাই দেয়। পরেরদিন হিযবুতের সেকেন্ড-ইন কমান্ড আবু বক্কর সিদ্দিককে সর্বহারা কামরুল গ্রুপের ক্যাডাররা হাত-পা বেঁধে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে। এ ঘটনার পর হিযবুত সদস্যরা সর্বহারা জিয়া গ্রুপের একাধিক আঞ্চলিক নেতাকে নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় গোপন বৈঠক করে। সে সময় পুলিশ হিযবুতের আমির সোহরাব খানসহ অন্য ক্যাডারদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বরিশাল, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ঝালকাঠি জেলায় হিযবুতের কার্যক্রম এলাকার মার্ক করা ম্যাপ, সংগঠনের জেহাদী বই, আপত্তিকর লিফলেট উদ্ধার ও সোহরাব খানসহ হিযবুতের ১২ সদস্যকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকেই বেরিয়ে আসতে থাকে তাদের জঙ্গীপনার নানা বিচিত্র কাহিনী। গ্রেফতারের ৫দিন পর ৪১জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় মামলার এসআই মোকলেছুর রহমান দীর্ঘ তদন্ত শেষে আরও ২ জনকে অভিযুক্ত করে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে বরিশাল প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত ২০০৪ সালের ২০ জানুয়ারি আমির সোহরাব খানসহ ৩৯ জনকে মামলা থেক অব্যাহতি দেন।
২০০৩ সালের ৫ মে সকালে হিযবুত তাওহীদের ১০/১৫ সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় বরিশাল ও মাদারীপুরের সীমান্তবর্তী ভুরঘাটা মজিদবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে তাদের সংগঠনের আপত্তিকর হ্যান্ডবেল বিলিসহ প্রচার অভিযান চালাতে যায়। ওই সময় স্থানীয়রা তাদের হ্যান্ডবল গ্রহণ না করায় এবং উগ্র মৌলবাদী বক্তব্যে দ্বিমত পোষণ করায় হিযবুত তাওহীদের ক্যাডার মোফাজ্জেল হোসেন আকাশ ক্ষিপ্ত হয়ে তার কোমরে লুকানো ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্থানীয় মাসুম বেপারি ও কাজী নাজমুলের ওপর হামলা চালিয়ে মারাত্মক জখম করে। এ ঘটনার জের ধরে স্থানীয়রা হিযবুত সদস্যদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। ওই সময় হিজবুত ক্যাডাররা বাঁশিতে হুইসেল বাজিয়ে সাময়িক কায়দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাদের সহযোগীদের জড়ো করে প্রতিবাদী জনতার ওপর পাল্টা হামলা চালায়। হিজবুত ক্যাডার ও এলাকাবাসীর মধ্যে প্রায় দু’ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়াপাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের এক পর্যায়ে হিযবুত ক্যাডাররা পিছু হটে। ওই সময় এলাকাবাসী ধাওয়া করে গৌরনদীর খাঞ্জাপুর এলাকা থেকে হিযবুতের দলনেতা সাইফুল ইসলাম, ক্যাডার মোফাজ্জেল হোসেন আকাশ, মুনীর হোসেন, ইসমাইল ও কামাল শরীফকে আটক করে গণধোলাই দেয়। জনতার পিটুনিতে দলনেতা বাবুগঞ্জের আগরপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম নিহত হয়। ওই সংঘর্ষে হিযবুতের দলনেতা সাইফুল নিহত চার সদস্য আহত ও ইউপি সদস্যসহ ১০ এলাকাবাসী আহত হয়।
বিভিন্ন সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর হিযবুত তাওহীদের একাধিক সদস্য জানায়, বাংলাদেশ হচ্ছে অনৈসলামিক দেশ। এখানে যে ইসলাম প্রচলতি রয়েছে সে ইসলাম ইসলাম নয়। তাদের ভাষ্য মতে, জুমার নামাজ বা জামাতে নামাজ পড়া জায়েজ নেই। দেশের প্রচলিত আইন আদালতের বদলে তারা কাজীর বিচারে ও নিজস্ব ইমামতিতে বিশ্বাসী। তাদের এ উগ্র কথাবার্তায় প্রতিবাদ করায় ২০০৩ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে সাকোকাঠী গ্রামের খলিফা বাড়ি জামে মসজিদে আসা তবলীগ জামাতের ওপর হামলা চালায় হিযবুতের সদস্যরা। সশস্ত্র অবস্থায় হিযবুতের সদস্যরা তাবলীগ জামাতের লোকজনদের ব্যবহারিক জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায় এবং তাদের মসজিদ থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনায় ওই মসজিদের নিয়মিত নামাজ আদায়কারী মুসল্লিরা হিযবুত সদস্যদের প্রতিবাদ করায় তারা (হিযবুত সদস্যরা) ক্ষিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে ওই বছরের ৭ মে রাতে হিযবুত তাওহীদের সদস্যরা সাকোকাঠী খলিফাবাড়ির মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে সময় মসজিদে আগুন দেয়ার ঘটনায় মসজিদের ইমাম মাওলানা হেমায়েত হোসেন হিযবুত তাওহীদের সদস্যদের নামে গৌরনদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা দায়েরের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও রহস্যজনক কারণে মামলার তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি।